শেষ বিকেলের আলোয় .. (৩)
ভয় পাবার একটা মাত্রা আছে, সেটা পরিয়ে গেলে মানুষ ভয় পেতেও ভুলে যায়। আমার এখন সে রকম একটা অবস্থা চলছে। শিকারী প্রানীরা শিকারের গন্ধ ঠিকই পায়, বুঝে যায় যে এটাকে কায়দা করে ফেলা যাবে। আমার সামনে বসে থাকা তিন চারটা ক্ষুধার্ত শেয়ালের লালা ঝরা মুখের দিকে তাকিয়ে গা গুলিয়ে ওঠে আমার। মনে মনে বলি - নে, শুরু কর। যে কোন ভাবেই হোক, আজ মরতে আমাকে হবেই।
হঠাৎ করেই কেমন যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে শেয়ালগুলো। নাক উঁচু করে কিসের গন্ধ শোঁকে ... তারপর একে একে উঠে দাঁড়ায়। কেন যেন হাসি পেয়ে যায় আমার, নিশ্চিত আরেকদল শেয়াল আসছে ... ওদের সাথে মারামারি করে আমাকে ছিঁড়ে কে কতটা মাংস নিয়ে যেতে পারে তার প্রতিযোগিতা শুরু হবে এখনই। হাত পা বাঁধা একটা মানুষ যে কি পরিমান অসহায়, তা আজ বুঝতে পারছি। আচ্ছা, খুব বেশীক্ষন কি সহ্য করতে হবে আমাকে? কোথায় বসাবে প্রথম কামড়টা? গলায় বসালেই ভাল, তাহলে বেশী কষ্ট পাবোনা।
কাশের ঝোপের মধ্যে দিয়ে কোন একটা প্রানীর দ্রুত ছুটে আসার শব্দ শুনতে পাই, লক্ষ্য করি শেয়ালগুলিও কেন যেন পিছিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। ওদের সামনের তাজা খাবারটাকে রেখে দূরে সরে যেতে ওদের বাধ্য করছে কিছু, নিচু গলায় কুঁই কুঁই শব্দ করে ওরা জানান দিচ্ছে বিরক্তির। হঠাৎ কুকুর ডেকে ওঠে কাছে কোথাও, সেই ডাকটা ক্রমেই এগিয়ে আসে, আর শিয়ালগুলোও অদৃশ্য হয়ে যায় কাশের বনে। মুহূর্তকাল পরে আমার সামনে এসে দাঁড়ায় মিশমিশে কালো একটা মাঝারি আকারের দেশী কুকুর। বুঝতে পারি শেয়াল গুলোকে তাড়া করতেই এর আগমন, কিন্তু এখানে আমাকে এভাবে পরে থাকতে দেখে বেচারী কুকুর বেশ ভড়কে গ্যাছে। কাছে এসে কুকুরটা আমার সারা গা শুঁকে দেখে। তারপর তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দেয়।
বেঁচে থাকবার শেষ আশাটা উঁকি দিয়েছে। আমার আশে পাশে ঘুরে ঘুরে ঘেউ ঘেউ করছে কালো কুকুরটা। আশা করছি ওর সাথে ওর মনিব আছে ধারেকাছেই কোথাও। সে জন্যেই কুকুরটা চাইছে যেন ওর মনিব আমাকে দেখতে পায়। জানিনা সেটা সম্ভব হবে কি না। কিন্তু আমার মাথায় চলছে অন্য আরেকটা চিন্তা। যদি বেঁচেই যাই, আমি কি কামালের ওপর ঠিক এমনি করে প্রতিশোধ নেবো? জীবনের চূড়ান্তমজবজ যে রুপটা আমি আজ এই চরের বালিতে শুয়ে শুয়ে দেখলাম, তা কি আমি কামালকেও দেখাবো? মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখার পর আমি কি পারবো আর কারও দিকে স্মিথ এন্ড ওয়েসন রিভলবারটা তুলে ধরে ভয় দেখাতে? মৃত্যু যে কত ভয়াবহ, তা নিজের সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে উপলব্ধি করছি আমি।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আট নয় বছরের ছেলেটি। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওকে দেখে অস্ফুটে কেবল বলতে পেরেছিলাম "পানি"। ছেলেটা দৌড়ে গিয়ে আঁজলা ভর্তি পানি এনে দিয়েছে আমাকে। ওর ছোট্ট হাতের ফাঁকা দিয়ে অনেকটা পানিই পড়ে গিয়েছে, কিন্তু এই চরের মাটিতে জমে থাকা পচে যাওয়া বৃস্টির সেই পানি টুকুই যেন আমার জীবনটা ফিরিয়ে দিল আজকে। শেষ বিকেলের এই ম্লান আলোতে আমি যেন নতুন করে জন্ম নিলাম। অনেক অজানাকে জানতে পারলাম, নিজেকে চিনতে পারলাম, উপলব্ধি করতে পারলাম জীবনের গুরুত্ব।
উবু হয়ে ছেলেটার দিকে পেছন ফিরে বসেছি আমি। ছেলেটার হাতের শন কাটা ধারালো কাঁছি এগিয়ে আসছে আমার হাত দুটোকে বাঁধনমুক্ত করতে। আমি চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করছি মুক্তি পাবার।
~ সমাপ্ত ~
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০০৯ সকাল ১১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



