মোহাম্মদ আবুল হোসেন: ধর্মগুরু নিত্যানন্দের যৌন কেলেংকারির ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর লজ্জায় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন তামিল নায়িকা রঞ্জিতা। আর নিত্যানন্দ এ কয়েকদিন পলাতক থাকার পর তাকে জনসমক্ষে দেখা গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, তিনি রয়েছেন মহীসুরে। আবার কেউ বলছেন, তিনি যোগ দিয়েছেন কুম্ভমেলায়। আসলেই তিনি কোথায় আছেন তা নির্ভরযোগ্য কোন সূত্র নির্দিষ্ট করে জানাতে পারে নি। ওদিকে আশ্রমে দুই রমনীর ( এর একজন তামিলনাড়ুর নায়িকা রঞ্জিতা) সঙ্গে শারীরিক সমপর্কের ভিডিও মিডিয়ায় ফাঁস হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসছে স্বামী নিত্যানন্দের সব কুকীর্তির খবর। ওই ভিডিও মিডিয়ার কাছে সরবরাহকারী তারই আশ্রমের নিত্য প্রেমানন্দ ওরফে লেনিন কারুপ্পনকে হত্যার চেষ্টা করছেন স্বামী নিত্যানন্দ। এ অভিযোগে তিনি চেন্নাই পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন। ওদিকে স্বামী নিত্যানন্দের ভিডিও প্রকাশের পর পরই বন বিভাগের কর্মকর্তারা তার বিদাদি আশ্রম ঘেরাও করে অপারেশন চালান। সেখান থেকে তারা উদ্ধার করেছেন ৬০ কেজি চন্দন কাঠের গুঁড়ো। ইতিমধ্যে যৌনাচারের ওই ভিডিও ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি মানুষ দেখেছে। অর্থাৎ ইউটিউবে চাহিদার সর্বোচ্চ মাত্রায় রয়েছে ওই ভিডিও। এমন অনেক খবরে এখন ঠাঁসা ইন্টারনেট।
রঞ্জিতার আত্মহত্যার চেষ্টা
যৌনাচারের ভিডিও কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হওয়ার পর নায়িকা রঞ্জিতা আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। মুখে মুখে বলাবলি আছে, ধর্মগুরু নিত্যানন্দকে ফাঁসাতে ওই ভিডিও ধারণ করেছেন রঞ্জিতা নিজেই। কিন্তু তা মিডিয়ার হাতে পড়ায় এবং আশ্রমের কর্তকর্তা নিত্য প্রেমানন্দ ওরফে লেনিন কারুপ্পন সেই ভিডিও মিডিয়ার কাছে দেয়ার কথা স্বীকার করে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ায় রঞ্জিতার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিশ্বাস করার কোন কারণ থাকে না। রঞ্জিতা তেলেগু ভাষার ছবি ‘মাভিচিগুরু’ এবং ‘শ্রীরামুলাইয়া’র মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন।
নিত্য প্রেমানন্দের নিরাপত্তা প্রার্থনা
আশ্রমের এক সদস্য নিত্য প্রেমানন্দ। তিনদিন আগে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, স্বামী নিত্যানন্দের আশ্রম এক বিবৃতিতে বলেছে, ওই ভিডিও প্রকাশ ও প্রচার করেছে নিত্য প্রেমানন্দ। এখন তাকে হত্যার চেষ্টা করছেন স্বামী নিত্যানন্দ- এমন অভিযোগ করে চেন্নাই পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন তিনি। ডেকান ক্রোনিকল এক রিপোর্টে বলেছে, প্রেমানন্দ পুলিশকে বলেছেন- স্বামী নিত্যানন্দের লোকেরা তাকে হত্যার জন্য ব্যাঙ্গালোর থেকে ধাওয়া করে নিয়ে গিয়েছিল সালেম এলাকায়। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে চেন্নাই চলে আসেন।
কিভাবে ওই ভিডিও বণ্টন করা হয়
পুলিশ সূত্রের মতে, প্রেমানন্দ ও তার সহযোগীরা ওই ভিডিওর (ডিভিডি ফর্মেটের) ৮৬ কপি বিভিন্ন মিডিয়া, প্রতিষ্ঠান, নিত্যানন্দ আশ্রমের সঙ্গে জড়িত এমন কিছু ব্যক্তি এবং বিদেশী ভক্তদের মধ্যে বণ্টন করে। তার সঙ্গে দেয়া হয় ৫ পৃষ্ঠার একটি চিঠি। তাতে কর্ণাটকের বিদাদি আশ্রমের আরও কিছু তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ওই চিঠিতে প্রায় ২৩ বছর বয়সী এক নারী, আশ্রমে নারীদের ওপর ধর্মগুরুর যৌন অত্যাচারের বর্ণনা করেছেন। তাতে মানবাধিকার লংঘিত হওয়ারও অভিযোগ আছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ওই আশ্রমের ভিতরে মারা গেছেন কানাডার এক ভক্ত।
আশ্রম থেকে ৬০ কেজি চন্দন গুঁড়া উদ্ধার
স্বামী নিত্যানন্দ নিজেকে ‘স্বামী’ ঘোষণা করেন মাত্র ১২ বছর বয়সে। এর পর তিনি আশ্রম গড়ে তুলেছেন। তার পর থেকেই তার আশ্রমে একটি সাপ অবস্থান করছে। এই খবরে ওই ভিডিও প্রকাশের কয়েকদিন আগে পশু বিশেষজ্ঞ শরত বাবু তার আশ্রমে গিয়েছিলেন সাপটি উদ্ধার করতে। সেখানে তিনি দেখতে পান আশ্রমের ভিতর জমা করে রাখা হয়েছে প্রচুর চন্দন কাঠের গুঁড়ো। ফলে বিষয়টি তিনি সংশিস্নষ্টদের জানিয়ে দেন। যৌন কেলেংকারির খবর প্রকাশ হয়ে পড়ার পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা সেখানে অভিযান চালান। তারা এ সময় উদ্ধার করেন ৬০ কেজি চন্দন গুঁড়ো। একই রকম অভিযান চালানো হয় স্বামী নিত্যানন্দের তামিল নাড়ুর আশ্রমেও। এক কর্মকর্তা বলেছেন, স্বামী নিত্যানন্দের একটি আশ্রমে বেশ কিছু অনৈতিক জিনিসপত্রের মজুদ ছিল। তার প্রমাণ ধ্বংস করার জন্য তার লোকেরাই সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ জন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তিন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কর্নাটকের বন বিভাগের আইনে আশ্রমের ব্যবস্থাপনা পরিষদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সরকারি জায়গায় আশ্রম
কর্ণাটকে সরকারি জায়গায় স্বামী নিত্যানন্দ তার আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছেন। শুক্রবার কর্ণাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভি এস আচার্য ঘোষনা দিয়েছেন, যে জমির ওপর ওই আশ্রম গড়ে উঠেছে তা সরকারি। তা ছিল গোচারণ ভূমি। বিষয়টি তিনি উপ-কমিশনারকে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও তিনি জানান। এ বিষয়ে বন্য প্রাণী বিষয়ক প্রধান বিকে সিং কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নরেন্দ্র মোদির জন্য বিব্রতকর
স্বামী নিত্যানন্দের যৌনাচারের ওই ভিডিও প্রকাশ হওয়ায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহ অনেক প্রথম সারির রাজনীতিক বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। নিত্যানন্দের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র নেতা নরেন্দ্র মোদি অনেকবার এক মঞ্চে উঠেছেন।
শুধু তাই নয়, তিনি ওই ধর্মগুরুর প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছেন মঞ্চ। বিনিময়ে নরেন্দ্র মোদি রাজ্যের কানিয়া কেলাভানি কর্মসূচীর জন্র স্বামী নিত্যানন্দের কাছ থেকে পেয়েছেন ত্রাণ। স্বামী নিত্যানন্দ ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে একবার এবং সর্বশেষ এ বছরের জানুয়ারিতে গুজরাট সফর করেন। গত ১০ই সেপ্টেম্বর স্বামী নিত্যানন্দের একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হয়। সেখানে নিত্যানন্দের ভূয়সী প্রশংসা করেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি, বড়ধরার এমপি যোগেশ পাতিল, মেয়র বালকৃষ্ণ শুকলা এবং সরদার সরোবর নর্মদা নিগাম লিমিটেডের চেয়ারম্যান এন ভি পাতিল। ফলে স্বামী নিত্যানন্দের ওই ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর এই সব ব্যক্তি এখন নিত্যানন্দের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। এনভি পাতিল বলেছেন, আমরা সব সময়ই ধর্মগুরুদের শ্রদ্ধা করি। এর অর্থ এই নয় যে, আমরা তাদের সব কাজেরই বৈধতা দেব। তাদের সঙ্গে আমাদের মিলিয়ে দেখা হবে ভুল। অপ্রয়োজনে এ নিয়ে অতি মাত্রায় বিতর্ক হচ্ছে। অন্যদিকে যোগেশ পাতিল সরাসরি বলে দিয়েছেন, তিনি নিত্যানন্দ বা তার কোন সংগঠনের নামও জানেন না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


