ছোট্ট মাথা, ছোট চিন্তা, ছোট্ট ছোট্ট ভুল
১.
ছোটবেলায় জীবন অনেক সহজ ছিল। চিন্তা ভাবনা ছিলনা তেমন। সকালে উঠে স্কুলে যাওয়াটা একটা যন্ত্রণার ব্যাপার ছিল। ছোট্ট মাথা, ছোট বুদ্ধি। একদিন মা ডেকে তোলার আগেই ঘুম ভেঙ্গে গেল, ভাবলাম লুকিয়ে থাকি, স্কুলে যাওয়া লাগবে না। সাথে সাথে লুকিয়ে পড়লাম খাটের নীচে। একটু পর মা এসে আর খুঁজে পান না আমাকে। আমি তো মহা খুশী। কিন্তু আমার এই খুশী বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, এক সময় মা কান ধরে খাটের নীচ থেকে টেনে বের করলেন। তারপর আমি কাঁদতে কাঁদতে উঠে বসলাম স্কুল ভ্যানে
২.
একটু বড় হয়েছি তখন। বাসে করে স্কুলে যাই। একদিন এলাকার আরও কয়েকজন মিলে স্কুল ফাঁকি দিয়ে গেলাম শ্যামলী হলে ছবি দেখতে। একটু ভয় ভয় করছিল। কেউ যদি দেখে ফেলে। ছবিটা ছিল জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন আর দিতির একটা ছবি। সুন্দর একটা গান ছিল "ভেঙ্গেছে পিঞ্জর, মেলেছে ডানা, উড়েছে পাখী, পথ অচেনা ..."। ভালই লাগল ছবিটা। ছবি দেখে ভালয় ভালয় বের হলাম হল থেকে, এবার বাসে করে চলে যাব কল্যাণপুরে। মা কে বলবো যে স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছে। কঠিন বুলেট প্রুফ প্ল্যান। মনের আনন্দে বাসে উঠলাম। বাসের গেট দিয়ে ঢুকেই বাম পাশে যে অগ্নিদৃষ্টিটা দেখলাম, সেটা আমার বাবার। আমার অসুস্থ বাবা পথে গাড়ী নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ওই বাসে করেই বাসায় ফিরছিলেন। ফলাফল ... আর না বলি
৩.
বেশ কিছুদিন পর ছোট্ট মাথায় আবার স্কুল পালানোর ভুত চাপলো। আগের বারে শিক্ষা হয়েছে অনেক। তাই এবার ঠিক করলাম বাবার আসা যাওয়ার পথে আর না। সম্পূর্ণ উল্টোদিকে কোথাও যেতে হবে। যাবার একটাই ভাল জায়গা, মিরপুর চিড়িয়াখানা। যেই ভাবে সেই কাজ। স্কুল ব্যাগে ভরে নিলাম এক্সট্রা একটা শার্ট আর জুটিয়েও ফেললাম কয়েকজন সমমনা বন্ধু। সারাদিন হৈহুল্লোর করে বিকেলে বাসায় ফিরবো। চিড়িয়াখানার গেটে দেখা হয়ে গেল এলাকার এক মামার সাথে। উনি উনার বান্ধবীর সাথে ঘুরতে এসেছেন। অন্য শার্ট পড়া দেখে ঠিক বুঝতে পারলেন না যে স্কুল পালিয়েছি। ছোট্ট মাথায় খেললো যেহেতু মামা প্রেম করতে এসেছেন, কাউকে বলবেন না আমাদের এই মোলাকাতের কথা। সুযোগ বুঝে আমিও মামার কাছ থেকে বিশ টাকা নিয়ে নিলাম। তারপর সোজা বাসায়। এর দুই তিন দিন পর আমি আর মা দাঁড়িয়ে আছি আমাদের বারান্দায়। কোত্থেকে হাজির হলেন সেই মামা। আমার তো হার্ট এটাক হবার জোগাড়। এসে আম্মার সাথে কথায় কথায় বলে দিলেন সেদিন চিড়িয়াখানায় দেখা হবার কথা, শুধু চেপে গেলেন তার সঙ্গে থাকা মেয়েটার কথা ...
৪.
স্কুলে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড দেয়া হচ্ছে। সামনের বেঞ্চে বসা এক ছেলে রিপোর্ট কার্ড নিয়ে স্যারের কাছে গিয়ে বলল যে ওর একটা সাবজেক্টে নম্বর ভুল আছে। স্যার রেজাল্ট শিট মিলিয়ে রিপোর্ট কার্ডের নাম্বার কেটে দিয়ে ঠিক করে পাশে ইনিশিয়াল দিয়ে দিলেন। আমরা সবাই পরে দেখলাম কি করা হয়েছে ওর কার্ডে। এদিকে আমি আরবিতে পেয়েছি ০৭। ক্লিন ফেল। এটা দেখলে কপালে নিশ্চিত ধুপ ধাপ পড়বে কয়েকটা। ক্লাস শেষে সংসদ ভবনের এক চিপায় বসে সুন্দর করে ০৭ কেটে ৭০ করে দিয়ে ইনিশিয়াল দিয়ে দিলাম। কাজটা বেশ নিখুঁত হলো। কনফিডেন্স বেড়ে গেল আমার। অংকে পেয়েছি ৩৩ না ৩৪, কেটে নম্বর বাড়িয়ে নিলাম। বাংলা ইংরেজিতেও নম্বর পছন্দ হলো না। কেটে সুন্দর করে নাম্বার বাড়িয়ে দিলাম। কাটাকুটি শেষ হলে দেখি মোটামুটি সব গুলো নাম্বারই কাটাছেড়া করা হয়ে গেছে। কিন্তু তখন তো আর কিছু করার নাই। ঢিল ছুড়ে দেয়া হয়েছে, আটকানোর উপায় নাই। যা হোক, সেই রিপোর্ট কার্ডই তুলে দিলাম মা'র হাতে। সেই রাতে আমার কপালে জুটল বৃষ্টির মত মাইর আর বোনাস হিসেবে পরদিন থেকে আরবির হুজুর আর অংকের মাস্টার
আজকে এই পর্যন্ত থাক, আরেকদিন বাকি গল্প বলবো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


