গতবছর কাজের সুত্রে এক ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী তরুনের সাথে পরিচয় হয়েছিল। হিপহপ কালচারের আদর্শ অনুরাগী। মাথায় বিচিত্র চুলের ফ্যাশন, বেসবল ক্যাপ পড়ে একটু তেরছা করে, গলায় অনেকগুলো মালা, চেইন, আরো কি কি জানি। ঢোলা প্যান্ট কোমড়ের নিচে কিভাবে জানি ঝুলে আছে, কখন কোথায় খুলে পড়ে কেলেঙ্কারী ঘটাবে, সেটা আগে থেকে আন্দাজ করা মুশকিল। দু কানে চারটা ইয়ারিং, চোখের ভুরুতেও একটা রিং ঝোলানো। দুহাতের কবজিতে চিত্র-বিচিত্র ট্যাটু করা। জন্ম থেকেই ইংল্যান্ডে সেটেল্ড। আলা-জিহবা থেকে গার্গল করার ভঙ্গিতে কঠিন ব্রিটিশ উচ্চারনে ইংলিশ বলে কিচ্ছু বুঝি না। ইংলিশ ছাড়া দ্বিতীয় যেই ভাষাটা বলে সেটা উর্দু বা পশতু জাতীয় কিছু, যার একবর্ন আমার চৌদ্দগুষ্টির কারো পক্ষে জানার সম্ভবনা নেই। ভেবেছিলাম পাকিস্তানী বা ভারতীয় কিছু হবে, চমকে গেলাম যখন শুনি জন্মসুত্রে সে বাংলাদেশের নাগরিক।
সেকেন্ড জেনারেশন অনেক বাংগালীই আছে যারা বাংলা বলতে পারেনা। আমার এক ভাগিনার এই অবস্থা। মা’কে বলে মামা (আমারে কি ডাকবে তাইলে?)। এই জিনিসগুলো আমার দুচোখের বিষ। একেও তেমনই ভাবছিলাম। সে জানালো সে আসলে জাতিতে বালুচ। তার দাদা বাংলাদেশে সেটেলড হয়েছিল, তার বাবার জন্ম ঢাকা শহরে, এমনকি তারও। বালুচরা যে নিজেদের পাকিস্তানী বলতে পছন্দ করেনা, সেটা ওর কাছ থেকেই শুনেছিলাম। সে অবশ্য কারন টারন বলতে পারে না। কারন জানলাম তার দাদার কাছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বিশ্লেষনের পাতায় পাতায় রয়েছে পশ্চিমের জল্লাদ বালুচ রেজিমেন্ট আর ৬৫এর হিরো বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধের গল্প। কিন্তু বালুচরা পাঞ্জাবীদের হাতে বছরের পর বছর নির্যাতন ভোগ করে আসছে। সেই লোকের দাদা’র ধারনা আগামী ২০বছরের মধ্যে বেলুচিস্তান হয়তো পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারবে। তাদের ভাষা বালুচ, ওরা পাঞ্জাবী বা উর্দু কিছুই পারেনা।
তার দাদা চমতকার লোক। রবীন্দ্রনাথের কাবুলীওয়ালার সাথে চেহারা খাপে খাপে মিলে যায়। অনেক লম্বা, সেই হিসাবে চওড়া, আর গায়ের চামড়াও পাকিস্তানীদের চেয়ে উজ্বল। ভদ্রলোক অনেক আলাপী। অনেক বয়স, কিন্তু এখনো তাগড়া শরীর। কথায় কথায় জানালেন ব্রিটিশরা চলে যাবার আগেই উনি ব্যাবসা করতে অবিভক্ত বাংলায় আসেন। ঢাকা শহরে আসেন ষাটের দশকে, আর ফিরে যাননি। এতবছর ধরে বাংলায়, কিন্তু বাংলায় কেমন জানি বিদেশী টান। তাকে সেই প্রসঙ্গে বলতেই রেগে গেলেন। ইয়াংম্যান, তুমি হামার বাংলা নিয়া সন্দেহ কর? বুঝলাম সে নিজেই আমার আর হামার এর মধ্যে পার্থক্য শুনতে পারে না। কথাটা চাপা দেবার জন্যে বললাম, তোমার প্রিয় সাহিত্যিক কে?
তাতক্ষনিক জবাব, রবীন্দ্রনাথ।
কেন? সেটার জবাবে দুনিয়ার রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদাহরন, লাইন আর হাজারটা গল্পের কাহিনী নিয়ে বিশাল এক আলোচনা। যার প্রায় কিছুই আমি বুঝলাম না। গল্পগুচ্ছের সব গল্প পড়া হয়নি। সোনার তরী, বা আমাদের ছোট নদী টাইপের যেই সব কবিতা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, সেগুলোই সম্বল। তাই ভদ্রলোকের উত্তরটা মাথার উপরে দিয়ে গেল। সে ব্যাপারটা ধরতে পারলো। হোক ৫০বছর ধরে ঢাকায় থাকে, তবুও একজন অবাঙ্গালীর কাছে রবিঠাকুর নিয়ে এত ভারি ভারি কথা শুনতে কেমন জানি অস্বস্তি লাগে।
ভদ্রলোকের সাথে দ্বিতীয়দিন দেখা হবার সময় খুব আয়োজন করে একটা কাগজ দেখতে দিলেন। হলুদ জীর্ন একটা কাগজ। অনেক পুরাতন সন্দেহ নেই, কবিতা না গান না। একটা বিজ্ঞাপন জাতীয় কিছুর ফটোকপি। আমি না বুঝে তার দিকে তাকাতেই রেগে গেলেন। ইয়াং ম্যান ভালো করে দেখ। দেখলাম, কাগজে অনেক কিছুই লেখা, নিচে লেখকের স্বহস্তে নাম সাক্ষর, “শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”। আহামরী কিছু না। রবীন্দ্রনাথের লেখা একটা পাতার ফটোকপি।
ভদ্রলোক জানালেন এটার মুলকপি তার কাছে ছিল। একাত্তুর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হারিয়ে গেছে।
ভদ্রলোক প্রতিবছর একুশে বইমেলায় যান, বাসায় সিডি প্লেয়ারে রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন, গরগর করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ বলে যান। বাংলা বলতে শিখেছেন ব্যাবসার খাতিরে, আর বাংলা পড়তে শিখেছেন রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে।
ভদ্রলোক তার কথা বললেন। আমাদের কয়েকপুরুষের ব্যাবসা। বালুচদের সাথে পাঞ্জাবীদের সম্পর্ক খুব খারাপ। ১৯৪১সালে ১৬/১৭বছর বয়সেই বাবার ব্যাবসাতে ঢুকে পড়ি। ব্যাবসার খাতিরেই গেলাম কলকাতা শহর। ১৯৪১সালে, কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী আর ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শহর। বয়স অল্প, কলকাতার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সারাদিন কাটে সিনেমা হল আর বিদেশী রেস্টুরেন্টগুলোয়। পকেটে টাকা আছে, চিন্তা কিসের? একদিন এক সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাত দেখি বিশাল মিছিল। হাজার হাজার লোক অশ্রুভেজা চোখে মিছিল করে যাচ্ছে। জীবনে অতবড় মিছিল ঐ প্রথম দেখলাম। ঘটনা কি জানতে মিছিলে ভিড়ে গেলাম। কিসের মিছিল জিজ্ঞেস করাটা হয়তো অবান্তর ছিল, কিন্তু কলকাতা শহরে তখন মাত্র ক-দিনের নাগরিক। জানলাম বাংলা মুলুকের সবচেয়ে বড় কবি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিষন অসুস্থ ছিলেন। মারা গেছেন, আর তার শবযাত্রাতে হাজার হাজার মানুষের সাথে আমিও শরীক হয়েছি, রবীন্দ্রনাথের নাম না জেনেই।
রবীন্দ্রনাথের নাম শুনলাম জীবনের প্রথমবার তাঁর শবযাত্রায় গিয়ে। শবযাত্রা শেষে বুঝতে পারলাম আমি ভিষন সৌভাগ্যবান, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের শবযাত্রায় উপস্থিত থাকা মানুষ। খুব কৌতুহল হলো, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করলাম। তার জীবনদর্শন, চিন্তাভাবনা আমাকে জাদু করলো, কাজের সুত্রে বাংলা শিখলাম, রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু করে সেই মুগ্ধতা দিন দিন বাড়তে থাকলো। ব্রিটিশরা চলে গেল, পাঞ্জাবীদের সাথে না থেকে চলে এলাম পুর্বপাকিস্তানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, ছেলে মেয়েরা সবাই পাড়ি জমালো দেশ বিদেশে। কিন্তু আমার যাওয়া হলো না। থেকে গেলাম ঢাকা শহরেই।
**** লেখাটার নাম একজন রবীন্দ্রভক্তের গল্প। কিন্তু এটা মোটেই গল্প না। ভদ্রলোককে বলেছিলাম তোমার কথা কি আমি অন্যদের কাছে শেয়ার করতে পারি? উনি বলেছিলেন, অবশ্যই পারো, কিন্তু আমার নাম উল্লেখ না করে।তাই চেষ্টা করেছি গল্পে কোথাও তার নাম বা পরিচয় উল্লেখ না করতে। লেখাটা গত বছর প্রথম আলো ব্লগে পূর্ব প্রকাশিত। এ বছরে রবীঠাকুরের ১৫০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সামহোয়ার ইন ব্লগে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ। উপরের ফটোশপে বানানো রবী-ঠাকুরের সাথে মহেশখালী চ্যানেলে নৌবিহারের ছবিটাকে কেউ দয়া করে ফাজলামী মনে করবেন না। ****

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



