পুরোনো ঢাকার নবদ্বীপ বসাক লেন; ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি জন্মেছিলেন একটি বাঙ্গালী খ্রিস্ট্রান পরিবারে। পারিবারিকভাবে সংগীত চর্চার একটা ঐতিহ্যতো ছিলই আর নিজের ছিল সংগীতের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ, ভালোলাগা। প্রথমে তিনি বাঁশি বাজানো শুরু করেন। একসময় পশ্চিমা সংগীত শোনা শুরু করেন। সেই ভালোলাগা থেকেই একসময় গীটার এবং পিয়ানো বাজাতে শুরু করেন। অল ইন্ডিয়া রেডিও তে বাজানোর সুযোগ পান। তিনি সমর দাস। বাংলা সংগীতে যাঁর অসীম অবদান।
১৯৭১ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর। এসময় সমর দাস দেশের কিছু একটা করার তাড়না বোধ করেন। প্রথমে মুজিবনগর ও পরে কোলকাতা থেকে প্রচারিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। এসময় তিনি প্রচুরসংখ্যক গানে সুর করেন। মুক্তিযোদ্ধারা রনাঙ্গনে বসে তাদের রক্তের ভেতওে এক ধরনের তাড়না ও জিদ অনুভব করতেন, দেশের পক্ষে লড়বার। এই তাড়না প্রধানত দুটি উৎস থেকে আসত। এক. ঊঙ্গবন্ধুর ভাষন।দুই. উদ্দীপনামূলক গান। এই দুটি উৎসের উৎস আবার একÑ স্বাধীন বাংলা বেতার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত যে গানটি শুনলে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার ভিতরে দেশকে মুক্ত করার শক্তি সাহস স্পৃহা জাগ্রত হতো যে গানটি শুনলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিদিন নতুন প্রান ফিরে পেতেন; "পূর্ব দিগন্তে সুর্য উঠেছে" এই গানটির সুরকার তিনি। একইভাবে "নোঙ্গর তোল তোল" গানটিরও অসীম অবদান রয়েছে। সমর দাসের গানে অন্যরকম একটা তেজ পাওয়া যেতÑ এখনো সেটি বোঝা যায়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে নেমেছিলেন মুক্তিকামী জনতা, দেশ স্বাধীন হয়। কিন্ত এই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে শক্তি সাহস স্পৃহা জাগ্রত করার পেছনে যাঁর অবদান কিছুতেই ছোট করে দেখা যায় নাÑ তিনিতো আরেক মহানায়ক। তিনি কিংবদন্তি সংগীতকার সমর দাস। যার গান এখনো প্রাণের ভেতরে দামামা বাজিয়ে যায়।
১৯৫৩ সালে তিনি পিয়ানোবাদক হিসেবে তৎকালীন এইচ এম ভি তে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্থানের করাচী সংগীত একাডেমীতে প্রধান সংগীত পরিচালক হন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা রেডিও তে চলে আসেন সংগীত পরিচালক হিসেবে। ৫০ এর দশক থেকেই তিনি বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্থান থেকে মুক্তি প্রাপ্ত অসংখ্য ছবির সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। কলকাতার লটারী ছবিতে কাজ করে তিনি পরিচিত হতে শুরু করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম বাংলা ছবি "মুখ ও মুখোশ" এ কাজ করার পর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করেন। তার সংগীত পরিচালনায় অনান্য উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে "আয়শা" "নবারুন" "ধীরে বহে মেঘনা" উল্লেখযোগ্য। তিনি দুই হাজারেরও বেশী গানের সুরকার। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সুরবিন্যাস করে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত 'আমার সোনার বাংলা' মূল গানটি বিবিসি লন্ডন থেকে সামরিক ব্রাশব্র্যান্ডে রেকর্ড করার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, সমর দাস চলে গেছেন। তাঁর স্মৃতি আজও সমুজ্জ্বল। কালের ডামাডোলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তের দাগ মুছে গেছে, কিন্তু আজও তাঁর স্বাধীনতার গান আমাদের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল ও জাজ্বল্যমান। এখনো রক্তে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ।
দুই.
সমর দাসের সুর করা কয়েকটি গান:
নোঙর তোল তোল
কথাঃ নইম গহর
সুরঃ সমর দাস
নোঙর তোল তোল সময় যে হোল হোল
হাওয়ার বুকে নৌকা এবার
জোয়ারে ভাসিয়ে দাও
শক্ত মুঠির বাঁধনে বজরা বাঁধিয়া নাও
সম্মুখে এবার দৃষ্টি তোমার পেছনের কথা ভোল
দূর দিগন্তে সূর্য রথে
দৃষ্টি রেখেছে স্থির
সবুজ আশার স্বপ্নেরা আজ
নয়নে করেছে ভিড়
হৃদয়ে তোমার মুক্তি আলো
আলোর দুয়ার খোলো।
মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কথা: কৃষ্ণ চন্দ্র দে
সুর: সমর দাস
মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হল বলিদান,
লেখা আছে অশ্রুজলে ।।
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে,
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।।
যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানেন
স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভুমি
এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি
সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।
যাঁরা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা,
মৌন মলিন মুখে জোগালো ভাষা
আজি রক্ত কমলে গাঁথা মাল্যখানি
বিজয় লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরই গলে।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
কথা: গোবিন্দ হালদার
সুর: সমর দাস
পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে
রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল
জোয়ার এসেছে জন-সমুদ্রে
রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল।।
বাঁধন ছেঁড়ার হয়েছে কাল,
হয়েছে কাল, হয়েছে কাল।।
শোষণের দিন শেষ হয়ে আসে
অত্যাচারীরা কাঁপে আজ ত্রাসে
রক্তে আগুন প্রতিরোধ গড়ে
নয়া বাংলার নয়া শ্মশান, নয়া শ্মশান।
আর দেরি নয় উড়াও নিশান
রক্তে বাজুক প্রলয় বিষাণ
বিদ্যুৎ গতি হউক অভিযান
ছিঁড়ে ফেলো সব শত্রু জাল, শত্রু জাল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

