আজকে তখন রাত বাজে কাটায় কাটায় দশটা। শাহবাগে আজিজ মার্কেটের সামনে পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোবাইল হাপিশ। মোবাইলটাতে গ্রামীনের কর্পোরেট সীম আর গত ৪বছরের অসংখ্য নাম্বার সেভ করা। মোবাইলে নাকি আজকাল ব্যাক-আপ করে রাখা যায়, কিভাবে কে জানে। যে যাই হোক আমার মাথায় হাত।
এই মোবাইলটা গতবছরেও হারিয়েছিল। বাসে কুয়াকাটা যাবার পথে ফেরীতে। বাস ফেরী থেকে নেমে গেলে টের পাই মোবাইল নাই, দৌড়ে ফেরীতে উঠে দেখি মোবাইল পড়ে আছে এক কোনায়।
মোবাইল হারিয়ে খুব খারাপ লাগলো আজ। টানা ৪বছর ব্যাবহার করেছি। প্রচুর নাম্বার, আর স্মৃতিও অনেক। কিছু কিছু এসএমএস সেভ করে রেখেছিলাম, নিজের কাছে ঐ এসএমএস গুলোর স্মৃতি অনেক দামী।
সাথে আরেকটা মোবাইল ছিল। ফোন দিলাম নিজের নাম্বারে। রিং হয় কেউ ধরে না। ওয়েলকাম টিউনে ব্রায়ান এডামসের গান শুনে থাবরা মারতে ইচ্ছে হচ্ছে। একটু পরে দেখি কল ধরে কেটে দেয় কথা বলে না। বুঝলাম কপাল খারাপ।
রবার্ট ব্রুসের ধৈর্যে ফোন দিতে থাকলাম নিজের নাম্বারে। ৮/১০বার কল দেবার পরে ওপাশে একজন বললো, হ্যালো।
আমি বিনয়ের অবতার হয়ে গিয়ে মধুর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, স্লামালেকুম ভাই। এটা আমার মোবাইল, মনে হয় পরে গেছিলো। আপনি কি কাইন্ডলি ফেরত দিতে পারেন?
ফেরত নিবেন? কেমনে?
আপনার যেভাবে সুবিধা হয়।
আমি তো বাসে উইঠা পড়ছি, শাহবাগ এরিয়াতে নাই।
কোথায় আছেন বলেন আমি আসতেছি।
আমি মতিঝিল।
তাইলে থাকেন আমি সিএনজি নিয়া আসতেছি। সময় লাগবে না।
পারুম না। আমি দৌড়ের উপরে আছি।
ভাই প্লিজ। মোবাইলটা আমার খুব দরকার। একটু হেল্প করেন ভাই।
আচ্ছা শাপলা চত্বর আসেন। আইসা নিয়া যান।
রওনা হবার আগে এক পরিচিত ওসিকে ফোন করলাম। সে বললো, ঐটা আর ফেরত পাবেন না। কর্পোরেট নাম্বার ফোন কইরা বন্ধ কইরা দেন। আমি শাহবাগ থানার ওসিরে বইলা দিতেছি, গিয়া একটা জিডি করেন। কিন্তুক লাভ নাই কোন। ইচ্ছা হইলে যান মতিঝিল। দেখেন ঠ্যাক দেবার সম্ভবনা বেশী।
মেজাজ ঠান্ডা রাখলাম। তাইলে পুলিশের হেল্প কেন? বললাম যা থাকে কপালে আমি যাচ্ছি। ওসি সাহেব বলে, আল্লাহর নাম নিয়া যান, রাত ১১টা বাজে। দেশের অবস্থা যেইরকম।
ওখানে এক ফ্রেন্ডের অফিস। সে অফিস থেকে বের হয় ১০টা ১১টায়। তাকে ফোন দিলাম। কপাল খারাপ। কয় দোস্ত আমি তো আজকে সকাল সকাল অফিস থিকা বাইরাইছি। তুই এক কাম কর, আমার অফিসের এক সিকিউরিটি গার্ড, হেরে নিয়া যা। সেই গার্ডকে আমার সাথে ভিরিয়ে দিল। এরে দেখে একটু ভরসা পেলাম। যেই রকম লম্বা সেইরকম চওরা। বন্য মোষের মতো স্বাস্থ্য। ইউনিফর্ম ছিড়ে ভুড়ি বেড়িয়ে আসে। আমাকে তালেবর টাইপ ভেবে ধরাম ধরাম স্যালুট। ছার, নিচ্ছিন্ত থাকেন, আমি থাকলে কেউ টাছ খরতাম না পারে।
সেই লোককে ফোন দিলাম। সে বললো, আমি আরেক বাসে উঠে গেছি, টিকাটুলি আসেন। গেলাম টিকাটুলি। এবারে দেখি ফোন বিজি। বুঝলাম সে আমার মোবাইলের সদব্যাবহার করছে। অনেকক্ষন পরে ফ্রি হলে আবার দিলাম। বলে ভাই, আমি তো কালীবাড়ি আসছি, আপনি রাজধানী মার্কেটে থাকেন। ঘরিতে রাত সাড়ে এগারোটা। রাজধানী মার্কেট ধু ধু।
এবারে বলে তাইলে এতোদুর আসলেন। একটু কষ্ট কইরা নারিন্দা পুলিশ ফাড়ীর এইদিকে আসেন। আমি অনেকক্ষন দাড়ায়া ছিলাম। (কালীবাড়ি থেকে রাজধানী আসছিলাম খুব দ্রুত)।
এবার রোখ চেপে গেল। ধৈর্য রেখে বললাম। ভাই আসতেছি। আপনি পুলিশ ফাড়িতে থাকেন। নারিন্দা পুলিশ ফাড়ির গেটে দাঁড়ায় ফোন দিলাম। ফোন আর ধরে না। গুনে গুনে ৬বার কল হবার পরে ধরে বললো, আমি রাস্তায়। আর ১০ মিনিট পরে আবার কল দিয়েন।
১০ মিনিট পরে সিকিউরিটি গার্ড বলে, ছার এইজন মনে হয়। দেখি একজন কালো শার্ট পড়া লোক এদিক ওদিক খুজছে। ভদ্রলোক খুজে নিয়ে মোবাইল হস্তান্তর করলেন। বললো, স্যরি ভাই অনেক রাতে আপনাকে এভাবে ঘুরালাম। আসলে আমি তাড়াহুড়ার মধ্যে ছিলাম। বুঝেনই তো রাতের বেলা ঢাকা শহর সেফ না। এই নেন আপনার মোবাইল। দেখেন সব ঠিক আছে নাকি।
ভদ্রলোককে ধরে জোড় করে নিয়ে গেলাম কাছের মিষ্টির দোকানে। গত মাসে এই দোকানেই দই খেয়েছিলাম। অনেক বিরস লেগেছিল। আজকে মুখে দিয়ে দেখি অমৃতের মতো স্বাধ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



