আমার মায়ের সোনার নোলক
হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি,হোথায় খুঁজি
সারা বাংলাদেশে
সারা বাংলাদেশ অনেক বড়, বিশাল অংশ অদেখা । ১২ই এপ্রিল । মনমেজাজ খুব খারাপ । অফিসে প্রচন্ড চাপ , ছুটি-ছাটা পাইনি বহুদিন । দু'দিন পরে পহেলা বৈশাখ , সেদিনও অফিস করা লাগবে । কোন কাজই ঠিক মতো করতে পারছি না । অডিট করতে একখানে ১০০ডলার লেখার কথা, দেখি ১হাজার ডলার লিখে বিশাল ভজঘট বাঁধিয়ে বসে আছি । বসের কাছে গিয়ে বললাম, কোন কাজে মন বসাতে পারছিনা । ক’দিনের ছুটি দেন, জঙ্গল থেকে ঘুরে আসি । আমাকে হতভম্ব করে ছুটি পাশ হয়ে গেল টুঁ-শব্দ ছাড়া । ১৫ তারিখ থেকে ৪দিনের ছুটি । হাতে একদমই সময় নাই । কই যাই কি করি ? ফোন দিলাম বাবু ভাই-কে । আলী-কদমে আলীর সুরং দেখতে যাব । মীর শামসুল আলম বাবু ভাই বাংলাদেশের সেরা মাউন্টেনিয়ার । হিমালয় নিয়ে উনার কারবার, আলী-কদম যাবার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাবেন কি না সন্দেহে ছিলাম । এক কথায় উনিও রাজী । রাতে ফেসবুকে আলাপের সময় 'বাংলার পথে' টিংকু ভাইএর সাথে আলাপ হলো । উনি জানালেন উনিও যাবেন, তার শ্যুটিং টিম নিয়ে ।
ফেসবুকে একটা ইভেন্ট দিলাম ক্যাম্পিং আর রক ক্লাইম্বিং এর দাওয়াত দিয়ে । লিঙ্ক দিলাম সামহোয়ার ইন ব্লগ চ্যাট আর সামহোয়ার ইন ফটোগ্রাফি (এখন এমেচার ফটোগ্রাফি) গ্রুপে । ওমা, দুমিনিটের মধ্যেই দেখি দুই গ্রুপ থেকেই কে জানি আপত্তিকর মনে করে ইভেন্টটা ডিলিট মেরে দিল । ভীষণ রাগ উঠলো, পরে ভাবলাম না গেলে নাই । ট্রেকিং বাংলাদেশে পপুলার হয়েছে, ক্যাম্পিং বা রক ক্লাইম্বিং পপুলার হতে সময় লাগবে।
সে যাইহোক, ৪৮ ঘন্টার নোটিশে যাত্রা । কোন যোগাড়যন্ত্র হয়নি । যোগাড়যন্ত্র করার সুযোগও পাচ্ছিনা, অফিসের অত্যাচারে। তারপরেও কেমন করে জানি দেখলাম রওনা হবার আগে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঢাউস ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ফেললাম । ঢাকা থেকে নাইট কোচে আরামেই বের হলাম । পথে বাবু ভাইএর কাছ থেকে বোনাস হিসাবে ফটোগ্রাফি আর ভিডিওগ্রাফির ফ্রি কোচিং । (বাবু ভাই বিক্রি করার জন্যে ছবি তোলা শুরু করেন যখন তখনও আমি হাফপ্যান্ট পড়া ধরিনি, ডায়াপারেই ছিলাম) ।
সকাল ৭টার মধ্যেই আমরা চকোরিয়ায় নামলাম । ছোট্ট মফস্বলি ছিমছাম বাস স্ট্যান্ড । ককসোবাজার রুটের বাস বেশী, থেমে থেমে চান্দের গাড়ী আর মুড়ীর টিন-মার্কা বাসের কন্ডাক্টর ওয়েলকাম জানাচ্ছে-লামালীকদম, লামালীকদম (লামা এবং আলীকদম) । বাবু ভাই, আমি আর রাসেল ৩জনে পরোটা আর ডালভাজা শেষ করে চা’য়ে চুমুক দিচ্ছি এমন সময়ে এসে হাজির হলো আরেক সদস্য (সামহোয়ার ইন থেকে), হেলাল হেযাযী । নাম শুনে মানুষের চেহারা টাইপ কিছু একটা সবসময় চোখে ভাসে । হেলাল হেযাযী নাম শুনে গাট্টা গোট্টা, জব্বারের বলী খেলোয়াড় টাইপ কারো কথা মনে হয়, কিন্তু হালকা পাতলা, ক্লাস সিক্স সেভেন চেহারার হাসিখুশী হেলাল হেযাযী’র চেহারা আশা করিনি । ভ্রুকুটি দেখেই হয়তো সে বেশ গরম হয়েই জানালো সে ঢাকা ইউনিভার্সিটি’তে থার্ড ইয়ারে পড়ে। বাকী ক’দিনের জন্যে তার নাম ‘থার্ড ইয়ার’ বানানো ঠেকানো গেলনা । টিঙ্কু ভাই’দের সাথে ফোনে যোগাযোগ হলো। তারা প্রাইভেট-কারে শ্যুটিং এর ক্যামেরা নাকি বন্দুক ফন্দুক নিয়ে আসছে। তারাও পথে আছে ঠিক আমাদের পেছনটায় ।
চুনতি রিজার্ভ ফরেস্টের শ্যামলিমা ভরা পরিচিত কক্সবাজার হাইওয়ে ছেড়ে লামার পাহাড়ি রাস্তায় বাস ঢুকতেই মনটা ভালো হয়ে গেল । বড় বড় গাছের গায়ে ছোট ছোট সতর্কবানী-‘এখানে বুনো হাতি পাওয়া যায়’। এপ্রিল মাস, জুম লাগানোর সময় । পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল সাফ করে থরে থরে জুম লাগানোর কাজ চলছে । এর মাঝেই বিসদৃশ ভাবে জায়গায় জায়গায় BAT এর অর্থায়নে তামাক চাষ চলছে । লিমিট ছাড়া ফাজলামীর চুড়ান্ত- লেখা ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো’র অর্থায়নে পাহাড়ে বনায়ন কর্মসুচী।
লামা’তে সম্ভবত ম্রো (মুরং) আর ত্রিপুরা’দের সংখ্যা বেশী। ত্রিপুরা মেয়েরা আর ম্রো ছেলেরা যেন রূপচর্চার কম্পিটিশানে নেমেছে । ত্রিপুরা মেয়েদের দেখলেই চেনা যায়, গলায় হাজারখানেক সুতোর মালা, আর কানে বাহারি ইয়ারিং (সিলেটের ত্রিপুরা বা টিপরা-দের সাথে বান্দারবানের ত্রিপুরা-দের মিল না খোঁজাই শ্রেয়) । থানছি, রুমা, মদক -এর চেয়ে এদিকে ত্রিপুরা মেয়েরা বোধহয় উজ্জ্বল রঙ এর কাপড় বেশী পছন্দ করে, কিংবা বিজু উৎসবের সময় বলেই হয়তো চারদিকে রঙের ঢল নেমেছে । ম্রো মেয়েরা পোশাক আশাকে এত শৌখিন না হলেও তাদের দুর্নাম ঘোচাতে ম্রো পুরুষ বিশেষ করে ব্যাচেলর-রা বদ্ধপরিকর । মাথায় সাদা রঙ এর বাহারি পাগড়ি । লাতিন ফুটবলারদের স্টাইলে লম্বা চুলে খোঁপায় চিরুনী, মুখে রঙ আর ঠোটে হাসির কমতি নেই ।
পরপর দু-রাত ঘুম হয়নি, ঝিমুনিটা জমে ওঠার আগেই শুনি বাস লামা শেষ করে আলীকদম বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ভোঁ দিয়ে দিল । আমরা সবাই গাট্টি-বোঁচকা বেঁধে নেমে পড়লাম। টিঙ্কু ভাই এন্ড গং এর তখনও দেখা নেই, ফোনেও পাচ্ছি না, পালিয়ে যাচ্ছি বন্ধু নেটওয়ার্কের বাহিরে টাইপ । আমার ব্যাকপ্যাকটা দর্শনীয় । ৩জন থাকার মতো বড় তাঁবু, ট্রাইপড, স্লিপিং ব্যাগ, স্লিপিং ম্যাট আর বাকী জায়গা’তে ঠাসাঠাসি করে জায়গা করে নেয়া অদরকারি কিছু কাপড় চোপড় । এসব নিয়ে রোদের মধ্যে ঘোরাঘুরি না করে, ছায়া ঢাকা একটা চিপায় তলপেটের চাপ কমিয়ে চা’য়ের দোকান খুঁজে বসে পড়লাম । ২কাপ শেষ করার আগেই টিঙ্কু ভাই এন্ড গং হাজির । ব্যাকপ্যাকটা তার গাড়ি’তে তুলে দিয়ে আমরা ছিমছাম উপজেলা শহর আলীকদমের রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। শহরের আদ্ধেকটা জুড়েই আর্মি গ্যারিসন । আমার হবু শ্বশুর সাহেব তার এক হাবিলদার’কে ধরিয়ে দিয়েছেন, আলীকদম পোষ্টিং । আমরা প্রেস ক্লাবে গিয়ে বসলাম । প্রেসক্লাবে টিংকু ভাই’এর এক সাংবাদিক বন্ধু আছেন । উনি আলী-কদমের ইতিহাস আর নামকরন নিয়ে চমৎকার একটা বই লিখেছেন । সবাই মিলে সৌজন্য সংখ্যা নেবার নাম করে সেটার ফ্রি কপি পকেটস্থ করলাম । ক’জন গেল বাজার করতে, আর আমি, বাবু ভাই আর থার্ড ইয়ার চললাম হাবিলদার সাহেবের সাথে ক্যাম্পিং এর প্রস্তুতি নিতে ।
হালকা উঁচু নিচু রাস্তা, ঠিক পাহাড়ী এখনো শুরু হয়নি । দু'ধারে মাথা উঁচু করে থাকা গম্ভীর পাহাড়ের মাঝে বিশাল সমতল ভূমিকে ভূগোলের ভাষায় ভ্যালি বলে । ঢুকতেই একটা মন্দির, চারপাশে কয়েকটি মারমা, বাঙালী মিক্সড গ্রাম । মন্দিরে বোধহয় কোন উৎসব হচ্ছে। রঙ বেরঙের পোষাকে মারমা মেয়ে’রা ভীড় করেছে । সামনে অস্থায়ী দোকানে তরমুজ, কাঁচা আম, টাম (একধরনের পাহাড়ী ফল । গাড়ী করে কেওকারাডং যাবার পথে মুংলাই পাড়ায় বিশাল এক টাম বাগান আছে, বাগানের মালিক খেতে দিয়ে জানিয়েছিলেন এটার নাম আমের ভাই টাম), আর আছে ডাবের দোকান ।
আমরা ঘাড়ে-পিঠে-মাথায় করে সব বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে এলাম গ্রামের এক বাড়ী’তে । গৃহকর্তা ভোলার লোক । পাহাড়ে সেটলার হিসাবে আছেন ২০ বছর ধরে। তার বাসায় গোয়াল ঘরে আমাদের নাকি তাঁবু খাটানোর জায়গা । গোয়াল ঘরে বড় বড় গরু’র সাথে রাত কাটানোর প্রশ্নই উঠেনা । আমরা বেরুলাম ক্যাম্প সাইট ঠিক করতে। সামনে একটু নিচ দিয়ে গেছে ছোট্ট একটা নদী যা পুরো গ্রামের পানির উৎস । গুহার পথে একটা অংশ ঘোড়া’র ন্যাজের মতো বাঁক নিয়েছে । একধারে পাহাড়, কাছে গ্রাম, আর একদম গা ঘেঁষে নদী । ক্যাম্প করার জন্যে অতিরিক্ত রকমের ভালো জায়গা । শুধু একটাই সমস্যা খোলা জায়গা দিয়ে সোজা পাহাড়ের উপরে আর্মি ক্যাম্পের বিশাল সাইজের এলএমজি বাংকার । ঠিক মাথার উপরে কেউ এলএমজি ধরে বসে আছে, ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। আমরা গায়ে মাখলাম না। শুনলাম নদীর নাম টিং নদী । একে বেঁকে আর্মি ক্যাম্পের ওধারে মিশেছে মাতামুহুরীর সাথে ।
দুপুরে ঝাল ঝাল মুরগীর মাংসের সাথে লালচালের ভাত অসাধারণ লাগলো । ভয়াবহ ক্ষুধার্ত থাকার কারনে শুধু নয় , রান্নাটাও ছিল সেই রকমের কঠিন । বাকী কাউকে আড্ডা ছেড়ে উঠতে উৎসাহী না দেখে আমি আর থার্ড ইয়ার নেমে পড়লাম ক্যাম্পের দিকে । তাঁবু খাটানোর সময় দেখি বিশালাকার এক লালচে গিরিগিটি গলার রগ ফুলিয়ে রাগ রাগ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে । ক্যামেরার অভাবে ছবি নিতে পারলাম না ।
বিকেলে বিজু উৎসবে অনুষ্ঠান শুরু হলো । বিশাল উজ্বল রঙ্গিন শোভাযাত্রা। শুরুর দিকে বালিকারা, এর পরে বাই সিরিয়াল কিশোরী, তরুনী’রা সবাই রঙ চঙে পোষাক পড়ে সেজেগুজে, সবার হাতে টাকার গাছ, অর্থাৎ কি না ডাবের মধ্যে বাঁশের কঞ্চি লাগিয়ে গাছের মতো বানানো, তাতে পাতার বদলে, ৫টাকা ১০টাকার নোট । শোভাযাত্রার একদম সামনে একজন পেতলের ঘন্টা বাদক, আর তার পিছে কারবারী। সবার পিছে ঢোল, বাঁশি আর নানারকম বাদ্যকরেরা । তাদের সামনে উৎসাহ নাচতে ব্যাস্ত । অদ্ভুত রহস্যময় গানের তালে বিশাল শোভাযাত্রাটা ঘুরে ঘুরে মন্দিরের ভেতরে অনেক গুলো চক্কর দিল । ভেতরে মেলা বসেছে ।
আস্তে আস্তে সবাই তাঁবু খাটিয়ে নিল । দূরে পাহাড়ের আড়ালে সূর্যি মামা ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়ার পালা শুরু করলো । আর আমরা শুরু করলাম জম্পেশ ক্যাম্প ফায়ার আর আড্ডার আয়োজন ।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০১১ রাত ৩:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


