এখানে এসে একটা মজার অভিজ্ঞতা হলো। প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ি ঘর খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে। আমরা সাধারণত মাটির উপর বাসা বাড়ি তৈরী করি, কিন্তু এখানে ভিন্ন অবস্থা। মাটি থেকে প্রায় কয়েক ফুট উচ্চতা পর্যন্ত খুটি, তার উপর বাড়ির ভিত। সম্ভবত এমনটা তৈরী করা হয়েছে বন্যার পানি থেকে রক্ষা পাবার জন্যই। আপার বাড়িটা দোতলা। অসম্ভব সুন্দর। দোতলায় বসে যেকোনো কাউয়্যা লেখক ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা গান লিখে পুরো বিক্রমপুর মাতিয়ে ফেলতে পারবে, আমি নিশ্চিত।
বিকেলে নৌকায় চড়ে ঘণ্টা খানেক ঘুরলাম। সঙ্গী জনা তিনেক শুভাকাঙ্খী, লাজুক হেসে চিনিয়ে দিচ্ছে দিক দিগন্ত। নৌকো চালানো সহজ নয়, আবার কঠিনও নয়। টেকনিক জানা থাকতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই নৌকা জায়গায় ঘুরবে, নতুবা দিক দিশাহীন ছুটে চলবে। আমাদের চেয়ে ওরাই ভালো নৌকো চালাতে জানে! মান সম্মানের প্রশ্ন, তবে দেখলাম, মিনিট দশেক পর আমি ভালোই চালাতে পারছি! যদিওবা মিজানের কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করার মত নয়। জড়তা কাটিয়ে শুভাকাঙ্খীরা কৌতুক বললো, নিজেরাই হেসে কুটোকুটি। চোখ আমার হাসে।
রাত ১০টার দিকে যখন লোকালয় ঘুমে বেহুঁশ তখন আমি এবং মিজান পুনরায় নৌকা চড়ে বসলাম। গুটগুটে অন্ধকার, তবু সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘযুক্ত তারার রাশি ঝুলে আছে পানির পর, কলকল ধ্বনি তুলছে হাতের বৈঠা। যেন, একমনে গাঁয়ের কোনো শতবর্ষী বুড়ো কাঁপা কাঁপা গলায় গেয়ে যাচ্ছে মাটির কোনো গান। আমি মগ্ন হয়ে শুনছি সে গান। বাতাসের আবেশী ছোঁয়া, পানির কুলকুল ধ্বনি, পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ছাড়া চারদিকে আর কোনো সাড়াশব্দ নাই। ভেতরে বয়ে চলেছে স্তব্ধ অচেনা অনুভব, ভাবছি কতকিছু, কতো ভাবনার ঠিকানা ক্ষনিক ক্ষনিক বদল করছি... তার হিসেব নাই। মিজান চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে, কি ভাবছে কে জানে... এভাবেই কেটে গেলো মিনিট দশেক। অথচ তখনো আমরা জানিনা, সামনে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। মিনিট কয়েক পর আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম... তার চারপাশে হাজার হাজার ফোটা ফোটা শুভ্রতা। অবাক বিস্ময়ে ভুলে যাই বৈঠা চালাতে। নৌকা একমনে ধীরালয়ে আমাদের নিয়ে যায় সেই সাদার ভীড়ে। স্তব্ধ বিস্ময়ে মুক হয়ে বসে থাকি। কলমীলতা নৌকা থামিয়ে দেয় হঠাৎ। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে পাটাতনে আবার রেখে দিলাম। এই গুটগুটে অন্ধকারে ছবি তোলার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো শাপলা তোলা। বহু কসরত করে নৌকা এদিক ওদিক নিয়ে আমরা শাপলা তুলছি... শাপলা তুলে নৌকা ভরিয়ে দিচ্ছি...
ফিরে চলছি আমরা। পাটাতনে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি, চোখের সামনে মেঘলা আকাশ, চারপাশে আমার শাপলা ফুল। অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ শাপলার আছে সেটা এখন টের পাচ্ছি। অথচ অতীতে কখনো এই গন্ধটা আমি টের পাইনি। আজ পেলাম। কার সংখ্যা বেশি- শাপলার না তারার? তারারা মেঘের ভারে মুমুর্ষ, আজ। শাপলারাই জেগে আছে কেবল। সাদার রাজ্যের উপর কুলকুল ধ্বনি তুলে ছুটে চলছে নৌকা। এই কুলকুল ধ্বনি... শাপলার ঘ্রান... বন্য বাতাসে বাঁধাহীন জীবন... নি:শেষ হবে আমার, শিঘ্রির। কত যে পিছিয়ে আছি... যন্ত্রনাটা যখন এলো, ডালপালা নিয়েই এলো। দমকা বাতাসের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আমার কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। নিয়তি আমার... চোখ বুঁজে পড়ে রই। ফিরফিরে বাতাসে মাথার চুল, শার্ট ফরফর শব্দ তুলে যখন বুকেতে কাঁপন ধরানোয় ব্যস্ত ঠিক তখন, ফুটফুটে এই শাপলা জাগা রাতে চোখের কোন বেয়ে নি:শব্দে গড়িয়ে পড়তে থাকে অজস্র জলধারা...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

