somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বারতা পেয়েছি মনে ... শেষ পর্ব

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সোমা ছুটে বের হয়ে গেছিল সেদিন ঘর থেকে। মেয়েরা তাদের চোখের জল সবাইকে দেখাতে চায় না। এত অসহায় লাগছিল তখন, জানেন। একটু পরে নার্স এলে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আমার ভাল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু। নার্স কিছু বলতে পারেনি।

এরপর থেকে আমার জীবনটা বদলে যেতে থাকে। বাবা মা খবর পেয়ে এসে আমাকে ঢাকায় নিয়ে গেলেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো। সবার মুখ দেখে বুঝলাম যে রিপোর্ট ভাল না। একদিন ডাক্তার আমার বেডের পাশের টেবিলে সিটি স্ক্যান রিপোর্ট রেখে চলে গিয়েছিলেন। স্লাইডগুলো দেখে যা বোঝার বুঝে গেলাম আমি। আমার মাথার ভেতর দানা বেঁধেছে ছোট্ট একটা টিউমার। স্ক্যান রিপোর্টে লাল দাগ দেয়া সেই চিহ্নটাই আমার বেঁচে থাকার সময় নির্ধারণ করে দিলো। মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় ছাদ থেকে পড়ে যাবার ঘটনাটা। সে সময় দেশে এত উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিলনা। আমি প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। মাথা ফাটেনি, কিন্তু ইন্টারনাল ব্রেন হ্যামারেজ হয়েছিল। সেই রক্তটা রয়ে গেছিল ভেতরেই। টিউমারের কারণ সেটাই।

বাবা তার গ্রামের জায়গা সম্পত্তি বিক্রি করে আমাকে নিয়ে এলেন সিঙ্গাপুরে। অনেক রকম ট্রিটমেন্ট করা হলো আমার। এর মাঝেই ডাক্তার একদিন বুঝিয়ে দিলেন যে টিউমারটা অপারেশন করে ফেলে দেবার উপায় নাই। মগজের এত ভেতরে চলে গেছে ওটা, যে অপারেশন সফল হবার সম্ভাবনা খুব কম। এভাবে থাকতে থাকতে একসময় শেষ হয়ে যাবো আমি। সময় বেঁধে দিলেন নয় মাসের মত।

নিজেকে ফাঁসির আসামীর মত লাগে এখন, যে জানে কবে তার ফাঁসি হবে। একটা একটা করে সেকেন্ড চলে যায়, আমি একটু একটু করে এগিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে। সিঙ্গাপুরে আসার কিছুদিন পর আমার চোখের আলোটাও নিভে গেল। সেদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দেখি সব অন্ধকার। খুব অবাক হয়ে ভাবছিলাম হাসপাতালে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল না কি। তারপর বুঝলাম যে আমি কিছু দেখতে পারছিনা। চিৎকার করে কেঁদেছিলাম সেই দিন, এই প্রথম। মরে যাবার কষ্ট আর আতঙ্কটার চাইতেও কিছু দেখতে না পাবার কষ্টটা বেশী অনুভব করেছিলাম। সব চাইতে বেশী দেখতে ইচ্ছে করতো মা'কে। মা অবশ্য এসেছিলেন কয়েকদিন পড়েই, আমাকে জডিয়ে ধরে সে কি কান্না তার। কষ্টের একটা পর্যায় আছে, যখন মানুষ কাঁদতেও ভুলে যায়, আমার তখন তেমন অবস্থা। মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। মা'র সেই কান্না আমাকে স্পর্শ করছিলোনা। ভাবছিলাম - আমি চলে গেলেও মা এভাবে কিছুদিন কাঁদবেন, এক সময় সে কান্নাও থেমে যাবে। আস্তে আস্তে সয়ে নেবেন কষ্টটা। ব্যস্ত হয়ে যাবেন দৈনন্দিন জীবনে। এছাড়া উপায় কি? কিন্তু উনি তো আমার মা। গভীর রাতে, হয়তো সবার অজান্তে বালিশে মুখ ঢেকে কাঁদবেন অনেক দিন। যত দিন না মা আমার কাছে চলে আসেন। আমি মনে মনে মা'র দ্রুত মৃত্যু কামনা করতাম। এখনও করি।

সোমার সাথে যোগাযোগ ছিল বেশ কিছুদিন। চিঠি লিখত খুব সুন্দর করে। কি সব আবেগী কথা, কত দুষ্টুমি। আমি জানতাম লেখার আগে পড়ে কেঁদে আকুল হতো সে। সিঙ্গাপুরে আসার আগের দিন এসেছিল আমার সাথে দেখা করতে। বলেছিল - আমি জানি তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে। আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য। কেন যেন হেসে ফেলেছিলাম। বলেছিলাম - তুমি জানতে? বলে - "হু, আমরা মেয়েরা আগেভাগেই অনেক কিছু টের পাই। পরীক্ষার হলে তোমাকে বার বার আমার দিকে তাকাতে দেখেই বুঝেছিলাম যে আরও একটা উপদ্রব তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমি নিজে কখন তোমাকে ফলো করতে শুরু করেছিলাম বুঝতে পারিনি। কলেজে এসে তোমাকে খুঁজতাম। নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছি, নিজেকে বুঝিয়েছি এটা ঠিক না। এক সময় হেরে গিয়ে সব ছেড়ে দিয়েছি সময়ের হাতে। জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলে। মানুষ জীবনের রাশ টেনে ধরে ভাবে সে তার জীবনের গতিটাকে বদলে ফেলেছে। আসলে সেটাই জীবনের গন্তব্য ছিল। আমরা সব খেলার পুতুল। আমি যখন একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম তোমার ওপর, সে সময়েই তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লে। আমি যে কি কষ্ট পেয়েছিলাম। মনের মাঝে যেটুকু দ্বিধা ছিল, এক নিমিষে কেটে গিয়ে বুঝেছিলাম তোমাকে কত ভালবাসি। আর তুমি কত খারাপ, আমার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরতে পারলেনা সেদিন।"

হেসে ফেলেছিলাম সেদিনও। সোমা আমার হাতটা নিয়ে খেলা করছিল অনেকক্ষন, আমি কিছুই অনুভব করিনি। শুধু দেখছিলাম। ভালবাসার সার্থকতাকে যারা বিয়ে বলে মনে করেন, তারা ভুল করেন। ভালবাসা ভালবাসাই। সেটা একতরফা হোক অথবা দুতরফা। কাউকে মন থেকে ভালবাসতে পারাটাই ভালবাসার সার্থকতা। না হয় এই জীবনে আমার সোমাকে পাওয়া হলো না। কিন্তু মরে গিয়েও আমার চেতনাটা, আমার আত্মাটা যদি বেঁচে থাকে, তখনও আমি সোমার কথা ভাববো। জানবো সোমা নামের এই অসাধারণ রূপবতী মেয়েটি আমাকে অনেক ভালবাসত।

এখন আমার জীবন এই অন্ধকার ঘরের চার দেয়ালে বন্দি। ঘড়ির কাটার নিরন্তর টিক টিক শব্দটাই আমার সব চাইতে আপন। একটা একটা করে টিক টিক শব্দ করে সে জানিয়ে দিচ্ছে তোমার চলে যাবার সময় এগিয়ে আসছে, তৈরি হও। সবাইকেই এভাবে চলে যেতে হয়, চলে যেতে হবে। কেউ থাকেনি, থাকবেওনা এই পৃথিবীতে। শুধু রয়ে যাবে একরাশ মায়া আর মায়া ভরা স্মৃতিগুলো। রয়ে যাবে শত সহস্র ভালবাসার জানা অজানা কাহিনী।

একটা গান শুনতে খুব ভাল লাগে আজকাল। অনেক সময় শুনতে শুনতে কাঁদি, একা একাই ...

আমি তোমায় না দেখি ...

তুমি আমার না হও ...

আমি যত দূরে যাই ...

তুমি কাছে রও ...


আমি স্বপ্নে তোমায় দেখি ...

ঘুমিয়ে যখন রই ...

স্মৃতিতে এসো তুমি ...

যদি দিশেহারা হই ...

একা হয়ে যাই আমি ...

স্বপ্ন স্মৃতি ছাড়া ...

তুমি ছাড়া মনে হয় ...

আমি তো আমি নই ...


----------------------O--------------------
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১১ দুপুর ১:০০
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শরৎ বন্দনা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৯


শরৎ এলেই আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা
দিনমণি আর মেঘমালার লুকোচুরি খেলা।

রুম ঝুমঝুম নূপুর পায়ে ছুটছে নদীর ঢেউ
ভাটিয়ালি গাইছে গান অচিন সুরে কেউ।

বিলে ঝিলে শাপলা পদ্ম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×