তিতাস পাড়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া। অদ্বৈত মল্ল বর্মণের তিতাস পাড়। কুড়–লিয়া খালের পাড়ে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক লুৎফর রহমানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বড় আপন করে কাছে ডাকে মানুষকে। ছোট্ট সাজানো গোছানো একটি জেলা শহর। চারদিকে তার প্রাচুর্য্য। আছে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্র। অদূরেই ভাদুঘর এলাকায় রাস্তার দু’ধারে দিগন্ত বিস্তৃত ধান ক্ষেত। যত দূর চোখ যায়- পাকা ধানের সোনালী আভা নয়ন জুড়িয়ে দেয়। তার মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি গেঁয়ো রাস্তা, অথচ পাকা। সেই রাস্তা বেয়ে এগিয়ে যেতে যেতে দেখা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অপার রূপসুধা। পাকা ধান ক্ষেতের এখানে ওখানে ফসলি জমিতে গড়ে উঠছে নতুন আবাস। কোথাও ইট বা দেয়াল দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে সহসাই মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াবে দানবের মতো কোন অট্টালিকা। তা দেখিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংবাদিক জাবেদ রহিম বিজন বললেন, এভাবেই নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। ওই যে দূরে মাঠের প্রায় মাঝখানে একটি কলেজ। তা ঘিরে চারপাশে শহরের আমেজ। উঠছে নতুন নতুন বিল্ডিং। তা দেখতে দেখতে কখন যেন হারিয়ে যাই গোকর্ণ ঘাট এলাকায়। মনকে বড় স্পর্শ করে আছেন এই গোকর্ণঘাটের এক মাঝির ছেলে, এক জেলে পরিবারের কৃতী সন্তানÑ অদ্বৈত মল্ল বর্মণ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯ই ডিসেম্বর পা রাখতেই খুব বেশি মনে পড়তে থাকে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর অমর স্রষ্টা এই কালজয়ী ঔপন্যাসিককে। বড্ড সাধ হয় তার গাঁয়ের বাটিটি একবার দেখতে। বিজন বললেন, এই তো আর একটু সামনে এগুলেই তার বাড়ি। তেমন আপনজন বলতে কেউ থাকে না এখন তার বাড়িতে। অগত্যা বিজনের মোটর সাইকেল রাস্তার এবড়ো থেবড়ো পেরিয়ে পৌঁছে যায় অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বাড়ির পাশে। রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে এই মহান পুরুষের আবক্ষ মূর্তি। সেদিকে চোখ পড়তেই চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার জীর্ণশীর্ণ চেহারা, নির্বিকার মূর্তি যেন অতীত থেকে আহ্বান জানাচ্ছেনÑ তিতাস এখনও বেঁচে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া এখনও মাথা তুলে আছে। গোকর্ণঘাটের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। জেলেরা আর আগের মতো মাছ পান না নদীতে। বড্ড কষ্ট তাদের। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। অদ্বৈত মল্ল বর্মণের সেই মূর্তিকে স্পর্শ করে গায়ের ভিতর অ™ভূত এক শিহরণ খেলে যায়। যেন এক সম্মোহনী শক্তি তার কাছে টেনে নিয়ে যায়। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। তার চোখের চাহনি আরও কাছে ডাকে। এক নিবিষ্ট মনে তিনি তাকিয়ে যেন আহ্বান করছেন সবাইকে। ডাকছেনÑ দেখে যান গোকর্ণ ঘাটের জেলে পল্লীর জেলেরা এখন কেমন করে বেঁচে আছেন। তাদের বড্ড সাহায্য দরকার। আশপাশে যাদের দেখা মিললো তাদের বেশির ভাগেরই মুখের, পিঠের চামড়া রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। যেন তা সাক্ষ্য দিচ্ছে কতটা সময় তিতাসের বুকে মাছ পড়ার অপেক্ষায় তাদের থাকতে হয়। বড় অ™ভুত এই তিতাস নদী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরটিকে যেন ঘিরে রেখেছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের পিছন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তা ভাদুঘর এলাকার পিছন দিয়ে চলে গেছে। তারপর তা ঘুরে চলে এসেছে গোকর্ণঘাটে। এই গোকর্ণ ঘাটের পাশেই অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বাড়ি। এখন সে বাড়িটি জীর্ণশীর্ণ এক মাথা গোঁজার ঠাঁই। দু’টি বা তিনটি পরিবারের বাস। তারা অদ্বৈত মল্ল বর্মণের উত্তরসুরি। কয়েক জনকে জিজ্ঞেস করলে তারা পরিষ্কার করে বলতে পারলেন না তাদের সঙ্গে অদ্বৈত মল্ল বর্মণের আত্মীয়তার সম্পর্ক কেমন। বাড়িতে কোন পুরুষ সদস্যের দেখা মিলল না। নারীরা রান্নার কাজে ব্যস্ত। সেখান থেকে বেরিয়ে আবার দেখা হয় গোকর্ণ ঘাটের। এখান থেকে নবীনগর সহ নানা গন্তব্যে ছুটে চলেছে নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা। পাটুনিরা লোকজনকে ডাকতে ব্যস্ত। পাশ দিয়ে ফট ফট শব্দে ছুটে চলেছে মালবাহী নৌকা। ট্রলার। আবার বিজনের মোটরসাইকেল ছুটতে থাকে। কুড়–লিয়া খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ আব্দুল কুদ্দুছ মাখন মিয়ার স্মৃতির স্বারক ব্রিজ। এই ব্রিজটি গোকর্ণঘাট, নবীনগর সহ ওই এলাকার হাজার হাজার মানুষের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সঙ্গে যোগাযোগকে সহজ করে দিয়েছে। আগে তাদেরকে ভাদুঘর হয়ে অতিরিক্ত প্রায় ৪/৫ মাইল পথ ঘুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে যেতে হতো। এখন এই ব্রিজের কারণে এ দূরত্ব পায়ে হাঁটা পথের মধ্যে নেমে এসেছে। তার ওপর যোগ হয়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা। সরাসরি রেল স্টেশনে চলে যায়। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যেকোন স্থানে খুব সহজে পৌঁছা যায় এ সড়ক দিয়ে। এর নাম দেয়া হয়েছে বাইপাস সড়ক। এই সড়ক দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বিজন দেখাতে থাকেনÑ এই এলাকা আগে পুরো মাঠ ছিল। ৪/৫ বছরেই দেখেন কি শহরের রূপ নিয়েছে। চারদিকে আসলেই চোখে পড়ে শুধু ইটপাথরের বাহাদুরি। রাস্তা ঘেষে দু’পাশেই গড়ে উঠেছে জনবসতি। কারো দেখে বোঝার উপায় নেইÑ এখানে একদিন মাঠ ছিল। ফসল ফলত। বেশ দূরে গিয়ে চোখে পড়ে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্র। বিজন বললেনÑ আগে থেকে পাস নেয়া হয়নি। তাই ভিতরে ঢুকতে পারছি না। অগত্যা বাইরে থেকেই দেখা মেলে ভিতরে কিছুটা দূরে একটি চিমনিতে আগুন জ্বলছে। বিজন বললেনÑ ওইটা একটা কূপ। ওখান থেকে গ্যাস তোলা হচ্ছে। গ্যাসকূপগুলোর একেবারে কাছে যেতে দেয়া হয় না। ফিরে আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ, জনসভার জন্য নির্ধারিত স্থান- সব চোখে পড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রয়েছে এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বিগ্রহ মূর্তি। তার নামফলকে লেখাÑ পরম ভগবত ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারী মহারাহের অনুপ্রেরণায় ও ভক্তবৃন্দের সক্রিয় সহযোগিতায় স্বাধীনতা সংগ্রামকালে ধ্বংসীকৃত শ্রী শ্রী কালভৈরব মন্দির ও বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইল। ২০শে ফাল্গুন, ১৩৮৫ বাং (৫.৩. ১৯৭৯ ইং)। সত্যি বিপুল, বিশাল সেই মূর্তি। এর মাপ জানা সম্ভব হয়নি। এটি যেখানে স্থাপন করা তার ১০০ গজ দূরেই তিতাস নদী। সেখানে নৌকায় এপার-ওপাড় হচ্ছে মানুষ। শহরের অবকাশ এলাকা, যা ওয়াপদা রোডের পাশেÑ মন কেড়ে নেয়। এখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, আবহমান বাংলার লোক ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মোরাল ভাস্কর্যে। তাতে দেখানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ, একুশে ফেব্রুয়ারি। ছেলে-বুড়ে যে কারো নজর কাড়ে। ইচ্ছে হয় ভাস্কর্যগুলো ছুঁয়ে দেখতে। এগুলো প্রতিটি বাংলাদেশীর জীবনের অংশ। অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে। এর আশপাশে খোলা প্রান্তরÑ অনেকটা ঢাকার রমণা পার্কের মতো। সেখান থেকে ওয়াপদা রোড ধরে এগিয়ে গেলেই হাতের বামে পড়ে এগ্রো পাওয়ার প্লান্ট। সেখানে বেশ মোটা পাইপ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে জেনারেটর চালাতে। পাশেই একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বাঙ্কার। বিজন বললেনÑ বাঙালিদের ধরে ধরে সেখানে নিয়ে হত্যা করা হতো। ওই বাঙ্কার আগে যেমন ছিল এখনও তেমনি আছে। সংস্কার ছাড়াই হুবহু আগের অবস্থায় রয়েছে। তার পাশে দাঁড়ালেই যেন ভিতর থেকে ভেসে আসে নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারানো অগণিত, নাম না জানা শহীদের আর্তনাদের শব্দ। মনে হয়Ñ আবার তোরা মাথা তুলে দাঁড়া।
(গত ৯ই ডিসেম্বর জীবনে প্রথম ব্রাহ্মণবাড়িয়া বেড়াতে যাই। একদিনের সময় নিয়ে আমার এক আত্মীয়ের বাসায়। সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের পারাবতে ফিরতে হয় ঢাকায়। তাড়াহুড়ো থাকায় অনেক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নিÑ এ জন্য দুঃখিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


