আমাদের এই দেশের অধিকাংশ পরিকল্পনাই হয় দেশের বাইরের এক শ্রেণীর ঋণ বাণিজ্য সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। আর এর সহযোগী হন দেশের কিছু ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ। তারা বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে ঋণবানিজ্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্প শুরু আগে বেশ কিছু সমস্যাকে হাইলাইট করে এবং বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যবসাব্ন্ধব তাদের তত্ত্ব প্রচার করেন।
ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন নামে ঋণবাণিজ্য সংস্থা এবং ঠিকাদার কোম্পানীগুলো বিগত বছরগুলোতে নানা প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। হাসিল করেছে তাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। কিন্তু জনগণের কাধে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি ছাড়া অধিকাংশ প্রকপ্লে তেমন উল্লেখ্যযোগ্য কোন সুবিধাই জনগণ পাননি।
তেমন একটি প্রকল্প বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কে রিকশা উচ্ছেদ। এই প্রকল্পের কিছুটা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
আশা করি এই লেখাটিতে বিশেষ গোষ্ঠীর পরিপূর্ণ লক্ষ্য উদ্দেশ্য প্রকাশ না পেলেও কিছুটা উদ্দেশ্য প্রকাশ পাবে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। হয়তো আগামী দিনগুলিতে দেশের অন্যান্য শহরগুলিতেও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেন সব মানুষের সুবিধা বজায় থাকে সে বিষয়ে সকলকেই সচেতন থাকতে হবে। ইতোমধ্যেই ঢাকার বেশকিছু রাস্তা থেকে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি না অবনতি হয়েছে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে এই লেখায় ।
রিকশা উচ্ছেদের পক্ষে যেসব যুক্তি দেখানো হয়েছিল:
মুলত ডিইউটিপি এর পরীক্ষামুলক প্রকল্প (২০০০-০৫) এর আওতায় ঢাকার মিরপুর সড়ক, এলিফ্যান্ট রোড-শাহবাগ-মৎস ভবন-প্রেসক্লাব সড়কসহ ছোট ছোট কিছু সড়কে রিকশা বন্ধ করার সাথে সাথে কিছু এলাকায় ক্রসিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন হয়েছে ধাপে ধাপে। শর্ত ছিল প্রথম পর্যায়ে রিকশা উচ্ছেদের মাধ্যমে যদি কোন সুবিধা হয় তাহলে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। আর সমস্যা বৃদ্ধি পেলে বা কোন পরিবর্তন না হলে রিকশা উচ্ছেদ করা যাবে না বা বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করা হবে। রিকশা নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে যে সকল যুক্তি দেখানো হয়-এটি ধীরগতিসম্পন্ন বাহন, রিকশা চালানো অমানবিক পেশা, চালকেরা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানে না, অকার্যকর বাহন, যান্ত্রিক যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, রাস্তায় বেশি জায়গা নেয়, ধারণ ক্ষমতা কম ইত্যাদি ইত্যাদি।
১.রিকশা কি ধীরগতিসম্পন্ন বাহন?
গতি বিষয়টি আপেক্ষিক। ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই বাসের চেয়ে প্লেন দ্রুতগতিসম্পন্ন মাধ্যম। নিউমার্কেট থেকে উত্তরা বাস বা প্রাইভেট গাড়ি রিকশার চেয়ে অধিক গতিসম্পন্ন। ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেট হেঁটে যাওয়ার চেয়ে রিকশায় তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে এর চেয়ে আরো দ্রুত যাওয়া যাবে প্রাইভেট গাড়ি, বাস বা প্লেনে। এখন নির্ধারণ করতে হবে ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেটে প্লেনে, বাসে, প্রাইভেট গাড়িতে, রিকশায় না হেঁটে যাতায়াত যুক্তিযুক্ত। এখানে যাতায়াতের জন্য বাসের পক্ষে হয়তো অনেকেই মত দেবেন। কিন্তু এ বিষয়েও ভাববার অবকাশ রয়েছে। বাসে বিরতীহীনভাবে যাতায়াত করা সম্ভব নয়। বাসা থেকে বাসস্টপেজে যে কোন মাধ্যমে গিয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ সময় ক্ষেপণ হবে তাতে বাসের গতি বেশি হলেও সুবিধা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা, প্রতিবন্ধি ছাড়াও মালামালসহ বাসে চলাচল সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করার জন্যও জ্বালানী সংগ্রহ, পার্কিং এর জায়গা খোঁজা, ড্রাইভার রাখা, গাড়ি বের করা অনেক ঝামেলার কাজ এটি রাস্তায়ও অনেক বেশি জায়গা নেয় ও যাতায়ত খরচও বেশি।
ধানমন্ডি থেকে নিউমার্কেট এরকম দুরত্বে যাতায়াত এর জন্য রিকশার গতিই যথেষ্ট। রিকশায় বিরতীহীন যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। রিকশায় যাতায়াত খরচ বেশিরভাগ মানুষের সাধ্যের মধ্যে। দেখা যায় ঢাকায় ৭০ ভাগ যাতায়াত স্বল্প দুরত্বে (ইউএন ইএসসিএপি-১৯৯৮)। এর কারণ ঢাকার প্রায় সব এলাকায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রযেছে। যেমন-স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাজার, অফিস, বাসা, পার্ক ইত্যাদি। সুতরাং ঢাকার পরিবহণ ব্যবস্থায় রিকশা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ঢাকার বেশিরভাগ যাতায়াত দেড় থেকে দুই কিমি এর মধ্যে এবং হেঁটে এবং জ্বালানমুক্ত যান মিলে ৮৪ ভাগ যাতায়াত হয়ে থাকে(ডিইউটিপি ১৯৯৮)।
রিকশা চালানো কি অমানবিক পেশা?
মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদেই রিকশা চালনার পেশা বেছে নিয়েছে। এর পাশাপাশি তুলনামূলকভাবে অন্যান্য পেশার চাইতে সুবিধা থাকার কারণেই। অন্যান্য পেশার মধ্যে কৃষিকাজের কথাই ধরা যাক, ধান লাগানো থেকে থেকে শুরু করে নিড়ানী দেয়া, কাটা, বয়ে নেয়া এবং সংরক্ষণ করার যে প্রক্রিয়া তা কেমন কষ্টকর এই পেশায় জড়িত এবং প্রত্যক্ষদর্শীরাই জানেন। এছাড়া স্থাপনার কাজ থেকে শুরু করে গার্মেন্টস ও অন্যান্য কাজে সম্পৃক্ত শ্রমিকদের প্রত্যেককেই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে খুবই কম পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এসবের তুলনায় রিকশা চালানো কি অমানবিক? দেখা যায় ঢাকা থেকে রিকশা আটক করে অন্যান্য এলাকায় চালানোর জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। বিষয়টি কি তাহলে এরকম ঢাকার বাইরে রিকশা চললে পেশাটি অমানবিক নয়? রিকশা উচ্ছেদের পক্ষে যুক্তি দেখানোর জন্য যুক্তি প্রদর্শন করা যাবে না। রিকশা চালানোর চাইতে না খেয়ে থাক কি মানবিক? এইচডিআরসি এর ২০০৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করায় রিকশা ও ভ্যানচালকদের আয় কমেছে ৩২ থেকে ৪১ ভাগ। যা অমানবিক এবং অসাংবিধানিকও বটে। যে কোন সংস্থায় চাকরীজীবিদের বেতন ১০ ভাগ কমিয়ে দিলে কত কিছুই ঘটে যেতে পারে। অথচ রিকশা-ভ্যানচালকদের আয় এর সিংহভাগ কমে যাওয়ার পরও কোনদিক থেকে কোন কথা উঠছে না। দেখা যায়, আয় কমে যাওয়ায় তাদের পরিবারের সদস্যরা পুষ্টিকর খাদ্য, চিকিৎসা সেবা এবং শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের ছেলেমেয়রা পড়ালেখা ছেড়ে উপার্জনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া তারা আর আগের মতো গ্রামে টাকা পাঠাতে পারছে না।
রিকশা চালকরা কি ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ?
এটা ঠিক যে, রিকশাচালকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই। আর ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানা ও অমান্য করার জন্য ঢাকার প্রায় সকল পরিবহণের চালককেই দায়ী করা যায়। বাসগুলোও দাড়ানো ও অন্য গাড়িকে অতিক্রম করার সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। প্রাইভেট গাড়িচালকেরা রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং করে যানজট সৃষ্টি এবং হর্ণ বাজিয়ে নগরবাসীর বিরক্তির কারণ ঘটায়। সব ধরনের যান চালানোর জন্যই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ট্রাফিক আইন জানা-অজানার দোহাই না দিয়ে রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এর জন্য রিকশা উচ্ছেদ সমাধান নয়।
২. রিকশা কি অকার্যকর বাহন?
২০০২ সালে গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ার পর এইচডিআরসি কর্তৃক ২০০৪ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুর্বে যারা রিকশায় চলাচল করেছে তার তিন ভাগের এক ভাগ যাত্রী এখনও রিকশায় যাতায়াত করছে। এদের যাতায়াত খরচ, সময় ও দূর্ভোগ বেড়েছে। রিকশা মুল রাস্তায় চলতে না দেওয়ায় পাশর্্বরাস্তাগুলি দিয়ে ঘুরে যাওয়ার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয় নিউমার্কেট কাঁচা বাজারের ভেতর দিয়ে রিকশা লেন দেওয়া হয়েছে। সেখানে অবাধে যান্ত্রিক যানবাহন ঢুকে পড়ছে পার্কিং করছে। তাছাড়া রাস্তাটি ভাঙ্গাচোরা। যা রিকশার যাত্রী ও চালকদের দূর্ভোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। রিকশা যাত্রীদের অবশিষ্ট চার ভাগের এক মানুষ হেঁটে যাতায়াত করছে। এদের যাতায়াত সময় এবং কষ্ট বেড়ে গিয়েছে। কারণ হাঁটার পরিবেশ তৈরি করা হয় নি বা নেই যে মানুষ স্বচ্ছন্দে হেঁটে চলাচল করবে। হাঁটার জন্য কেউই উৎসাহিত হচ্ছে না বরং বাধ্য হচ্ছে। আর ৪২ ভাগ মানুষ যাতায়াতের জন্য সিএনজি/ট্যাক্সি/কার ব্যবহার করছে। সিএনজি এবং ট্যাক্সি পেতে অনক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শুধুমাত্র যারা প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করছে তাদের কিছুটা সুবিধা হয়েছে। যদিও তাদেরকেও অনেক ধরনের ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। যেমন পার্কিং করা, চালক রাখা, জ্বালানী সংগ্রহ ইত্যাদি। এই ৪২ ভাগ মানুষেরও যাতায়াত খরচ বেড়েছে। রিকশা উচ্ছেদের পর বাস ব্যবহারকারীদেরও যাতায়াত সময় বেশি লাগছে। কারণ বাসা থেকে কোন একটি মাধ্যমে বাসস্টপেজে এসে অপেক্ষা আবার বাস থেকে নেমেও গন্তব্যে যেতে আরো একটি মাধ্যম ব্যবহার করতে হয়। হিসেবে দেখা যায় এই সড়কে প্রতি ট্রিপে গড়ে পঞ্চাশ ভাগ সময় বেশি লাগছে(নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ)। তাছাড়া এইচডিআরসি এর প্রতিবেদনেই পাওয়া যায় গাবতলী থেকে রাসেল স্কয়ার রিকশা উচ্ছেদের পর গড়ে ১০ ভাগ যাতায়াত খরচ বেড়েছে। রিকশা উচ্ছেদে সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা, প্রতিবন্ধিদের। এ সকল সমস্যা থেকে অনুধাবন করা যায় ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় রিকশা একটি কার্যকরী বাহন।
৩.রিকশা কি যান্ত্রিক যানের(বাসের)প্রতিবন্ধক?
ডিইউটিপি এর পরীক্ষামূলক প্রকল্প (২০০০-০৫)পরবর্তী প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রকল্পের শুরুতে পাঁচটি সড়কের মধ্যে মিরপুর সড়কে রিকশা উচ্ছেদের পূর্বে বাসের গতি ছিল ১৭ কিমি/ঘন্টা বর্তমানে ১৩.২ কিমি/ঘন্টা এবং এয়ারপোর্ট-ফার্মগেট-গুলিস্তান সড়কে বাসের গতি ছিল ১৫.২ কিমি/ঘন্টা বর্তমানে ১৫.১ কিমি/ঘন্টা। তাহলে একটি ছোট্ট প্রশ্ন এয়ারপোর্ট-ফার্মগেট-গুলিস্তান (বাসের গতি ১৫.২ কিমি/ঘন্টা) এর পরিবর্তে মিরপুর সড়ক (বাসের গতি ১৭কিমি/ঘন্টা) এর গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হলো কেন? কেনই বা মনে হলো রিকশা রাস্তার গতি কমিয়ে দেয় এবং রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করলে গতি আরো বাড়ানো যাবে। আসলে ব্যাপারটি অনুমানের বিষয় নয় এটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার দাবী রাখে। বর্তমানে মিরপুর সড়কে বাসের গতি কমার কারণ হচ্ছে প্রাইভেট গাড়ির বৃদ্ধি।
৪.রিকশা কি রাস্তায় বেশি জায়গা নেয়?
ডিইউটিপি এর প্রকল্প(২০০০-০৫) পরবর্তী প্রতিবদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিরপুর সড়কে বর্তমানে ৬০ ভাগ যাতায়াতে প্রাইভেট গাড়ি ও অন্যান্য ছোট ছোট যানবাহন ব্যাবহার হচ্ছে। পূর্বে এই যাতায়াতের জন্য রিকশা ও সাইকেলের মতো জ্বালানীমুক্ত যানবাহন ব্যবহৃত হতো। ১৯৯৮ সালের ডিইউটিপি কতৃপক্ষরে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, রিকশা রাস্তায় ৩৮.২৬ জায়গা নিয়ে যাত্রী বহন করতো ৫৩.৯০ ভাগ এবং একই সময়ে প্রাইভেট গাড়ি ৩৪.৪১ ভাগ জায়গা নিয়ে যাত্রী বহন করেছে মাত্র ৮.৭৩ ভাগ। এসটিপির ২০০৪ আরেকটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা রিকশা প্রাইভেট গাড়ির চেয়ে আড়াই গুন বেশি যাত্রী বহন করে। রিকশা নিষিদ্ধ হওয়ায় মানুষ অল্প দুরত্বে প্রাইভেট গাড়ি বা সিএনজি ট্রাক্সি ক্যাবে যাতায়াত করতে বাধ্য বা উৎসাহিত হচ্ছে। প্রাইভেট গাড়ি রিকশার চেয়ে রাস্তায় বেশি জায়গা নেওয়ার কারণেই মিরপুর সড়কে বাসের গতি কমে গিয়েছে। সুতরাং রিকশা কোনভাবেই যান্ত্রিক যান বা বাসের গতির ক্ষেত্রে প্রবিন্ধকতা নয়।
৪.রিকশার ধারণ ক্ষমতা কি কম?
এক্ষেত্রে দেখা যাক, রিকশা নিষিদ্ধ করায় রাস্তায় যাত্রী চলাচল বা ধারন ক্ষমতা বেড়েছে না কমেছে? ডিইউটিপি এর প্রকল্প পরবর্তী প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০০ থেকে ২০০৫ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ সড়কে যাত্রী বেড়েছে ২৭ ভাগ কারণ এই সময়ে এখানে প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার কমেছে ৬.২০ ভাগ। অপরদিকে রিকশাকে কম কার্যকর বাহন আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করায় এই সময়ের মধ্যে মিরপুর সড়কে যাত্রী বেড়েছে মাত্র ১৫ ভাগ কারণ এই সড়কে প্রাইভেট গাড়ি ৫.৭৩ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। অতএব রাস্তায় যাত্রী ধারণের ক্ষেত্রে রিকশা প্রাইভেট গাড়ির তুলনায় অধিক কার্যকরী।
উপরের আলোচনা থেকে আশা করি সকলেই একমত হবেন যে, রিকশা নয় প্রাইভেট গাড়িই যানজটের অন্যতম কারণ। কিন্তু নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বেলায় কোন প্রকার কৌশল অবলম্বন করা করা হচ্ছে না। শুধুমাত্র একতরফাভাবে অনুমান এবং প্রচলিত ধারণার উপর ভিত্তি করে রিকশা উচ্ছেদ করা হচ্ছে। জনগণকে এ সম্পর্কে ভুল তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে তারা দিন দিন সুযোগ বঞ্চিত হয়ে পড়ছে। রিকশা উচ্ছেদের ফলে প্রাইভেট গাড়ি সিএনজি ট্যাক্সি ক্যাব এর উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে ট্যাক্সি সার্ভিস এবং পাবলিক পরিবহণের গুনগতমান উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করা হয় । ফলে ঢাকা শহরে বক্তিগত গাড়ির পরিমাণ দশ বছরে দিগুণ হয়েছে। ২০০৬ সাল এবং ২০০৭ সালে জ্বালানীর দাম ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ফলেও এশিয়ার তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইরানও বাংলাদেশে। বিগত দুই বছরে দেশের দূনীতি দমনের কথিত অভিযান চলার সয়মও প্রতিবছর গাড়ি বেড়েছে প্রায় ৩৭০০০টি করে। যার ৯০ভাগই ব্যক্তিগত গাড়ি। আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে রিকশা উচ্ছেদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
বাস রিকশার বিকল্প নয়। যেহেতু ঢাকার অধিকাংশ যাতায়াত অল্প দূরত্বে। এইসব জ্বালানী নির্ভর যানের উপর নির্ভরতা বাড়ার সাথে সাথে জ্বালানীর ব্যবহার, বায়ু ও শব্দদূষণ, যাতায়াত খরচ, দূর্ঘটনা, রাস্তা-ঘাট বানানোর খরচ, পার্কিং অবকাঠামো নির্মাণ খরচ, গাড়ি ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানী বেড়ে যাচ্ছে । ফলে ব্যবসায়ী নিদিষ্ট শ্রেনীর বানিজ্যের প্রসার পাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় আর্থ সামাজিক ও অর্থনীতিতর ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে বেশিরভাগ মানুষের যাতায়াত সুবিধার পাশাপাশি অর্থনেতিক উন্নয়নেও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। দশ থেকে বার হাজার টাকায় একটি রিকশা তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য জ্বালানী লাগে না, পরিবেশ বান্ধব, এটি চালিয়ে প্রচুর মানুষ জীবিকা নির্বাহ করা ছাড়াও আরো অনেকগুলি পেশার মানুষ রিকশাকে আবর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বর্তমানে রিকশা যেভাবে চলছে তাতে কিছু কিছু সমস্যা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে এই বাহনটিকে ঢাকার পরিবহণ ব্যবস্থায় বিতর্কমুক্ত ও অরো কার্যকর করা যায়।
যেমনঃ-
যে পরিমাণ যাত্রী রিকশায় যাতায়াত করছে তার উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনানুযায়ী রাস্তায় পৃথক লেন এর জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয়া।
রিকশাচালক যাতে আরেকটু কম শক্তি দিয়ে চালাতে পারে এবং যাত্রীদের আরামদায়কভাবে বসার জন্য রিকশার কাঠামোগত উন্নয়ন করা।
রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া( ট্রাফিক আইন, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে)।
ফি কমানোর পাশাপাশি প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে রিকশার লাইসেন্স প্রদান করা।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও দায়িপ্রাপ্তদের অন্যান্য বাহনের মতো রিকশাচালকদেরও প্রতিও শ্রদ্ধাপুর্ণ মনোভাব গড়ে তোলা।
বেশ কিছুদিন নিরব থাকার পর আমাদের বিশেষজ্ঞগুলো আবার সচল হয়েছেন। আবারও কলাম লিখছেন সভা সেমিনারে রিকশা বন্ধের কথা বলছেন। রিক্শাবন্ধের যুক্তিপূর্ণ কোন তথ্য উপাত্ত তার উপস্থান করতে পারছেন না। অন্যদিকে তাদের কথিত প্রকল্পগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তারা এখন বলছেন যে পৃথিবীর কোন শহরে রিকশা চলে? যে ঢাকায় রিকশা চলবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিউ ইয়কের টাইম স্কয়ার থেকে শুরু করে ঢাকাসহ ৯০টি শহরে প্রায় ৫০ লক্ষ রিকশা চলাচল করছে।
অন্য কোন দেশে মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। ভাষার জন্য আমাদের এই যুদ্ধ সারা বিশ্বে আদর্শ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সুতরাং রিকশা আমাদের দেশে চলছে চলবে, অন্য দেশে আছে কি নেই সেটি দেখার বিষয় নয়।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা এপ্রিল, ২০০৯ দুপুর ১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


