somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গণকবরে লাশ আর লাশ

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৪:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মেজর জেনারেল শাকিলসহ ৪৪ সেনা কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার
বিডিআর বিদ্রোহের তিন দিন পর পিলখানা সদর দফতরের ভেতরে গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ গণকবর, ম্যানহোল এবং বুড়িগঙ্গা নদী থেকে আরও ৪৪ জন সেনা কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের লাশও রয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনে ৫৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হল। এদের মধ্যে ৯ জন ছাড়া বাকি সবাই সেনা কর্মকর্তা। এ হƒদয়বিদারক, অমানবিক, মর্মান্তিক ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ৩ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় সারাদেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শুক্রবার নিহতদের বিদেহী আÍার মাগফিরাত কামনা করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে আয়োজন করা হয় মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের। ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ৭ সেনা কর্মকর্তার নামাজে জানাজা শেষে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনাসদর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার নিহত ও আহতদের দেখতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি নিহতদের জন্য নীরবতা পালন করেন। পরে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন, চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন এবং তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। এক প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জঘন্য ঘটনা, নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইন আছে। এ আইনে বিচার হবে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও নিহত এবং আহতদের দেখতে সিএমএইচে যান।
এদিকে বিদ্রোহের পর বিডিআর সদস্যদের ফেলে যাওয়া অনেক অস্ত্র ও বিস্ফোরক বাইরে সাধারণ মানুষ ও সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ার আশংকা করছে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। শুক্রবার বিকালে র‌্যাব-৪ এর সদস্যরা পুরনো ঢাকার মনেশ্বর গলির মুখে রাস্তার ওপর থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড, এসএমজি ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ দুই যুবককে গ্রেফতার করে। জসিম ও সুমন নামে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী ওই দুই যুবক বিডিআর ৫ নম্বর গেটের পার্শ্ববর্তী স্থানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পড়ে থাকতে দেখে নিয়ে যাচ্ছিল বলে গ্রেফতারের পর র‌্যাব সদস্যদের জানায়।
এদিকে বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় দিনভর নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি, সেনাবাহিনীর ডগ স্কোয়াড, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের কয়েকটি দল তল্লাশি চালিয়ে ডিজির বাসা এবং ম্যানহোল থেকে ৪টি, বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ২টি এবং গণকবর থেকে ৩৮টি লাশ উদ্ধার করে। তাছাড়া গত তিন দিনের মতো পিলখানার বিভিন্ন গেটে শুক্রবারও দিনভর ছিল শত শত মানুষের আহাজারি, কান্না, বিলাপ। বিডিআর প্রধান ফটকের সামনে স্বামীহারা স্ত্রী, ভাইবোন, সন্তানহারা বাবা-মা আর আÍীয়-স্বজনদের বুকফাটা কান্না ও বিলাপে গোটা এলাকায় এক হƒদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। উদ্ধারকৃত লাশ ও নিখোঁজদের সন্ধান জানতে বিডিআর সদর দফতর ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুটি তথ্য কেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, বিডিআর বিদ্রোহে যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারা সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসবে না। প্রতিটি বাহিনীর নিজস্ব আইন আছে। সে আইনেই অপরাধীদের বিচার হবে। বিডিআরের নতুন মহাপরিচালক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল হোসেনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বিডিআর সদর দফতরের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, এটি সুপরিকল্পিত ঘটনা। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এটি। এর পেছনে অন্য কারও হাত আছে। এজন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে তিনি বলেন।
গণকবরের সন্ধান
সে এক অসহ্যকর দৃশ্য! পিলখানা হাসপাতাল মর্গের পেছনের নির্জন স্থান। দূর থেকে মনে হচ্ছিল নতুন মাটি। নিখোঁজ সেনা কর্মকর্তাদের খোঁজে দৌড়ে গেলেন উদ্ধারকারী দলসহ সবাই। কবর সন্দেহে তাতে চালানো হয় কোদাল। কিন্তু মাটির সঙ্গে উঠে আসে বিডিআর পোশাক। লাশের অস্তিত্ব। তাই কোদালের আর দ্বিতীয় কোপটি নয়। শোকার্তরা শ্রদ্ধাবনত হয়ে কোদালের পরিবর্তে হাত দিয়েই শুরু করলেন মাটি খোঁড়া। তখনই ভেসে ওঠে ড্রেস পরা এক সেনা কর্মকর্তার লাশ। ইতিমধ্যে লাশটি বিকৃত হয়ে গেছে। চেনা যাচ্ছিল না। পরনে থাকা শার্টের কাঁধে ছিল ব্যাজ। বুক পকেটে ছিল নেমপ্লেট। নাম লে. কর্নেল নকিবুর রহমান। ফায়ার ব্রিগেড আর ডিসিসির কর্মীরা বলেছেন, কবরের মধ্যে হাত-পা গুটানো অবস্থায় পড়ে ছিল লে. কর্নেল নকিবের লাশটি। নিস্তেজ দেহ, হাত-পায়ের জোড়া ছেড়ে দেয়া লাশটি টেনে বের করতেই নিচে দেখা গেল জবুথবু অবস্থায় আরেকজনের লাশ। এরপর আর মাটি ছিল না ওই কবরের কোথাও। শুধু লাশ আর লাশ। আশপাশে, নিচে যেদিকে চোখ গেছে সেদিকেই ছিল লাশ আর লাশ। কোনটার হাত-পা গুটানো, কোনটার মাথা নিচে পা উপরে, লম্বা করে শোয়া, কোনটি উপুড় হয়ে থাকা, আবার কোন লাশ দেখা গেছে বসা অবস্থায় পড়ে আছে কবরের ভেতর। জামা-কাপড়ে রক্তের দাগ। কারও মাথা, কারও বুক, কারও চোখ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বুলেটের আঘাতে। দগদগে ক্ষতের চিহ্ন গোটা শরীরে। বিকৃত হয়ে গেছে সবার মুখমণ্ডল। বুলেটের আঘাতে এক কর্মকর্তার চোখ বের হয়ে গেছে কোটর থেকে। ফুলে কালো হয়ে গেছে শরীরের বিভিন্ন অংশ। হত্যার পর টেনে-হিঁচড়ে যাকে যেভাবে পেরেছে, সেভাবে ফেলেছে ওই কবরে। এরপর লাশে লাশে কবর ভরে যাওয়ার পর মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।
শুক্রবার পিলখানা হাসপাতাল সংলগ্ন এক গণকবর থেকে লাশ বের করার পর যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে ডিসিসির এক কর্মী তুলে ধরেন বীভৎস এই চিত্র। বলেন, জীবনে অনেক কবর খুঁড়েছি। কিন্তু এরকম বীভৎস, নির্মম দৃশ্য কোন দিন দেখিনি। কবর খোঁড়ার কাজে সহায়তাকারী ডিসিসির অপর একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী বলেন, প্রথমে ১৮ জনের লাশ উঠানো হয়। সবার পরনে ছিল ড্রেস। বাকিদের গায়ে কারও গেঞ্জি, কারও শুধু ফুলপ্যান্ট পরা, আবার কারও গায়ে কোন জামা-কাপড় ছিল না। দু’জনের লাশ পাওয়া গেছে বিডিআরের একটি প্যান্ট দিয়ে বাঁধা অবস্থায়। প্যান্ট দিয়ে শক্ত করে বাঁধা থাকায় শরীরের ওই স্থানের অনেকটা কেটে গিয়েছিল। ১৮ জনের লাশ উঠানোর পর সবাই ভাবছিলেন আর কোন লাশ নেই ওই কবরে। লাশ উত্তোলন করতে আসা বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন। তখন সবাই ব্যস্ত ছিলেন উদ্ধার করা লাশ শনাক্ত করা নিয়ে। কিন্তু কবরের নিচে মাটির অবস্থা দেখে গোর খোদকদের সন্দেহ হয়। তারা আবারও কোদাল হাতে নেন। কোপ দিতে থাকেন মাটিতে। কয়েক কোপ দিয়ে চিৎকার করে উঠেন ফায়ার ব্রিগেডের এক কর্মী। স্যার আরও লাশ! আবারও ছুটে আসেন সবাই। শুরু হয় হাত দিয়ে মাটি সরানো। কিছু মাটি সরাতেই আবার ভেসে উঠে লাশ আর লাশ। রক্তে রক্তে স্যাঁতসেতে হয়ে গেছে পুরো কবর। এরপর একে একে ৬ জওয়ানের লাশ বের করে আনা হয় কবর থেকে। তাদের পুরো শরীরে বুলেটের চিহ্ন। কারও বুকের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় জখমের চিহ্নও দেখা গেছে। পচন ধরে গিয়েছিল অনেকের দেহে। ফায়ার ব্রিগেডের কর্মীরা বিকৃত লাশগুলোকে কম্বল পেঁচিয়ে স্ট্রেচারে করে এনে সাজিয়ে রাখে পার্শ্ববর্তী খালি মাঠে। তখন পুরো পিলখানার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের লাশের গন্ধে। গণকবরের তৃতীয় স্তরে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় আরও ১৪টি লাশ। গণকবরের এই দৃশ্য দেখা যায় না। কান্নায় ভেঙে পড়েন সহকর্মী-সহপাঠী অনেক সেনা কর্মকর্তা।
বিকালে প্রথমবারের মতো পিলখানায় প্রবেশের অনুমতি মেলে সংবাদ কর্মীদের। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল পিলখানা ১ নম্বর গেট সংলগ্ন হাসপাতালের মরচুয়ারির পেছনে এক নির্জন স্থানে খোঁড়া হয়েছিল এ গণকবর। মরচুয়ারির পেছনে হওয়ায় এবং চারদিকে কাঁটাতারের বাউন্ডারি থাকায় পিলখানার ওই জায়গায় সাধারণত কেউ চলাফেরা করত না। বাগানের মতো হওয়ায় এবং অনেক গাছ-গাছালি থাকায় গেট তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। বিডিআর বিদ্রোহের পরপর ওই গণকবরটি খোঁড়া হয়। ৫ ফুট বাই ১০ ফুট ওই কবরটি খোঁড়ার পর একে একে এনে ফেলা হয় সব মৃতদেহ। এরপর মাটিচাপা দিয়ে মাটির উপর গাছের শুকনো পাতা, গাছের ডালপালা, ঝোপঝাড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আবু নাঈম বলেন, তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন গণকবর থেকে উদ্ধার করা লাশগুলোর মধ্যে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের লাশ রয়েছে। তার শরীরের গড়ন, বিভিন্ন অংশ দেখে আপেক্ষিকভাবে শাকিলের লাশ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত অন্য লাশগুলোর মধ্যে রয়েছেন লে. কর্নেল এলাহী বক্স, লে. কর্নেল এমদাদুল হক, লে. কর্নেল মামুন, লে. কর্নেল নকিবুর রহমান, লে. কর্নেল ইমাম শওকত, লে. কর্নেল ডা. রবি সরকার, লে. কর্নেল মোফাজ্জল হোসেন, মেজর রফিক, মেজর খালেদ, মেজর হায়দার, মেজর মাসুম, কর্নেল এমদাদুল, কর্নেল এহসান, কর্নেল মসিউর, লে. কর্নেল লুৎফর, লে. কর্নেল সাজ্জাদ, লে. কর্নেল এরশাদ, লে. কর্নেল বদরুল, মেজর মোসাদ্দেক, মেজর শাহ নেওয়াজ, মেজর সালেহ, কর্নেল মোয়াজ্জেম, কর্নেল এনশাদ ও ল্যান্সনায়েক খালেক। এছাড়া এর মধ্যে মেজর র‌্যাংকের ২টি ব্যাজ পরা অবস্থায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ৬ জনের লাশের মধ্যে দু’জন মেজর রয়েছেন।
বিডিআর সদর দফতরে তল্লাশি
শুক্রবারও দিনভর বিডিআর সদর দফতরের প্রধান ফটকের সামনে ছিল স্বজনহারা ও হাজার হাজার উৎসুক মানুষের ভিড়। বৃহস্পতিবার রাতে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের অস্ত্র সমর্পণের পর বিডিআর সদর দফতরের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। বিডিআর সদস্যদের পাঠিয়ে দেয়া হয় ব্যারাকে। জানা গেছে, সকাল সোয়া ১০টার দিকে র‌্যাবের একটি দল সদর দফতরে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশ প্রথমে তাদের বাধা দেয়। এরপর র‌্যাব সদস্যরা সদর দফতরের সামনে অবস্থান করতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পিলখানায় প্রবেশ করে সিটি কর্পোরেশনের ৮ জন সুইপার। ১০টা ৫৫ মিনিটে বিডিআর সদর দফতরে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। এর কয়েক মিনিট পর সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ পিলখানায় প্রবেশ করেন। তিনি ভেতরে প্রবেশের কিছু পরই বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করে সেনাসদস্যরা। বেলা সোয়া ১১টার দিকে প্রায় ৫শ’ সেনাসদস্য সাঁজোয়া গাড়িসহ (আর্মড পার্সোনাল কার) প্রায় ৩০টি গাড়ি নিয়ে সদর দফতরে প্রবেশ করে। এসময় সেনা সদস্যদের সঙ্গে ডগ স্কোয়াডের একটি টিম ছিল। এরপর থেকে পিলখানার দায়িত্ব মূলত চলে যায় সেনাসদস্যদের কাছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর দফতরে আসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ। ভেতরে প্রবেশের পর সেনাসদস্যরা পিলখানায় ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। প্রথমেই সদর দফতরের মূল ফটকের ওপর অবস্থিত সেন্ট্রি পোস্ট থেকে সেনাসদস্যরা বেশকিছু এন্টি ট্যাংক মাইন ও দুই বাক্স ভর্তি হ্যান্ড গ্রেনেড, একটি এসএমজি এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করে। প্রায় একই সময়ে সদর দফতরের মাঠ থেকে উদ্ধার করা হয় ৭টি হ্যান্ড গ্রেনেড ও বেশকিছু গোলাবারুদ।
এর কিছু পরে বিডিআর সদর দফতরে প্রবেশ করেন নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। দুপুরের দিকে বিডিআর হাসপাতালের কাছে মরচুয়ারির (লাশের ঘর) পেছনে একটি গণকবর থেকে উদ্ধার করা হয় বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৩৮ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ওই গণকবরে তিনটি স্তরে থরে থরে লাশগুলো সাজানো ছিল। দুপুরে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নাইম মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, সেখানে যে বর্বরতা চালানো হয়েছে তা কেবল বর্ণনা চলে বড় ধরনের কোন যুদ্ধের সঙ্গে। বিদ্রোহীরা শুধু লুটতরাজ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বেশ কয়েকজন অফিসারের বাসা এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে আগুন ধরিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়। একসঙ্গে এত অফিসারের মৃত্যু এবং তাদের বাসা-বাড়িতে হামলা-লুটতরাজের ঘটনা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
দুপুর দেড়টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সদর দফতরের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে পিলখানায় সেনাবাহিনী প্রবেশ করেছে। অন্য কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, বিডিআর সদর দফতরের বিভিন্ন স্থানে এখনও বিস্ফোরক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এখনও অনেক অফিসার নিখোঁজ। তাদের খুঁজে বের করতে এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের জন্য মূলত সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেনাবাহিনী কোন ট্যাংক নিয়ে ভেতরে আসেনি। বুলেটপ্র“ফ আর্মড পারসন কেরিয়ার (এপিসি) কোন ট্যাংক নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসময় সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ তার পাশে উপস্থিত ছিলেন।
টানটান উত্তেজনা, চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ৩৬ ঘণ্টার বিডিআর বিদ্রোহের অবসান হয় বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টায়। এরপর থেকে বিডিআর সদর দফতর পিলখানা পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের নেতৃত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল অস্ত্র সমর্পণ, অস্ত্রাগার তালাবদ্ধ, জিম্মিদের মুক্তি এবং আহতদের উদ্ধারের ঘটনা তদারকি করেন। বিপুল সংখ্যক পুলিশ রাতেই বিডিআর সদর দফতরে তল্লাশি শুরু করে। কিন্তু পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে বিদ্যুৎ না থাকায় তল্লাশি ব্যাহত হতে থাকে। ফায়ার সার্ভিস জেনারেটরের মাধ্যমে রাতভর তল্লাশি চালিয়ে ৯টি লাশ উদ্ধার করে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাত ৩টার দিকে অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সকালে উদ্ধার হয় আরও ২টি লাশ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেছেন, বিদ্রোহের পর বিডিআর সদস্যরা পুরো সদর দফতরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এছাড়া বিদ্রোহ শুরুর পরপরই বিডিআর সদস্যরা সদর দফতরের ভেতরে থাকা রেকর্ড রুমটিও পুড়িয়ে দেয়। এর ফলে সারাদেশে বিডিআর সদস্যদের নিয়োগ, সংখ্যাসহ রেকর্ড রুমে থাকা সব কাগজপত্র এবং কম্পিউটার ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
ফায়ার ব্রিগেডের উদ্ধারকর্মী ও গোয়েন্দা সদস্যরা জানান, বিডিআর ২ নম্বর গেটের অদূরে হাসপাতাল এলাকায় কিছু দূরে দূরে রাস্তার ওপর ম্যানহোলের পাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছোপ ছোপ দাগ রয়েছে। হত্যাযজ্ঞের পর যেসব রাস্তা দিয়ে লাশ বহন করা হয়েছে সেখানে রক্তের চিহ্ন মুছতে বালু ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উত্তর দিকের ৪ নম্বর গেট (জিগাতলা) দিয়ে প্রবেশ করলে দক্ষিণ দিকে ৩ নম্বর গেটের কাছে পৌঁছতেই গা শিউরে ওঠে। রাস্তার দু’দিকে গাছের সারি। বাগানে থরে থরে ফুটে আছে রঙ-বেরঙের ফুল। বিডিআর সপ্তাহ উপলক্ষে সাজানো বিভিন্ন ভবনের ফটক। দাঁড়িয়ে আছে রঙিন কাগজে মোড়া তোরণ। রাস্তার পাশে কিছু আবাদি জমির সবুজ ফসল। তার পাশেই নৃশংসতার কালো চিহ্ন। বিডিআর মহাপরিচালকের সুসজ্জিত বাসভবনটি দেখা গেছে অনেক স্থানে আগুনের ধোঁয়ায় কালো হয়ে আছে। জানা যায়, গ্লাসগুলো ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে দেখা গেছে, দুটো গাড়ি সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। ৩ নম্বর গেট থেকে যেতে সিগন্যাল ব্যাটালিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনার সামনে বালু ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এসব স্থানেই হত্যাযজ্ঞের ঘটনা বেশি হয়েছে। ১ নম্বর গেটের দিকে যাওয়ার পথে সীমানা প্রাচীরের উচ্চতা অপেক্ষাকৃত কম। সেখান দিয়েই বেশিরভাগ জওয়ান পালিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। ২ নম্বর গেটের পাশে হাসপাতালের সামনে ঘাটবাঁধানো পুকুর থেকে নৌবাহিনীর ডুবুরিরা সহস াধিক গোলাবারুদ, ৪টি এসএমজি, ২টি রাইফেল, ২টি এলএমজি, ১টি পিস্তলসহ বেশকিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে। বিডিআর সদস্যদের পরিবার যেসব কোয়ার্টারে ছিল তা এখন ফাঁকা পড়ে আছে। অফিসার্স কোয়ার্টার থেকে নিখোঁজ হওয়া কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারদের খুঁজছেন উদ্ধারকর্মীরা। বিশেষ করে মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের স্ত্রী ও মেয়ের লাশ এখনও পাওয়া যায়নি। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) শাহ জালাল জানান, শুক্রবার গণকবর থেকে ৩৮টি এবং ম্যানহোল থেকে ৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মহিলাদের কোন লাশ পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, অন্য কোথাও গণকবর রয়েছে কিনা তা খোঁজা হচ্ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো পিলখানা সদর দফতরে তল্লাশি অভিযান শেষ করা যায়নি। সূত্র জানায়, বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে ট্যাংক, এপিসিসহ ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সেনাসদস্যরা অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ ভোর ৪:১২
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×