আপনি যদি কখনও মারুবরা রকসে যান, তাহলে আবহাওয়া পূর্বাভাস দেখে নিবেন। আকাশে যেদিন এক ফোঁটা মেঘ থাকবে না, কিছু মৃদুমন্দ বাতাস বইবে শুধু, সেদিন সূর্য মামা আকাশে ভালো ভাবে সওয়ার হওয়ার পরে সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ৩৭৬ বাসে চেপে বসবেন। তারপর নিশ্চিন্তে বসে থাকুন। আপনাকে বাসটা একেবারে মারুবরা বীচের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। নেমেই অনেক দূরে বালুকাময় সৈকত দেখতে পাবেন। ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। এরকম সুন্দর দিনে অনেককে স্কীন ক্যানসারের লোভে পেয়ে বসে। প্রায় জন্মদিনের পোশাকে নির্বিকার ভাবে সূর্যের নিচে বসে যায় ত্বকে ম্যালিগন্যান্ট গ্রোথের বর পাওয়ার লোভে। ওদের এড়িয়ে যাওয়াই মঙ্গল। তবে বালুতেই ওদের লোভ, পাথরে ওদের শখ নেই, এই বাঁচোয়া। সোজা হাতের বাঁ দিকে চলে আসুন। সেদিকেই মারুবরা রকস।
অনেক অনেক কাল আগে সেখানেও বালুকাময় সমুদ্র সৈকত ছিল। পৃথিবীটা কাঁদতে কাঁদতে অনেকখানি নোনা জল শেষ করে ফেলেছে। তাই সাগরের জল এখন অনেক কমে গিয়েছে। সাগর এখন ফুট পঞ্চাশেক নিচে চলে গিয়েছে। দূর থেকে দেখে এখনও ভেজা বালুর স্তরের মত লাগে। একুশ বছরের তরুণীরা যখন সেখানে যায়, তখন পায়ের স্যান্ডেল খুলে ছুঁড়ে ফেলে। কিন্তু পায়ের নিচে নরম বালুর বদলে শুষ্ক, শক্ত খটখটে পাথর ঠেকে। আপনিও স্যান্ডেল খুলে দেখতে পারেন, সূর্য তাপে সে পাথর হালকা আরামদায়ক গরম হয়ে থাকবে। সেখানে গেলেই টের পাবেন, খুব শিশু হয়ে উঠতে ইচ্ছা করছে। তরতরিয়ে বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে মুহূর্তেই চলে যাবেন পাহাড়ের একদম প্রান্তে। সেখান থেকে অনেক ফুট নিচে সাগর জল।
সাগরটাকে দেখুন, তৃপ্তি হচ্ছে? দেখা শেষ হয়েছে?
দেখা শেষ হবে কি করে, এত রং! সাগর কি শুধুই নীল? ও যে দেখুন, সোনালী বালুর কাছাকাছি আসতেই সাগর কি অদ্ভূত সুন্দর সবুজাভ ওড়নায় নিজেকে জড়ালো। আবার মাঝ সাগরে গাঢ় নীল রং। সেই নীলেরও কত ছায়া! আকাশটা যেখানে সাগরের সাথে মিলেছে, সেখানটাই দেখুন। একি ছবির মত না কি ছবি আঁকিয়ের শিল্প মুগ্ধ হলেন নতুন করে? এবার আরেকটু সাহসী হন। বাতাসে উড়ে যাওয়ার ভয় উড়িয়ে দিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ুন খাদের পাশে। অনেক অনেক নিচে দেখুন, সাগরিকা মেয়েটা আজকে আপনাকে ছুঁতে উঠে পড়ে লেগেছে। অনেক দূর থেকে ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে পাহাড়ের দেয়ালে। সবুজাভ ওড়না বদলে মুহুর্তেই সাদা শিফনের ওড়না জড়িয়ে নেয়। বাতাসটার কথা আর কি বলবো, সেখানে যেদিন যাবেন, সেদিন না হয় নিজেই মুখে, গায়ে মেখে নিয়েন দু'চোখ বন্ধ করে। বড় মায়াবতী বাতাস সে বাতাস। সাগরের স্পর্শকেও বয়ে নিয়ে আসবে। ঠোঁট চেটে জিভে নোনা স্বাদ ঠেকলে টের পাবেন বাতাসীর দুষ্টামি।
সাগরকে ছুঁতে লোভ হচ্ছে? তাহলে এখানে থাকলে হবে না। উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন! হেঁটে হেঁটে চলে যান আরও উত্তরে। পথে চোখে পড়বে উজ্জ্বল, গোলাপী কিংবা হলুদ ফুলগুলো, অযত্নেই কি সুন্দর হয়ে উঠেছে! কোন অজানা, তীব্র আনন্দে শুধুই দুলছে বাতাসের তালে তালে। পা এখনও খালি? তাহলে সাবধান, মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে ছড়ানো সবুজ কাঁচের টুকরো। উহু, কোন অভিমানী কিশোরীর ভাঙা কাঁচের চুড়ি নয়। কোন মেদো মাতালের অপকর্মের সাক্ষী। ভাবতে পারেন, মানুষ এত নিদারুণ বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের কাছে এসে কেন নিজেকে ভুলতে চায়? এই সৌন্দর্যকে ভুলে যেতে চায়? ধার করা মাতাল লেন্সে সাগর দেখতে চায়? হিসাব মিলবে না, তার চেয়ে বরং পাশের সাগরটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কিছু বলে দেখতে পারেন। মুহূর্তেই মিলিয়ে যাবে। কারও সাথে থাকলে খুব করে হেসে দেখতে পারেন। কোথাও কেউ নেই, নির্দিধায় শিশু হয়ে যান।
হ্যাঁ, প্রায় চলে এসেছেন। কার পার্ক পার হয়ে, সবুজ ঘাস টুকু পার হয়ে আরও উত্তরে। যখন পাথুরে জায়গাটায় পৌঁছে যাবেন সী-পুলটাও পার হয়ে, তখন তর তরিয়ে নেমে যান। শুকনো জায়গাটুকু পিছনে ফেলে নেমে যান। যেখানে সাগর আছড়ে পরছে ক্ষনে ক্ষনে, সেইখানে। ছোট ছোট ঢেউ, তার অল্প অল্প ফেনা, আপনাকে ছুঁতে পারবে না। শুধু মাঝে মাঝে অল্প পানি ছিটিয়ে দিবে। দাঁড়িয়ে থাকুন। হঠাৎই আসবে সে, আপনাকে বেখেয়ালে পেয়ে, অনেক দূর থেকে ছুটে আসবে। তারপরে, হঠাৎই ঝাপিয়ে পড়বে। অনেক উঁচু থেকে, বিশালত্ব নিয়ে, তীব্র গর্জনে। বুঝে উঠার আগেই আপনি আগা গোড়া ভিজে যাবেন। দু'চোখ বন্ধ করে অবগাহনে ডুব দিন। পালাবেন না খবরদার। আপনাকে সেদিনের গল্প বলা হয় নি, পালাতে গিয়ে একুশ বছরের মেয়েটা খামচি খেয়েছিল সাগর তীরের ছোট ঝিনুকের। সে কি রক্ত! ছোপ ছোপ রক্ত দেখতে পান? মেয়েটা অবশ্য মন খারাপ করে নি, সাগর আদর করে একটু খামচি দিতেই পারে। মহাসমারোহে ছবি তুলেছিল, ছবি দিয়ে দিলাম আপনার জন্য।
সব ভিজে গিয়েছে? এবার তাহলে পিছনে পাথরে বসে নিজেকে শুকিয়ে নিন। আর দু'চোখ ভরে নীল জল দিগন্ত দেখে নিন। নীলে চোখ রাখুন, গাংচিলের ডানাও দেখে নিন মুগ্ধ চোখে। ওরা কি করে দেখেছেন? উড়ে এসে হঠাৎ বসে যায় ঢেউয়ের উপর, কিছুক্ষন দুলে ঢেউয়ের তালে তালে। কখনও মাথা ডুবিয়ে মাছ খেয়ে নেয়। আবার উড়াল দেয়।
এই দেখুন, সাগরের গানের কথাই তো বলা হয় নি আপনাকে। কান পেতে শুনুন তো... আহা, সাগরের গান কি আর আমি গাইতে পারি? শুধু এটুকু বলতে পারি, সেদিন একুশ বছরের তরুনীদের একজনের পায়ের নূপূরের রিনরিনে শব্দ সাগরের গানের সাথে মিলে মিশে পৃথিবীকে হঠাৎ জটিলতা কুটিলতা মুগ্ধ, খুব সুন্দর করে ফেলেছিল। আচ্ছা, আপনি যেদিন যাবেন, সেদিনও কি ওই ছেলেটা যাবে? অনেক দূরে বসে যে এক মনে হারমনিকা বাজিয়ে যাচ্ছিল? বড্ড বেশি সিনেমা সিনেমা শোনায়, যেখানে নায়ক নায়িকা নাচতে চাইলেই মেঘের আড়াল থেকে যোগালীর দল আর বাদ্যযন্ত্রেরা চলে আসে। কিন্তু ছেলেটা সত্যিই সেখানে ছিল। এক মনে, খুব আবেগ দিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছিল হারমনিকা। সেই সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল অ-নে-ক দূর অব্দি। কেমন বিষণ্নতা আর একাকীত্বে মাখানো সুর।
সেই সুরে ভাসতে ভাসতে দু'চোখ পেতে আপনি স্বপ্ন দেখতে পারবেন, এই আকালেও।
-------------------------
মারুবরা বীচে গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন।
ছবি: গোলাপী বেগম আমি, আর এক বান্ধবী। সাগর থেকে পালানোর অপরাধে ইমুর পা থেকে ঝরা রক্তের ছোপ। অন্য ছবিটা আমার তোলা শ্রেষ্ঠ ছবি। আফসোস, মোবাইলের ক্যামেরায় পঁচা কোয়ালিটির ছবি তুলতে হলো। ক্যামেরা কেনার সময় হলো বলে...
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।