পিয়াইন নদী।
খাশিয়া পল্লী (Click This Link) থেকে বেড়িয়ে আমরা কিছুক্ষন চা খেলাম। এরপরে একটা টং দোকানের সামনে দেখি পিচ্চিরা হৈ হুল্লুর করে ক্যারাম খেলছে। আমি কেরাম খেলায় যাচ্ছে তাই। কিন্তু তারপরেও খেলতে নেমে গেলাম। খাশিয়ারা কেন জানি আমার সাথে সহজ হচ্ছিলো না। গা থেকে টুরিস্ট গন্ধটা দুর করে কাছা কাছি মিশতে হলে খেলার কোন বিকল্প নাই। ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের পরে ঐতিহাসিক ওয়াসিম আকরাম টেস্টের কথা চিন্তা করে আমি খেলতে নামলাম। আল-আমিন জানালো সে দুর্দান্ত ক্যারাম প্লেয়ার। কিন্তু খেলতে নেমে দেখলাম সে চাপাবাজী ছাড়া কিছুই জানে না। হেরে ভুত হয়ে গেল। প্রথমে যার সাথে খাতির হইলো ওর নাম রিকি। খেলতে গিয়ে আরেকজনের সাথে বেশ আলাপ হলো। স্থানীয় মিশনারী স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। সে দুর্দান্ত প্লেয়ার। ওর নাম নিকোলাস। সে একাই আমাদের সবাইকে কাইত করে দিল। এরপরে আরো কিছু বন্ধু বানালাম। গিবসন, রোনালদো। আমাদের সাথে খেলতে বোধহয় ওদের খুব মজা লাগছিলো। বাংলাদেশ-কেনীয়া কিংবা অন্যকোন দুর্বল টিমের সাথে খেলা দেখে আমরা যেমন মজা পাই।
হেরে ভুত হতে বেরুলাম ক্যারামের আড্ডা দিয়ে। পানের বাগানে ঢুকে গুল মরিচ গাছের ছবি তুললাম। এরপরে দুজন দুটো কাঠি আইসক্রিম চুষতে চুষতে বামের রাস্তা দিয়ে চললাম বর্ডারের দিকে। হঠাত জঙ্গল নাই। পাথুরে দেয়ালের মতো নদীর পার। নদীতে পানি প্রায় নেই। ধু ধু বালু যেন সাহারা মরুভুমী। বড় বড় বালিয়ারী টাইপ বালুর স্তুপ। অসংখ্য লোক পাথর তুলছে। নদীর নাম পিয়াইন।
রোদটা অনেক তেজি। পায়ের নিচে ছোট ছোট পাথরকুচি আর গনগনে বালি। গামছা পেচিয়ে চোখমুখ ঢেকে বালুর পাহাড় পেরিয়ে একটা ছোট্ট দোকানে আসলাম। এখানে প্রচন্ড ভীর। একজন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের সাথে ফায়ার ব্রিগেডের দু-জন ডাইভার কথা বলছে। গায়ে বেদিং স্যূট আর স্কুবা এপারেটাস। গতকালকে দু-জন কলেজ ছাত্র গোসল করতে গিয়ে নিখোজ হয়েছে। তাদের লাশ এখনো ভেসে উঠেনি। বিস্তর খোজা খুজির পরে ফায়ার-ব্রিগেডের ডাইভার দের ডাক পড়েছে। ফায়ার ব্রিগেডের এই ডাইভারদের দক্ষতা মাঝে মাঝে অতিমানবিক মনে হয়। আমি স্কুবার জন্যে এপ্লাই করেছিলাম। চেম্বার টেস্টে ৪০ফিট এয়ার প্রেশারেই নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেড়িয়ে কুচ্ছিত অবস্থা। আর এরা মেঘনা নদীর উত্তাল ঢেউয়ে দেড়/দুশো ফিট নেমে যায়। লঞ্চের ভিতরে চলে যায় প্রাগৈতিহাসিক ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে। একজনের কাছে কিছু ছবিতে দেখেছি ডাকাতিয়া নদীতে লঞ্চ ডূবেছে। ফায়ার ব্রিগেডের ডাইভার ডুবছে, সাথে সিলিন্ডার পর্যন্ত নাই। বিভিন্ন মেশিনে বাতাসের ফ্লো দেয়, ঐ মেশিনে পাইপ লাগিয়ে ডুব দিচ্ছে। অকল্পনীয়।
প্রচন্ড গরমে অবস্থা কেরোসিন প্রায়। গামছা কোমড়ে বেধে নদীতে নেমে গেলে। নদীতে পানি অল্প। সাতার কাটতে হলে পার থেকে একটু দূরে যেতে হবে। কিন্তু গতকালের ঘটনার জন্যে পুলিশ কাউকেই সাতার কাটার মতো দুরুত্বে যেতে দিচ্ছে না। পানিতে দাপাদাপি করে বেশ আরাম পেলাম। এক বিচিত্র চেহারার ছেলের সাথে খাতির হলো। মাথা প্রায় ন্যাড়া, শুধু চান্দিতে কয়েকগাছি চুল অদ্ভুত রকম লম্বা। গলায় নিকেলের চেইন তাতে লিখা METALICA. আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কই থেকে আসছেন? আমি বললাম ঢাকা। সে আসছে গ্লাসগো থেকে। জীবনে প্রথমবার বাংলাদেশে। তার কঠিন সিলটি বুঝতেও কষ্ট।
তাকে নিয়ে পানি থেকে উঠে নৌকায় চাপলাম। পিয়াইন নদী পারি দিয়ে ঘাটে উঠলাম। আল-আমিনের সাথে কথা হইছিলো ২০টাকার। তার হাতে ১০০টাকার নোটটা দিতেই তার অদ্ভুত খুশীটা খুব ভালো লাগলো। এত সহজে একটা শিশুকে এরকম খুশি করা যায়? কাউকে খুশি করতে পারলে এত খুশি লাগে কেন?
ছবিঃ
নদীর গায়ে বালুর ঢিবি।
সামনের গাছগুলো ভারত।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



