রাত প্রায় সাড়ে দশটা বিজয় সরণীর সিগনালটা কিছুতেই ছাড়ছেনা। আধঘন্টা হয়ে গেছে বাসে উঠেছি। মহাখালির ডিওএইচএস এর এক বাসায় টিউশনি ছিল। প্রথম দিন পড়াতে গিয়ে নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে করতে একটু দেরি হয়ে গেছে। পান্ডত্যি খারাপ দেখায়নি। স্টুডেন্টকে বেশ খুশি খুশিই মনে হয়েছে। তার মাকেও দেখলাম একটু চেন্জ। শুরূর দিকের দেখ পার কিনা ভাবটা আর নেই। হয়ত স্টুডেন্ট তার মাকে কিছু বলেছে। তাই ভদ্রমহিলার আন্তরিকতার আর কমতি নেই। খুটিয়ে খুটিয়ে সব জিঙ্গেস করছিল। কোন হলে থাকি, কয় ভাইবোন, বাবা কী করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। এদিকে আমার ডাইনিং বন্ধ হবার সময় ঘনিয়ে আসছে।তাই পরের দিন সময়টা ঠিক করে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম হলে এসে রাতের খাবার ধরতে।কিন্ত এই লম্বা সিগনালটা আমার বারটা বাজিয়ে ছাড়ল। বাংলাদশের রাস্তা ঘাটের এই জ্যাম কবে যে কমবে কে জানে? কত মূল্যবান সময়ই না আমাদরে শেষ হচ্ছে এই রাস্তায়। জানজটে অপচয় করা সময় টুকু কাজে লাগাতে পারলে আমরা হয়ত আরও অনেক দুর এগিয়ে যেতাম ।এ সরকার বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ করতে চায়। তাই সব কিছুতেই একটা ডিজিটাল ডিজিটাল ভাব আনা দরকার। রাস্তা ঘাটের ব্যাপারটাও সরকারের মাথায় আছে নিশ্চয় । রাস্তাঘাটে অবশ্য ডিজিটালাইজেশেনের ছোয়া অনেক আগেই লেগেছে।প্রতি মোড়ে মোড়ে লালবাত্তি সবুজবাত্তি ঘড়ির কাটা মেনে যথাসময়ে নিবে আর জ্বলে।কিন্তু রাস্তাঘাট ডিজিটাল হলেও ট্রাফিক পুলিশের মনটা এখনও ডিজিটাল হয়নি। তিনি তার ইচ্ছে মত হাত উঠান নামান । আর আমি পড়েছি আজ হাত উঠানোর কবলে। ট্রাফিক ভাই সেই যে হাত উঠিয়েছেন আর নামাচ্ছেন না। হয়ত তিনি নিজের হাতের শক্তি পরিক্ষা করছেন। দেখছেন টানা কতক্ষন হাত উঠিয়ে রাখতে পারেন । কিন্তু এদিকে আমার খবর হয়ে যাচ্ছে। খাবার না হয় একুশে হলের সামনে থেকেই খেয়ে নিব।কিন্তু বারটার আগে হলে গিয়ে AAPG (American Association of Petroleum geophysicists) এর মেমবারশিপ ফরমটা রিনিউ করতে না পারলে আমার মেম্বারশিপ বাতিল হয়ে যাবে। আজই লাস্ট ডেট।ফরমটা পূরণ করি করি করে আর করা হয়ে উঠেনি।আমার এই এক বদ অভ্যাস। কোন কাজই লাস্ট আওয়ার এর আগে শুরূ করা হয়ে উঠেনা। কবে যে এর জন্য ভীষন ধরা খাই কে জানে। সুমনকে বলেছিলাম ওর সিলেট বেসিন এর উপর করা রিপোর্টের সফট কপি আমাকে মেইল করতে। হয়ত সে মেইল করেছে । ওটাও পড়তে হবে এবং আমার কপিটাও ওকে মেইল করতে হবে ।তিনদিনের মধ্যে রিপোর্টের হার্ড কপি জমা দিতে হবে, সময় বেশী নেই। লেখা অবশ্য কমপ্লিট । জাস্ট ওর কপিটার সাথে মিলিয়ে দেখব। শ্রীলঙ্কায় এলটিটিইর সাথে ওই দেশের সেনাবাহীনীর বেশ লড়াই হয়ে গেল।এই দেশটি এবং গেরিলা বাহীনিটি সম্পর্কে বেশ জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। হেনসিকে (আমার শ্রীলংকান ফেস বুক ফ্রেন্ড) বলেছিলাম আমাকে এসম্পর্কে কিছু ইনফরমেশন দিতে এবং রিলায়েবল কিছু ওয়েব এড্রেস পাঠাতে।হয়ত পাঠিয়েছে ওগুলোও পড়ব এবং ওয়েব সাইট গুলোতে ঢুকব। ওদিকে বিষাক্ত আলোর সাথে আমার বেশ জমে উঠছে। প্রায় প্রতিদিনই ওর সাথে কথা হয়, বেশ ভাললাগে আমার মেয়েটিকে। অনেক কিছুই বেশ গভীর ভাবে চিন্তা করে মেয়েটি, ইনবক্স টা চেকে করা দরকার ওর নতুন কোন মেইল আছে কীনা।
কাজের চিন্তার বেড়াজালে যখন আমি ঘুরপাক খাচ্ছি এর মধ্যে কোন এক সময় ট্রাফিক ভাই ওনার হাতটি নাময়িছেন। গাড়ি বেশ জোরশোরেই যেতে লাগল। পনের মিনিটের মধ্যে বাস হল গেইটে চলে আসল । গাজী রস্টুরেন্ট থেকে খাওয়া শেষ করে হলে রূমে পৌছতে পৌছতে সাড়ে এগারটা। পিসিটা দ্রুত অন করলাম । আমি SMILE এর লাইনটা ইউজ করি,স্পীড বেশ ভালই,10-16kbs, বেশিক্ষন হয়তো লাগবেনা ফরমটা রিনিউ করতে। ফরম রিনিউ এর কাজটা শেষ হলে ড্রেস চেনজ করে ফ্রেশ হয়ে পরে বসা যাবে বাকী কাজ গুলো নিয়ে । কাল এগারটার আগে কোন ক্লাশ নেই। তাই যতক্ষন খুশি রাত জাগা যাবে। রাতে সাধারনত নেট যায়না, কাজেই নন স্টপ কাজ করতে পারব ।
আরে!! একি!
কানেকশন বারে রেড ক্রস কেন?
সাধারনত এরকম হয়না আমি টিউশনি থেকে এসে কখনও দেখি নাই যে নেট নেই, তবে আজ হলোটা কী?কোথাও কোনো তারটার ছিড়ে যায় নাই তো? নাহ চিন্তা করার সময় নেই,আগে আমার ফরম পূরন করা চাই। ডান পাশের রূমে নাজিম SMILE ইঊজ করে, বামপাশে খালিদ, রনি ওদরেও একই লাইন, তাই দ্রুত চলে গেলাম নীচতলায সালেহর রূমে । ও আবার Bracnet চালায় , যদিও স্পীড অনেক কম তবুও যে সময় আছে হয়ত তাতে হয়ে যাবে। দুর্ভাগ্য আমার। সালেহর রূমটা বন্ধ । আসে পাশে আছে কীনা জানার জন্যে মোবাইল বের করলাম। সালেহকে ফোন দিব।
হ্যালো!
তুই কোথায়?
আমি নোয়াখালি (ওপাস থেকে সালেহর কন্ঠ)।
শীট!! ভূলটা আমারই,সালেহ গতকাল বাড়ি গেছে।আমিই ওকে হল গেইট পযন্ত এগিয়ে দিয়েছি। তাড়াহুড়োই একদম মনে ছিলনা।
এখন উপায়!
ওর ছোট ভাইকেও পাওয়া যাবার সম্ভাবনা নেই । ওর আজ পরীক্ষা ছিল, পরিক্ষা শেষে এখন এখন বেশ রিলাক্স এ আছে। হয়ত পুকুর পাড়ে বন্ধুদের সাথে বসে হাওয়া খাচ্ছে অথবা কার্জনে বসে কার্ড খেলছে। কার্জনের প্রতিটা ছেলে একটি এক্সাম শেষে যে কাজটি করে । ছুটে গেলাম শামিমেরর রূমে । এটাও বন্ধ কিনা কে জানে।শামিম বাধঁনের প্রেসিডেন্ট । বাঁধনের সাথে আমার দীর্নদীনের সম্পৃক্ততার সুবাদে ওর সাথে ঘনিষ্ঠতা । যাক রূমটা খোলা। তিন চার বন্ধু মিলে ছবি দেখছে।"APOCALYPTO ” । আমার প্রিয় ছবির একটি। সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখছে। নায়ক(নাম মনে পড়ছেনা) জঙ্গল এর ভিতর দিয়ে দৌড়াচ্ছে আর পিছনে ধাওয়া করছে একদল দূর্বত্ত । আর ওদিকে বৃষ্টি শুরূ হয়ে গেছে যে কোন সময় মারা যেতে পারে জঙ্গলের কুয়ায় আটক ওর স্ত্রী এবং দুই সন্তান। সিনেমার এই ক্লাইমেক্স পূর্ণ মহুর্তে আমার রূমে তড়িৎ প্রবেশ ওরা কেও খেয়াল করলনা। কোন কথা না বলে মাওসটা হাতে নিলাম,সিনেমা স্টপ করলাম। সবাই আমার আকস্মিকতায় থ হয়ে গেছে । চরম বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্ত ওসব ভাবার এখন সময় নেই । আগে কাজ শেষ করি পরে বিস্তারিত বলা যাবে।
ফরমটা রিনিউ শেষে ওদের কে আমার এ আচরনের কারন বুঝিয়ে বলে রূমে ফিরে এসেও আমি স্বস্তি পাচ্ছিলামনা । একাধিক কাজ যখন মানুষের হাতে থাকে তখন এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরূত্ব পূর্ণটি মানুষকে টেনস রাখে। যখন প্রথমটা শেষ হয়ে যায় তখন অন্যটা এসে সে জায়গা দখল করে । অন্য কাজ গুলোর চিন্তা আমাকে ভীষন ভাবে নাড়া দিতে লাগল। বিশেষ করে রিপোর্টের ব্যাপারটা । যদি আমি আজ এডিটিং এর কাজ শেষ করতে না পারি তবে আমার রিপোর্ট যথা সময়ে জমা দেওয়া হবেনা । আর যদি রিপোর্ট জমা না দিতে পারি আমার নম্বরের খরাটা আরও বেড়ে যাবে এবং স্যারের ব্ল্যাক লিষ্টের তালিকায় আমার নামটা আরও দু-একধাপ উপরে উঠবে । আর ওদিকে সুমন মনে হয় বার বার মেইল চেক করছে আমার রিপোর্ট কপিটার আসায়। ওরটা এডিট করবে তারপর ঘুমাবে ।আধা প্রযুক্তি -আধা প্রাচীন মনে হয় বেশ ক্ষতিকর। কোনটাকেই ঠিকমত কাজে লাগানো যায়না। একটি দেশকে উন্নতির শিখরে উঠেত হলে সে দেশকে প্রযুক্তি গত দিক দিয়ে উন্নত হতে হবে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ছোয়া আনতে হবে। আর এর জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চত করা অপরিহার্য। কিন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক হলে
এখন পর্যন্ত ইন্টারনেট কানেকশান নেই, এমনকি মেয়েদের হল গুলোতে রয়েছে কম্পিউটার ব্যবহারে অনেক বাধ্যবাধকতা। আমি জানিনা আমার এ বিশ্ববিদ্যালয় কি এমন খারাপ দিক খুজে পান প্রযুক্তি ব্যবহার এর মধ্যে যার জন্য কম্পিউটার ব্যবহারে বিধি নিষেধ আরোপ করে রেখেছেন।প্রযুক্তির খারাপ দিক গুলো প্রযুক্তি দিয়েই বন্ধ করতে হবে।ওটাকে নিষিদ্ধ করে নয়। আমাদের সরকার আমাদের দেশকে ডিজিটাল করার উদ্যেগ নিয়েছে। আর নিশ্চয় তারা জানেন যে এটা করতে গেলে দেশের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্র গুলোকে প্রথমে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে, সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে । আর যখন তারা এটা করবেন তখন প্রথমে চোখ পড়বে এই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর । তখন হয়ত আমার আর নেট থাকবেনা এই কথাটা ভাবতে হবেনা অথবা শুনতে হবেনা আমার মেয়ে বন্ধুর মুখে যে সে পিসি ইউজ করতে পাচ্ছেনা। ভাবতে খুব ভাল লাগছিল। এত গুলো কষ্টের মাঝেও কেমন যেন একটা সুখ অনুভতি বয়ে যাচ্ছিল। প্রযুক্তিময় উজ্জল এক বাংলাদেশের সপ্ন দেখতে দেখতে সেদিন আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন দুপুর বেলা। ক্লাশ শেষে রূমে ফেরার পর আমার রূমমেট যে তথ্যটি দিল তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। প্রস্তুত ছিলনা আমার সপ্নময় মন। আমি ভূলে গিয়েছিলাম আমার দেশের রাজনিতীর আসল রূপ, ভুলে গিয়েছিলাম যে এরা নিজের সার্থের আগে দেশকে কখনও দেখেনি, কোনদিন দেখবেওনা। আমি ধোকা খেয়েছিলাম আর দশটা সহজ সরল দেশবাসীর ন্যায়। নেট কানেকশান না থাকার কারনের পিছনে কোন তার ছেড়া বা স্মাইল দায়ী নয়, এর পিছনে রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি দানকারী বর্তমান সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।ব্যাপারটা আমি মানতে পারছিলামনা।কিন্তু সত্য এইযে, ছাত্রলীগের চাহিদা পূরন করতে SMILE ব্যর্থ হয়েছে, তাই তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। BRACNET ও হয়ত ব্যর্থ হবে, সেটিও চলে যাবে। হয়ত আসবে অন্য কেউ যারা ব্যর্থ হবেনা ছাত্রলীগের চাহিদা পূরন করতে কিন্ত ব্যর্থ হবে আমাদের আশা পূরন করতে এবং ব্যর্থ হবে আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখার সপ্ন।এবং আমরা যারা সাধারন জনগন তারা বেচে থাকব এভাবে দেশকে শোসন করার ডিজিটাল পদক্ষেপ গুলো দেখে দেখেই ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০০৯ দুপুর ২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



