বাংলার তাজ- তাজউদ্দীন আহমদ
২৩ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১০:৩১
![]()
যে কোন জনগোষ্ঠীর জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর সেই সংগ্রাম যদি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরিব্যপ্ত হয় এবং অন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে তা পরিচালনা করতে হয় তাহলে সুদক্ষ, দূরদর্শী, দৃঢ়চেতা এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত গুনাবলিসম্পন্ন নেতৃত্ব ছাড়া সাফল্য অর্জন অসম্ভব। এ ধরনের নেতৃত্বের উদ্ভব অকস্মাৎ হয়না। তাকে জনগনের মধ্য থেকে ধারাবাহিক কঠোর অনুশীলন, প্রশ্নাতীত দেশপ্রেম এবং অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে বের হয়ে আসতে হয়।
ইতিহাসের শিক্ষায় সমৃদ্ধ এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কুটনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে তাকে হতে হয় পারদর্শী। প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী নেতার পাশে এক বা একাধিক স্থিতধী, তাত্বিক ও প্রয়োগবাদী নেতার সমাবেশ ঘটে। তিনি বা তারাই সংগ্রামের রূপরেখা প্রনয়ন ও প্রয়োগে প্রধান নেতাকে সহযোগিতা করে থাকেন। ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রধান নেতা জর্জ ওয়াশিংটনের সহায়ক তাত্বিক নেতা হিসেবে টমাস জেফার্সন, ইটালির জনক যোশেফ গ্যারিবল্ডির সংগ্রামে সহায়ক হিসেবে যোশেফ ম্যাৎসিনীর অবদান অবিস্মরনীয়। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের পুরোধা এম. কে গান্ধীর সংগ্রামে জওহরলাল নেহেরু ও অন্যান্যরা হয়ে ওঠেন প্রধান সহযোগী। চায়না বিপ্লবের মহান নেতা মাও সেতুঙ এর প্রধান সহযোগী হিসেবে এন লাই অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেন। অনুরূপভাবে কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেন চে গুয়েভারা।
ৎ
ছবি পরিচিতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভাইস-প্রেসিডেন্ট), তাজউদ্দীন আহমদ(প্রধানমন্ত্রী), কামরুজ্জামান(স্বরাস্ত্রমন্ত্রী), এম. মনসুর আলী (অর্থমন্ত্রী)
পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরূদ্ধে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন দলের পক্ষে বেশ কয়েকজন নেতা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সকলকে অতিক্রম করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত আওয়ামী লীগ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় হয়ে ওঠে প্রধান প্রতিষ্ঠান। শেখ মুজিব তাঁর জনসম্মোহনী নেতৃত্ব দ্বারা বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত ও ঐক্যবদ্ধ করেন। পূর্বোল্লেখিত ইতিহাসের মতো শেখ মুজিবের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও প্রধান সহযোগী হিসেবে যাবতীয় নীতি-পরিকল্পনায় একজন হয়ে ওঠেন প্রধান ব্যাক্তি। তিনি বাংলার তাজ- তাজউদ্দিন আহমদ।
![]()
ছবি পরিচিতি: ২৮শে ডিসেম্বর ১৯৭১; স্বাধীন বাংলাদেশ মুজিবনগর সরকারের প্রথম সংবাদ সম্মেলন; গভর্ণর ভবন -এ; যা এখন বঙ্গভবন নামে পরিচিত। বাম দিক থেকে- খন্দকার মোস্তাক, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, শেখ আব্দুল আজিজ।
চুড়ান্ত পর্যায়ে প্রতিপক্ষ কর্তৃক বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার লক্ষ্যে একটি পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণ চালিয়ে প্রধান নেতা শেখ মুজিবকে বন্দী করা হলে তাজউদ্দীন আহমদই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও অপরাপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন করার দূরুহ দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু একদিকে নেতার অনুপস্থিতিজনিত সমস্যা অন্যদিকে ভিন্ন একটি রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বে পরিনত হয়। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতীয় স্বাধীনতা লাভের এই সংগ্রাম যে কোন দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ছিল কঠিন। কেননা দ্বিতীয় ব্শ্বিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ ব্যতীত আর কোন দেশ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরবর্তী সশস্ত্র যুদ্ধেও মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি।
এসব বিচারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যূদয় এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। এই অর্জনের মূল ব্যাক্তিই হলেন তাজইদ্দীন আহমদ। কিন্তু একই সাথে এ কথা অনস্বীকার্য যে শারীরিক ভাবে অনুপস্থিত থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই ছিলেন যুদ্ধের মূল প্রেরণাশক্তি। তার অনুপস্থিতিতে দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং নেতাকে মুক্ত করে তার হাতে সেই রাষ্ট্র তুলে দেয়ার বহুমাত্রিক জটিল দায়িত্ব তাজউদ্দীন আহমদ পালন করেছেন।
![]()
ছবি পরিচিতিঃ স্বাধীন বাংলা বেতার হতে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এর একটি সাক্ষাৎকার
বড় বিস্ময়ের ব্যাপার, যার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অসীম ধৈর্য ও দৃঢ়তা ছাড়া দেশ স্বাধীন হতো কিনা সন্দেহ রয়েছে, সেই তাজউদ্দীন আজ ইতিহাসের পাতা থেকে নির্বাসিত প্রায়। তাকে কেবল কিছু সংখ্যক উন্নত রাজনীতি মনষ্ক মানুষগণ স্বরণ করেন।
"যারা সত্য এবং ন্যায়ের জয়গান করেন তাদের কাছে তাজউদ্দীন আহমেদ এবং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস অঙ্গঅঙ্গিভাবে জড়িত", বাবা সম্পর্কে এভাবেই বয়ান করেন কন্যা শারমীন আহমদ।
বাবা মৌলভী মোহাম্মদ ইয়াসিন খান এবং মা মেহেরুন্নেসা খানম এর পুত্র তাজউদ্দীন আহমদ জন্মে ছিলেন গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া থানার দার্দোরিয়া গ্রামে, ১৯২৫ সালের ২৩শে জুলাই। দশ ভাই-বোন পরিবেষ্টিত এবং রক্ষণশীল, মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা তাজউদ্দীন তার পুরো জীবনই সাদামাটাভাবে যাপন করেছেন।
এমনই একজন স্বভাবসূলত বীর নেতা এবং বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী, মহান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে তাঁর জন্মদিনে স্বশ্রদ্ধচিত্তে স্বরণ করি ।
============
লিংকঃ
১. http://muktadhara.net/page10.html
২. http://www.photographersdirect.com
৩. http://www.tajuddinahmad.com/tajuddinslife.htm
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৩:৪১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
লেখক বলেছেন: তাই সঠিক ইতিহাস জানা জরুরী। নয়তো এমন মহান নেতা ও বীরদের সঠিক মর্যাদা আমরা দিতে পারবোনা। ধন্যবাদ।
আপনাকে ধন্যবাদ বিষয়টি আলোচনার জন্য।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ স্বপ্ন-বয়ান।
ওমর হাসান আল জাহিদ বলেছেন:
একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর সম্পর্কে যতই জানছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। ইস্! আমরা এমন মানুষদেরকে মূল্যায়ণ করতে পারলাম না। এমন কি বঙ্গবন্ধুও তাঁকে ভুল বুঝলেন।পোস্টটি স্টিকি করার জোর দাবি জানাই।
আজ প্রথম আলো-তে তাজউদ্দীন আহমদ-কে নিয়ে জাফর ইকবাল স্যার একটি চমৎকার কলাম লিখেছেন। নিচে লিংক দেয়া হল-
Click This Link
Click This Link
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ। লিংকগুলো পড়ছি।
লেখক বলেছেন: ঠিক করেছি। আবারো ধন্যবাদ আল জাহিদ।
কালোপরী বলেছেন:
যার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অসীম ধৈর্য ও দৃঢ়তা ছাড়া দেশ স্বাধীন হতো কিনা সন্দেহ রয়েছে, সেই তাজউদ্দিন আজ ইতিহাসের পাতা থেকে নির্বাসিত প্রায়। তাকে কেবল কিছু সংখ্যক উন্নত রাজনীতি মনষ্ক মানুষগণ স্বরণ করেন।................ পোস্টটি স্টিকি করা হোক।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
একরামুল হক শামীম বলেছেন:
তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিনে মহান এই মানুষটির প্রতি অনেক শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা।
লেখক বলেছেন: মহান নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে তাঁর জন্মদিনে স্বশ্রদ্ধচিত্তে স্বরণ করি ।
সুমন অহেমদ বলেছেন:
সত্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য অনেক ধন্যবাদ. .
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ সুমন।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
উদ্ভ্রান্ত পথিক বলেছেন:
আমরা আসলেই এই মহান নেতাকে কিছুই দিতে পারিনি :-(
লেখক বলেছেন: সহমত। ধন্যবাদ।
কানা-বাবা বলেছেন:
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় নায়ককে সালাম
সাইফ শামস বলেছেন:
আমরা যদি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে উন্নত শিক্ষা ও সুস্থ সংস্কৃতি দিতে পারি, তবে তার স্বপ্নের বাংলা আমরা গড়তে পারব।
লেখক বলেছেন: আমরা সবাই কেবল পরবর্তী প্রজন্মের কথা বলি। সব যদি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে দেই তো আমরা করব কি?
পাভেল রহমান বলেছেন:
কি নির্লজ্জ জাতি আমরা।
ত্রিশোনকু বলেছেন:
২য় ছবিটির পরিচিতি হবে:বাম থেকে ডানে,
সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভাইস-প্রেসিডেন্ট), তাজউদ্দীন আহমদ(প্রধানমন্ত্রী), খোনদকার মোসতাক (সারমেয় শাবক), এম. মনসুর আলী (অর্থমন্ত্রী) কামরুজ্জামান(স্বরাস্ত্রমন্ত্রী), জেনারেল আতউল গনি ওসমানী (মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক.
তাঁকে স্মরন করার জন্য শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
ধূসর মানচিত্র বলেছেন:
তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব না হলে হয়ত আমরা অর্থনৈতিক স্বনির্ভর জাতি হিসেবে মাথা তুলেদাড়াতে পারতাম।
তাজউদ্দীন আহমেদের মৃত্য আমাদের বেইমান জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে।যে নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা আমাদের
স্বাধীনতার তরান্বিত করেছে তাকে আমরা জেলখানার মত জায়গায় মারলাম। আসলেই আমাদের মধ্য এখনো
মীরজাফরের রক্ত রয়ে গিয়েছে যারা সুযোগ পেলে ছুরি ধরে মীরমদন-মোহনলালদের উত্তরাধিকারিদের উপর।
আইরিন সুলতানা বলেছেন:
আজকে জেলহত্যা দিবসে , প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ -কে নিয়ে তার কন্যা সিমিন হোসেন এর একটি লেখা পড়া উচিৎ হয়ত সকলের ....Click This Link
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














