গত হপ্তায় বেড়াতে গিয়েছিলাম বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে। বেশ ক-বছর ধরেই যাবার ইচ্ছে ছিলো, সুযোগ করে উঠতে পারি নি। ব্লগে, ফেসবুকে, ফ্লিকারে অনেককেই দুর্দান্ত সব ছবি শেয়ার করতে দেখে হিংসায় জ্বলে পুরে মরতাম। একদিন বাসা থেকে ক্যামেরা হাতে মাঞ্জা মেরে বেরও হয়েছিলাম, কিন্তু হঠাত তুমুল ঝর বৃষ্টিতে ভিজে এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল। গত সপ্তাহে একদিন সুযোগ পাওয়াতে রওনা হলাম। যাবার কথা ছিলো আরেকজায়গায়, ৬০০ বছরের এক গীর্জার খোঁজে, যথেষ্ট তথ্য না পাওয়ায় ভাবলাম বালিয়াটি থেকে ঘুরে আসা যাক।
মেঘলা দিন। হঠাত চাঁদি ফাটানো রৌদ্র পড়ে, পড় মুহুর্তেই বৃষ্টি। জায়গাটা ঢাকার খুব কাছে, মানিকগঞ্জ জেলায় এটুকুই জানতাম। তাই জনৈক বড় ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম। উনি কি বললেন আর আমি কি শুনলাম জানিনা। ভুল করে কালামপুর নামের এক জায়গায় নেমে গেছি। নামার পড়ে শুনলাম এখান থেকে অনেক অনেক দূরে। রিক্সা নেবার চেষ্টা করলাম, প্রথম রিক্সাওয়ালা জানালো রিক্সায় যেতে পারেন কিন্তু যেতে যেতে ৪/৫ ঘন্টা লাগবে রিক্সায়। যাই হোক একটা সিএনজি পাওয়াতে রক্ষা। চমতকার গ্রামের রাস্তা দিয়ে ক্ষেত খামারের ভিতর দিয়ে আঁকা বাঁকা রাস্তা। বাসে গেলে এই মজাটা হতো না। ভাগ্যিস ভুল করে উলটা পালটা জায়গায় নেমে গিয়েছিলাম।
বাইল্যা বলে এক জায়গায় এসে দেখি ব্রিজ ভাঙ্গা কিংবা বানানোর কাজ চলছে। বিকল্প রাস্তাটা একটা বাসার ঘরের ভিতর দিয়ে চলে গেছে। যাই হোক, পথটা আমার কাছে অনেক মজার হলেও বিস্তারিত বর্ননা দিয়ে আর বোর করবো না। বালিয়াটি জমিদার বাড়িকে স্থানীয়রা বলে সাহেব বাড়ী। আমার সঙ্গিনী জানালো সে ছোট বেলায় এখানে এসেছিল, মেলায়, এখন বড় হয়ে ভুলে গেছে। কোথায় মেলা, শুন্য পুরী খাঁ খাঁ করছে। বিশাল রাজপ্রাসাদ। গেটে ভয়ঙ্কর দর্শন কয়েকটা সিংহমুর্তি। সিংহ দরজা আর কি। ভিতরে জীর্ন অনেক পুরাতন কয়েকটা দালান। প্রত্নত্বত্তের ত্বাত্তিক অতি বুদ্ধিমান কর্মকর্তারা মাঝের একটা দালানকে মেরামতের নাম করে সাদা রঙ করে মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছে। লাল বাকী দালানগুলোর মাঝে এটাকে লাগছে ক্লাউনের মতো। বাংলাদেশের সরকারী প্রত্নত্বাত্তিকরা সবসময়ই বেশী বুদ্ধিমান হন, প্রত্নত্বাত্তক দালানগুলো মেরামতের কাজ আসলে প্রথমেই তারা লাল রঙ মুছে সাদা ডিস্টেম্পার করে দিতে বিশেষ পছন্দ করেন। উদাহরন স্বরুপ বলে রাখি মোহাম্মদপুরে মোগল আমলের খুব চমতকার একটা মসজিদ ছিলো। (ধানমন্ডির সাতগম্বুজ মসজিদের মতো অনেকটা একই ডিজাইনের)। একটা মাদ্রাসা মসজিদের সাথে লাগোয়া। মুসুল্লীদের নামায পড়তে খুব সমস্যা হয় দেখে মসজিদ মেরামতে হাত দেয়া হলো, স্বভাবতই প্রথমেই দেয়ালের মোগল স্থাপত্যকলার লাল ইটের ১২টা বাজিয়ে সাদা রঙ করে দেয়া হলো, আর মোগলদের লাল ইট গুলো ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করে খোয়া বানিয়ে রাস্তা ঢালাইয়ের কাজে লাগানো হলো।
কালামপুরে এক দোকানদার বলছিলো, একটু সাবধানে থাকবেন। জায়গাটা বেশ নির্জন, ভিতরে মাঝে মাঝে হিরুইঞ্চিরা আড্ডা মারে। সাথে সাথে পাশে আরেকজন বললো, মোটেই না। খুব ভালো জায়গা। সেই দোকানদার নিজেকে শুধরে নিয়ে বলেছিলো, না না হিরুইঞ্চিরা মাঝে মাঝে আড্ডা মারে, তবে সাবধান থাকতে সমস্যা কই। ব্যাপারটা খুব গোলমেলে লাগলো। ভিতরে ঢুকে দেখি একদম শুন্য পুরী। কাক পক্ষী নেই। বিশাল শুন্য প্রাসাদে একা একা অতৃপ্ত আত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। হঠাত প্রায় ধ্বসে পড়া এক দালানের ভেতরে দেখি শ্যুটিং হচ্ছে। ট্রাভেল শো এর একটা প্রোগ্রামের সুন্দরী উপস্থাপিকা একটা ইটের স্তুপের উপরে উঠে কি জানি বলার চেষ্টা করছে আর বার বার ভুল করছে। পরিচালক তাকে দিচ্ছে রাম ধমক আর সেই মেয়ে কাঁদো কাঁদো চেহারায় এদিক ওদিক তাকায়। রেডী বলতেই আবার কান্না গিলে ফেলে হাসি হাসি মুখে কি জানি বলার চেষ্টা করছে।
শুটিং পার্টিকে বিরক্ত না করার জন্যে পিছের পুকুর ঘাটে চলে এলাম। বিশাল বিশাল সব ক্ষয়ে যাওয়া দালান। প্রতিটি দালান থেকেই সিড়ি নেমে এসেছে ঘাটের দিকে। দিঘির চারদিকে নারকেল বিথী। যখন জমিদারী শানশওকত ছিলো তখন দিঘীর জলে নিশ্চয় প্রাসাদের প্রতিফলন পড়ে অসাধারন আবহ তৈরি হতো। এখন সেটা মজে একদম লাল। পুকুর ঘাটে অনেকক্ষন চুপচাপ বসে থাকলাম। প্রায় ধ্বসে পড়া একটা দালানের জানালায় বসে থাকা এক জোড়া ঘুঘুকে ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করছিলাম এমন সময় লাল জামা পড়া এক মেয়ের ছায়া দেখলাম বলে মনে হলো। আঁতকে উঠলাম, এই দুপুর বেলায় অতৃপ্ত আত্মা বেরুলো নাকি? একটু পড়ে ভুল বুঝতে পারলাম। এটা ভুত টুত নয়। আসলেই একটা মেয়ে ঘুরতে এসে দালানের ভেতর থেকে পুকুর ঘাট দেখার চেষ্টা করছিলো। রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষানের গল্পটা তখন মাথার ভেতরে একটা গোত্তা দিয়ে গেল।
অনেক অবান্তর কথা বার্তা বললাম। এখন একটু কাজের কথা বলি। ঢাকার গাবতলী থেকে সরাসরি বালিয়াটির বাস ছাড়ে। বাসের গায়ে গেইট লক বা সিটিং সার্ভিস অনেক গালভারী কথা লেখা থাকলেও আসলে সবগুলোই খাঁটি অকৃত্রিম চিটিং সার্ভিস। খাবারের দোকান বলতে কিছু ছালাদিয়া রেস্টুরেন্টে সিঙ্গারা -সমুসা পাওয়া যায়। যারা যত্র তত্র খেতে পারেননা, তারা সাথে খাওয়া নিয়ে যেতে পারেন। অনেক দিন পর ব্লগে নতুন পোস্ট দিলাম। তাই আর খামোখা কথা বাড়াই না। হ্যাপি ট্রাভেলিং।
ঘুমন্ত পুরীর রাজকন্যা। সোনার কাঠি, রুপার কাঠি, ডালিম কুমার, কংকাবতী আর ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর গল্প।
ঘুমন্ত প্রাসাদ।
আকাশ ভরা মেঘ। প্রাসাদটা আন্ডার এক্সপোজ হয়ে যাওয়ায় পুরো ছবিটাই মাঠে মারা গেছে।
শান বাধানো পুকুর ঘাটে।
বাবুই ডাকিয়া কহে, ওহে ভাই চড়াই, করো শিল্পের বড়াই। (কবিতাটা ভুলে গেছি)
এক শালিকে ঝগরা।
দুই শালিকে দোস্তি।
এই ছবিটা নিজের কাছে কেন জানি ভাল্লাগছে। ক্যান লাগলো বুঝি নাই।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ৯:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



