somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দহন

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লৌহজং এর মাওয়া ফেরীঘাটে নেমে ক্ষনিক পদ্মাকে দেখে নিলাম। হৃদয়হীনা নদি। কত শত মানুষের ঘড়বাড়ি বিলীন করে দিয়ে এই নদী অন্তহীন পথচলায় মগ্ন হয়েছে কে জানে। পুরো নদীটাই কাঁদা পানিতে মাখামাখি। ফুসে উঠছে, বারেবারে। আমাদের বাস আবার যাত্রা শুরু করেছে। মিনিট ত্রিশ পর, ঘোড়দৌড় নেমে আমরা রিক্সা নিলাম। আমরা বলতে আমি আর মিজান। ছেলেটাকে নিয়ে দেশের বহু জায়গায় গেছি। নির্ভেজাল ভালো ছেলে। বিক্রমপুরের পুরোটাই মেঘে জলে মাখামাখি। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। ছাড়া ছাড়া দ্বীপের মত ছোটো ছোটো লোকালয়গুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। নৌকো ছাড়া গতি নাই। চারদিকে সবুজ এবং সবুজ, এখানে জলের পরে মেঘের ছায়া ভাসে। ওরা উড়ে যায়, ওরা জলের পর ভেসে যায়, ওরা জলেতে হাবুডুবু খায়। স্কুল মাঠ পেরিয়েই নৌকা ঘাট। আপা নৌকা পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাই সমস্যা হলোনা। নৌকায় উঠেই মিজান মুখ গোমড়া করে বললো বাসে সে ব্যাগ ফেলে এসেছে!!! কি আর করা। এসব ক্ষেত্রে আমি হইচই না করে ঠান্ডা হয়ে যাই। ধীরেসুস্থে 'গাঙচিলের' হেড অফিসে ফোন করে তাদের জানালাম। ওরা আশ্বাস দিলো সন্ধ্যার দিকেই তারা ঘোড়দৌড় কাউন্টারে ব্যাগ পৌঁছে দিবে।

এখানে এসে একটা মজার অভিজ্ঞতা হলো। প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ি ঘর খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে। আমরা সাধারণত মাটির উপর বাসা বাড়ি তৈরী করি, কিন্তু এখানে ভিন্ন অবস্থা। মাটি থেকে প্রায় কয়েক ফুট উচ্চতা পর্যন্ত খুটি, তার উপর বাড়ির ভিত। সম্ভবত এমনটা তৈরী করা হয়েছে বন্যার পানি থেকে রক্ষা পাবার জন্যই। আপার বাড়িটা দোতলা। অসম্ভব সুন্দর। দোতলায় বসে যেকোনো কাউয়্যা লেখক ঘন্টার পর ঘন্টা কবিতা গান লিখে পুরো বিক্রমপুর মাতিয়ে ফেলতে পারবে, আমি নিশ্চিত।

বিকেলে নৌকায় চড়ে ঘণ্টা খানেক ঘুরলাম। সঙ্গী জনা তিনেক শুভাকাঙ্খী, লাজুক হেসে চিনিয়ে দিচ্ছে দিক দিগন্ত। নৌকো চালানো সহজ নয়, আবার কঠিনও নয়। টেকনিক জানা থাকতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই নৌকা জায়গায় ঘুরবে, নতুবা দিক দিশাহীন ছুটে চলবে। আমাদের চেয়ে ওরাই ভালো নৌকো চালাতে জানে! মান সম্মানের প্রশ্ন, তবে দেখলাম, মিনিট দশেক পর আমি ভালোই চালাতে পারছি! যদিওবা মিজানের কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করার মত নয়। জড়তা কাটিয়ে শুভাকাঙ্খীরা কৌতুক বললো, নিজেরাই হেসে কুটোকুটি। চোখ আমার হাসে।

রাত ১০টার দিকে যখন লোকালয় ঘুমে বেহুঁশ তখন আমি এবং মিজান পুনরায় নৌকা চড়ে বসলাম। গুটগুটে অন্ধকার, তবু সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মেঘযুক্ত তারার রাশি ঝুলে আছে পানির পর, কলকল ধ্বনি তুলছে হাতের বৈঠা। যেন, একমনে গাঁয়ের কোনো শতবর্ষী বুড়ো কাঁপা কাঁপা গলায় গেয়ে যাচ্ছে মাটির কোনো গান। আমি মগ্ন হয়ে শুনছি সে গান। বাতাসের আবেশী ছোঁয়া, পানির কুলকুল ধ্বনি, পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ ছাড়া চারদিকে আর কোনো সাড়াশব্দ নাই। ভেতরে বয়ে চলেছে স্তব্ধ অচেনা অনুভব, ভাবছি কতকিছু, কতো ভাবনার ঠিকানা ক্ষনিক ক্ষনিক বদল করছি... তার হিসেব নাই। মিজান চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে, কি ভাবছে কে জানে... এভাবেই কেটে গেলো মিনিট দশেক। অথচ তখনো আমরা জানিনা, সামনে আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। মিনিট কয়েক পর আমরা যেখানে এসে পৌঁছলাম... তার চারপাশে হাজার হাজার ফোটা ফোটা শুভ্রতা। অবাক বিস্ময়ে ভুলে যাই বৈঠা চালাতে। নৌকা একমনে ধীরালয়ে আমাদের নিয়ে যায় সেই সাদার ভীড়ে। স্তব্ধ বিস্ময়ে মুক হয়ে বসে থাকি। কলমীলতা নৌকা থামিয়ে দেয় হঠাৎ। ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে পাটাতনে আবার রেখে দিলাম। এই গুটগুটে অন্ধকারে ছবি তোলার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো শাপলা তোলা। বহু কসরত করে নৌকা এদিক ওদিক নিয়ে আমরা শাপলা তুলছি... শাপলা তুলে নৌকা ভরিয়ে দিচ্ছি...

ফিরে চলছি আমরা। পাটাতনে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি, চোখের সামনে মেঘলা আকাশ, চারপাশে আমার শাপলা ফুল। অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ শাপলার আছে সেটা এখন টের পাচ্ছি। অথচ অতীতে কখনো এই গন্ধটা আমি টের পাইনি। আজ পেলাম। কার সংখ্যা বেশি- শাপলার না তারার? তারারা মেঘের ভারে মুমুর্ষ, আজ। শাপলারাই জেগে আছে কেবল। সাদার রাজ্যের উপর কুলকুল ধ্বনি তুলে ছুটে চলছে নৌকা। এই কুলকুল ধ্বনি... শাপলার ঘ্রান... বন্য বাতাসে বাঁধাহীন জীবন... নি:শেষ হবে আমার, শিঘ্রির। কত যে পিছিয়ে আছি... যন্ত্রনাটা যখন এলো, ডালপালা নিয়েই এলো। দমকা বাতাসের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আমার কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। নিয়তি আমার... চোখ বুঁজে পড়ে রই। ফিরফিরে বাতাসে মাথার চুল, শার্ট ফরফর শব্দ তুলে যখন বুকেতে কাঁপন ধরানোয় ব্যস্ত ঠিক তখন, ফুটফুটে এই শাপলা জাগা রাতে চোখের কোন বেয়ে নি:শব্দে গড়িয়ে পড়তে থাকে অজস্র জলধারা...
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:০৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×