মন্ত্রিসভায় রদবদল প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, আমার বন্ধু সুরঞ্জিত ও ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি এতে খুশি। এটা তাদের প্রাপ্য। তবে ফজর, জোহর, আছর, মাগরিবের নামাজ শেষে এখন এশার আজান হচ্ছে। কোন ইমামেই এখন আর কাজ হবে না। গণবিস্ফোরণ নিয়ে জাতীয় পার্টির-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বক্তব্য নিয়েও কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মঞ্জুর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতার সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠ। তিনিই যখন এসব কথা বলছেন, তখন বুঝতে হবে ধস শুধু অবশ্যম্ভাবী নয়, ধস লেগে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষে গতকাল তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এর আগে ট্রাইব্যুনালে তিনি নিজেই শুনানিতে অংশ নেন। প্রায় দুই ঘণ্টার শুনানিতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, আমার বয়স ৬৩ বছর। আমাকে আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার চাচাতো বোনের (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো ভালই ছিল। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন এসে তাকে ক্ষমতায় বসালো। এরপর তিনি বলতে শুরু করলেন সালাহউদ্দিন কাদের যুদ্ধাপরাধী। রাজাকার বা কোন বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। গতকাল সকাল ১১টার দিকে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বিচারপতি মো. নিজামুল হকের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা আসন নেয়ার পরই সালাহউদ্দিন কাদের ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, আপনি সফলভাবে আমার আইনজীবীদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের একজনের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। তিনি জামিন নিতে গেছেন। আমি নিজেই শুনানি করবো। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা কিভাবে আপনার আইনজীবীদের তাড়িয়ে দিয়েছি? জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, আপনি আমার প্রায় ৩৫ জন আইনজীবীকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করতে দেননি। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা তো বলেই দিয়েছি ১০ জনের বেশি প্রবেশ করতে পারবে না। জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, কোন আইন বলে আপনি এটা করেছেন? ওই সময় ট্রাইব্যুনাল এ সংক্রান্ত রুলস দেখান। তখন তিনি বলেন, আইনকে লঙ্ঘন করে কোন রুলস হতে পারে না। হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটা যায় না। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, মি. চৌধুরী এটা কোন ফানি প্লেস না। এটা আদালত। সালাহউদ্দিন কাদের দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, আমি আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। আপনাদের দু’জন হাইকোর্টের বিচারপতি। আরেকজন হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য। আপনাদের প্রতি আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কয়েক দিন আগে রাতে বিবিসিতে শুনছিলাম কেউ একজন ট্রাইব্যুনালে বলেছেন, এটা কোন আদালত নয়। একথা শুনে অবাক হলাম। যদি আদালতই না হয় তবে তারা কিভাবে আমাকে ১১ মাস জেল খাটাচ্ছে। আমি এ ট্রাইব্যুনালকে আদালত মনে করি। আমার অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, হাইকোর্টের বিচারকদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে। তারা যেখানেই যান সেখানেই তাদের এ ক্ষমতা থাকে। অতীতে সিলেটে রেলওয়ে স্টেশনে একজন বিচারপতি আদালত বসিয়েছিলেন। গাড়িতে পতাকা দেখার পরও স্যালুট না করায় পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা রুল হয়েছিল। এতে প্রমাণ হয় অন্তর্নিহিত ক্ষমতা সবখানেই প্রয়োগ করা যায়। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে সংবিধানে ৪৭ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হয়েছিল। ওই বছরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন পাস হয়েছিল। ওই আইন পাসের প্রায় ৩৬ বছর পর ২০০৯ সালে আইনে সংশোধন হয়। এতে ‘ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ’ শব্দ সংযুক্ত হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ কোটি মানুষের মানবাধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের পরিষ্কার লঙ্ঘন। আর এরও দুই বছর পর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গ শব্দগুলোকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এ যেন আগে সন্তান হয়ে গেছে। পরে সন্তানকে জায়েজ করার জন্য বাবার বিয়ে হলো। তিনি বলেন, সংবিধানের ৯৪(৩) অনুচ্ছেদ বলছে, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা আপিল বিভাগে এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা হাইকোর্টে আসন গ্রহণ করবেন। সংবিধান অনুযায়ী আপনারা হাইকোর্টে আসন গ্রহণ করবেন। অথচ আপনারা ট্রাইব্যুনালে আসন গ্রহণ করছেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ৭(ক) অনুযায়ী কেউ যদি সংবিধান লঙ্ঘন করে অথবা সংবিধানের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার উদ্যোগ নেয়, তবে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য দোষী হবেন। সংবিধানের এ বিধান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ কথা বলতে খুবই বিব্রত আমি যে, এ ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং ট্রাইব্যুনালে যারা আছেন সবাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য দোষী। এসব কথা বলতে আমি খুবই বিব্রত, কারণ আমি ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান। যিনি মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আইনজীবী ছিলেন। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করে ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে বিধি তৈরি করা হয়েছে। সংবিধানের ২৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। তার জন্য কোন ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, লাখো শহীদের বিনিময়ে স্বাধীন হয়ে গেছে এ কথা বায়তুল মোকাররমে বলা যায়। এটা আদালত, এখানে একথা বলা যায় না। এখানে কথা বলতে হবে আইন ও যুক্তির ভাষায়। তিনি বলেন, আমি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি। আমার শপথে সংবিধান রক্ষার কোন কথা বলা নেই। কারণ সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে হয়। কিন্তু আপনারা, বিচারপতিরা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ নিয়েছেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, আপনাদের শপথ রক্ষার্থে আমাকে আবেদন দিতে হয়েছে। তার বক্তব্য রেকর্ড হচ্ছে কিনা তা ট্রাইব্যুনালের কাছে জানতে চান তিনি। জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, এখন হচ্ছে না। তবে শিগগিরই রেকর্ডের ব্যবস্থা নেয়া হবে। জবাবে হাস্যোজ্জ্বল সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে একমাত্র মাইক্রোফোন ছাড়া আর কোন কিছুই আমি আন্তর্জাতিক দেখছি না। ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক না ডমিস্টিক তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, এটা যদি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল হয় আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে। আর যদি ডমিস্টিক হয় তবে দেশীয় আইন প্রযোজ্য হবে। ডমিস্টিক ট্রাইব্যুনাল হলে কোথায় ফৌজদারি কার্যবিধি, কোথায় সাক্ষ্য আইন। তিনি বলেন, সকালে প্রিজন ভ্যানে করে আসার সময় পত্রিকায় দেখলাম স্টিফেন র্যাপ বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞাও এ পর্যন্ত নির্ধারণ হয়নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে বিচার হচ্ছে। এখন শরীরটা ভাল জানিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, আমার ওপর নির্যাতন হয়েছে, যা আগেই বলেছিলাম। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানকে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের গায়ে হাত দেয়ার সাহস তারা পায়নি। আমি ৩২ বছর ধরে সংসদ সদস্য। আমার গায়ে হাত দেয়ার স্পর্ধা বাংলাদেশের শৃঙ্খলা বাহিনী কোথায় পেলো তার জবাবের ভার আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ট্রাইব্যুনাল ও দেশের জনগণের ওপর ছেড়ে দিলাম। সিমলা চুক্তির অধীনে ১৯৫ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন কাদের। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক একটি চুক্তির অধীনে বিষয়টির সুরাহা হয়েছিল। ওই চুক্তি পরে বাংলাদেশের সংসদে অনুমোদন হয়েছে। এ ইস্যুতে ট্রাইব্যুনাল হস্তক্ষেপ করতে পারে কিনা তা-ও একটি ব্যাপার। তিনি বলেন, পত্রিকায় দেখলাম একটি আবেদন খারিজ করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেছেন, উনার নাম গণতদন্ত কমিশনে থাকলেও তিনি কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। আমার কথা হচ্ছে, ১৯৭১ সালে রাজাকার, কোন সহযোগী বাহিনী অথবা সশস্ত্র বাহিনী কোন তালিকায় আমার নাম ছিল না। আমি ধরা খেয়েছি এক জায়গায়। মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান। তিনি আমাকে কোলে নিয়েছেন। খাসি জবাই করে আকিকা করেছেন। তার বিরুদ্ধে ১৫০ জন সাক্ষী সংগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার বন্ধু দাশগুপ্ত (প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত) আমার বিরুদ্ধে ১৫০ সাক্ষী যোগাড় করেছেন। আমি চাইলে ১৫ হাজার অথবা দেড় লাখ সাক্ষীও যোগাড় করতে পারি। এতে তো কোন লাভ নেই। ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে ট্রাইব্যুনাল তাকে বলেন, আপনি আর কতক্ষণ বলবেন। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে যদি শেষ করেন তবে এখনই শুনবো। না হয় ২টার পর শুনবো। তখন সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ইস্যু। আমাকে আরও বলতে হবে। দুপুরের পর শরীরে কুলাবে না। তিন রাত ঘুমাতে পারিনি। দুই-এক দিন পর বা কাল শুনানি করতে পারবো। তিনি এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য শোনার জন্য ট্রাইব্যুনালের প্রতি অনুরোধ জানান। এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, এটা আমাদের বিষয়। আমাদের হাতে অনেক কাজ আছে। আরও ম্যাটার আছে। ম্যাটারগুলো আমাদের নিষ্পত্তি করতে হবে। সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই। কেন ৩৬ বছর দেরি করা হলো। আমার আবেদন হয়তো খারিজ হবে। আমার ফাঁসিও হতে পারে। কিন্তু আমি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছি। যদি ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসব প্রশ্নের জবাব পাই তবে সন্তুষ্টি নিয়ে মরতে পারবো যে, ট্রাইব্যুনাল আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আপনার আইনজীবীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল প্রসিকিউশনের জমা দেয়া ডকুমেন্ট নিয়ে যেতে। কিন্তু তা নেয়া হয়নি। জবাবে সালাহউদ্দিন বলেন, আপনি চেম্বারে বসে আমার মামলা আমলে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন। সেটা আপনার ও প্রসিকিউশনের প্রাইভেট ম্যাটার। আমি মামলা আমলে নেয়ার ব্যাপারে আবেদন দিয়েছি। সে আবেদন নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত আমি কোন ডকুমেন্ট নেবো না। ট্রাইব্যুনাল বলেন, ডকুমেন্ট না নিলে আপনারই ক্ষতি। তখনই সালাহউদ্দিন কাদের বলেন, আমাকে আজরাইলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল আজ পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষে সালাহউদ্দিন কাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা ভাগেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মা-বাবাকে ভাগ করা যায়, কিন্তু কোন শহর ভাগ করা যায় না। ঢাকাবাসী অবশ্যই সময়মতো এর প্রতিশোধ নেবে।
সূত্রঃ মানবজমিন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



