
আমার মত শহর কেন্দ্রিক মানুষেরা গ্রামে যাবার ব্যাপারে বরাবরই উৎসাহী থাকেন। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু ছুটি নিয়ে গ্রামের নির্জন শ্যামলিমায় চলে যেতে চায় মন। দাদাবাড়ী নানাবাড়ী তাই সবারই অনেক প্রিয় জায়গা। ছুটোছুটির জন্য বিশাল খোলা প্রান্তর, মা'র শাসনের তোয়াক্কা না করে ঘুরে বেড়ানো আর দুরন্তপনা, মজার মজার পিঠেপুলি - নানা দাদা বাড়ী আসলেই চরম মজার। ছোটবেলায় ট্রেনে করে সারা দিন লাগিয়ে যেতে হতো গাইবান্ধায় দাদুবাড়ীতে অথবা নেত্রকোনায় নানা বাড়িতে। আমার অবশ্য গ্রাম দেখা এই দুটি জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে অবশ্য আল্লাহ ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন গ্রামের নয়টা বছর কাটানোর। সে সময়ের প্রতিটা দিন এখনও মনে পড়ে।
প্রথম যখন রাজশাহীতে যাই, তখন আমার গ্রাম সম্বন্ধে ধারনা ওই দাদা নানাবাড়ি পর্যন্তই। যেদিন প্রথম রাতে থাকলাম গ্রামে, সেদিনের কথা আজও মনে আছে। সন্ধ্যে হতেই নীরবতা নেমে এলো চারদিকে। কেবল চারিদিকে সন্ধ্যের ঘরে ফেরা পাখীদের কলকাকলি আর ডানা ঝাপটানোর শব্দ। এমন নীরবতা শহরে কোথায়? আমরা যেখানে ছিলাম, সেখানে প্রথম আট মাস ইলেক্ট্রিসিটি ছিলনা। প্রথম রাতেই আমরা শহুরে কিছু ছেলে, হাতে কেরোসিনের লন্ঠন নিয়ে ছুটলাম মুদি দোকানে। সেখানে লাইন দিয়ে দুটাকার তেল নিলাম এক এক জন। ঘরে ফিরে জ্বালালাম লন্ঠন, অনেকেই জানতোনা কি করে সেটা জ্বালাতে হয়। একটু পরেই বুঝতে পারলাম অন্ধকার কাকে বলে। এ অন্ধকার শহরের ফ্যাকাসে অন্ধকার নয়, ঘুটঘুটে কালো আঁধার যাকে বলে। নিজের হাত চোখের সামনে ধরলেও দেখা যায়না, এমন অন্ধকার। কিছুক্ষণ পরেই চারপাশে শেয়াল ডাকতে লাগলো। ভয়াবহ অবস্থা। রাতে রান্না হয়েছিল গরুর মাংস, ডাল আর একটা সবজি। বাসায় সবজি খেতাম না, এখানে সবার বাটিতে আগে থেকেই সবজি দেয়া ছিল, তাই খেতে হলো। খেতে বসে বুঝলাম আমরা শহরে যে সবজি খাই, এই সবজি তা থেকে অনেক বেশী স্বাদের। পরে এক সময় মা খুব অবাক হয়েছিলেন আমার প্লেট ভরে সবজি নেয়া দেখে। সময় বদলে যায়, বদলাই আমরা সবাই।
সেদিন রাতে অনেকক্ষন গল্প করে আমরা শুতে গেলাম যে যার ঘরে। সকালে উঠে একজন আরেকজনকে দেখে হাসতে হাসত গড়িয়ে পড়ছিলাম। ঘটনা কি? ফর্সা ফর্সা ছেলেগুলো এক রাতে এমন ভূতের মত হয়ে গেল কিভাবে? একটু পরে বুঝলাম ঘটনা। সারা রাত সবার ঘরেই জ্বালানো ছিল লন্ঠন। কেরোসিনের লন্ঠনের কালো ধোঁয়া বদ্ধ ঘরে আটকে গিয়ে সবার মুখ কালো করে দিয়েছে। সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে সেই কালি তুললাম সবাই। বুঝলাম, শোবার সময় নিভিয়ে দিতে দিতে হবে লন্ঠন।
পরদিন রাতে খেয়ে দেয়ে গল্প করতে করতে এক সময় খেয়াল হলো সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। মোড়ের দোকানেই পাওয়া যায় সিগারেট, কিন্তু সেই দোকান সন্ধ্যের আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন বেশ কিছুটা দুরের এক বাজারে গেলে সিগারেট পাওয়া যাবে, বলল সবাই। সেখানেই যাব, কিন্তু কেউ সাথে যেতে রাজি হচ্ছিল না। একটু ভয় ভয় করছিল যেতে, কিন্তু সেটা তো আর প্রকাশ করা যাবে না, ইজ্জতের ব্যাপার। দশ পনেরো মিনিটের হাটা পথ, যেতে যেতে ভয়টা বেশ জাঁকিয়ে ধরল। এমন অন্ধকার আগে তো দেখিনি। পথের ধারে পুকুর আছে কয়েকটা, মাটির রাস্তা, ঘুটঘুটে আঁধার, কিচ্ছু দেখা যায়না, অপরিচিত এলাকা। অনুমান করে যেতে যেতে একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে সামলে নিলাম। পুকুরের পাড়ে চলে গেছিলাম, বুঝতে পারলাম পায়ের তলায় নরম মাটি টের পেয়ে। যা হোক, কোন মতে দোকানে গিয়ে ফিরে আসছি, হঠাৎ ঘাড়ের পাশে কে যেন ভৌতিক নিঃশ্বাস ফেললো। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে যাওয়ার অনুভূতি পেলাম। দৌড়ে পালানোর অদম্য ইচ্ছে হলো। কিন্তু পথঘাট তো চিনিনা, কোন দিকে দৌড়বো? তা ছাড়া দেখাও যায়না কিছু। কাজেই দাঁড়িয়ে গেলাম। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার ঘাড়ের ওপর সেই নিঃশ্বাস। এবার নিঃশ্বাসের শব্দের পর কিছু চিবানোর মত শব্দও পেলাম। ভয়াবহ অবস্থা। তবে ভয়ের একটা সীমা আছে। ভয়ের চোটে জ্ঞান হারিয়ে না ফেললে না কি ভয়টা কমে যায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ সামনের দিকেই যায়, সামনে যাই থাকুক না কেন। আমার হলো সেই অবস্থা। ঘুরে দাঁড়ালাম কি আছে পেছনে দেখার জন্য। আজ ভুতের সাথেই মারামারি হয়ে যাবে আমার। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলামনা পেছনে। বাতাসে হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করলাম কিছু, পেলামনা। তখন আবার শুনতে পেলাম নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটা। এবার ঠিক ঘাড়ের ওপর না, একটু দূরে। একটু এগিয়ে গেলাম শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। অন্ধকার সয়ে আসায় দেখলাম রাস্তার পাশে বাঁধা আছে একটা মোষ। মোষ অনেক জোড়ে শব্দ করে শ্বাস ফেলে, জানলাম সেদিন।
বাকিটা পথ নির্বিঘ্নেই চলে এলাম।
গ্রাম আমাকে এত টানে এখন। আলো আর কাঁচের এই শহরে থাকতে হাঁপিয়ে উঠি। নিয়তি পথ বেঁধে দিয়েছে এখানেই। পালানোর উপায় নেই এখান থেকে ...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

