somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুফীবাদ ও আত্মদর্শন

১৮ ই আগস্ট, ২০১১ রাত ২:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সত্য এক। কিন্তু সময় ও যুগের প্রয়োজনে সত্যের প্রকাশ ঘটে নানান রূপে। আর তাইতো পৃথিবীর সকল ধর্মের মূল নির্যাস এক হলেও বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় আঁচার-অনুষ্ঠানাদীর মাঝে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রতিটি ধর্মীয় আঁচার-ব্যবস্থাই সমসাময়িক সংস্কৃতি, প্রথা, রীতি প্রভৃতি কর্তৃক প্রভাবিত। শুধুমাত্র বিভিন্ন ধর্মের মাঝে নয় বরং যুগ ও সময়ের বিবর্তনে একই ধর্মের ধর্মীয় আঁচার- অনুষ্ঠানের মাঝেও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন ইসলামের আদিযুগ থেকে শেষযুগ পর্যন্ত অর্থাৎ হযরত আদম (আঃ) থেকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত বিভিন্ন নবী রাসুলগণের শরীয়ত( ধর্মীয় আঁচার-ব্যবস্থা) একইরকম ছিল না। অর্থাৎ প্রতিটি ধর্মব্যবস্থাই সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী মহাপ্রভু কর্তৃক নির্ধারিত তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিমার্জিত হয়ে আসছে। এ পরিবর্তন ও পরিমার্জন ধর্মকে যুগোপযোগী ও সমৃদ্ধতর করার মানসেই হয়ে থাকে। অথচ এ সাধারণ সত্যটুকু অনুধাবনে সচেষ্ট না হয়ে আমরা আত্মম্ভরিতা ও স্বার্থের কলহে লিপ্ত হই এবং ক্ষেত্রবিশেষে আপন পার্থিব স্বার্থসিদ্ধিতে ধর্মকে নিজের মতো করে প্রচার ও ব্যবহার করতেও কুণ্ঠাবোধ করি না। অন্যদিকে জ্ঞান ও বুদ্ধির বিভিন্নতার কারনে প্রতিটি মানুষের উপলব্ধি ক্ষমতাও ভিন্ন। যার ফলে একই বিষয়ে প্রতিটি মানুষের উপলব্ধিও একইরকম হয় না। অতঃপর মানব প্রবৃত্তি আমিত্ম, দম্ভ ও অহংকারের সাথে সমঝোতা করতে ব্যর্থ হয়ে আত্মোপলব্ধিকেই শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি প্রদানপূর্বক অপরের মত ও পথকে অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করে। যার ফলশ্রুতিতে ভৌগলিক সীমারেখার মতোই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বোপরি সমগ্র মানব সমাজেও সৃষ্টি হয় পারস্পরিক অশ্রদ্ধা ও পরমতঅসহিষ্ণুতার বিভাজন প্রাচীর। এরই ধারাবাহিকতায় সমগ্র বিশ্ব ও বিশ্বমানবতার মানচিত্র বিভাজিত হতে হতে আজ নানান দেশ, জাতি, ধর্ম, গোত্র নামক ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর টুকরোয় বিভক্ত। ফলে মানবাত্মাকে বিকশিত করতে প্রবর্তিত ধর্ম মানব নামক কতিপয় দানবের হাতে বারংবার ব্যবহিত ও বিকৃত হয়ে আধ্যাত্মবোধহীন নৈতিকতাবিবর্জিত অনুষ্ঠানসর্বস্ব এক অধর্মে পরিণত হয়। যার ফলশ্রুতিতে মানবজাতির একাংশ আজ ধর্মব্যাবসায়ী ও ধর্মব্যবহারকারীদের দ্বারা পথভ্রষ্ট হয়ে অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে এবং অপর অংশ, বিশেষকরে যুক্তিবাদী তরুণ সমাজ ধর্মের এহেন রূপ দেখে ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে নাস্তিক্যবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অপরপক্ষে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বারংবার বিপর্যস্ত, বিকৃত ও পরিবর্তিত ইতিহাসের পাতা থেকে সত্যকে অনুসন্ধান করে উদঘাটন করাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। এমতাবস্থায় সত্যান্বেষণের সকল পরিচিত পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সত্যপ্রিয় জ্ঞানপিপাসু মানবাত্মা যখন একফালি আলোকরশ্মির প্রত্যাশায় অস্থির হয়ে ওঠে, তখনই কিছুটা অপরিচিত ও বিচিত্র এক পথের সন্ধান পায়। সেই পথ- সুফীবাদ।
সূফীবাদ এক সুবিশাল মহাসমুদ্র। এই সমুদ্রে অবগাহন ব্যাতিরেকে এর বর্ণনা অসম্ভব। তাই এই প্রবন্ধটি কোন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নয় বরং আপন জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও সঙ্কীর্ণতা স্বীকারপূর্বক সত্যান্বেষী এক মানবমনের আত্মোপলব্ধি উপস্থাপনেরই সীমিত প্রয়াসমাত্র
বিশ্বের বিখ্যাত সুফী দার্শনিক, গবেষক, কবিগণ বিভিন্ন সময়ে আপন দৃষ্টিকোণ ও উপলব্ধি থেকে সুফীবাদকে সংজ্ঞায়িত ও বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মাঝে মুহীউদ্দীন ইবনুল আরবী(১১৬৫-১২৫৩ খ্রীঃ), যুননুন মিসরী(৮৬০ খ্রীঃ), বায়েযীদ বোস্তামী (৮৭০খ্রীঃ), মনসুর হাল্লাজ(৮৫৪- ৯২২খ্রীঃ), ইমাম গাজ্জালি(১০৫৮- ১১১১খ্রীঃ), কবি ফরিদউদ্দীন আত্তার(১১২৮- ১২২৯খ্রীঃ), সানায়ী(১১৫০খ্রীঃ), মওলানা জালালুদ্দীন রুমী(১২০৭-১২৭৩খ্রীঃ), শেখ সাদী(১১৭৫- ১২৯৫খ্রীঃ), কবি হাফিজ(১৩১৫- ১৩৯১খ্রীঃ), মোল্লা জামী(১৪১৪- ১৪৯২খ্রীঃ) প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের রচিত বিভিন্ন সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের আলোকে সুফীবাদকে নিম্নরুপে সংজ্ঞায়িত করা যায়-
অধিকাংশ সুফী দার্শনিকের মতে সুফী শব্দের উৎপত্তি ‘সুফ’ শব্দ হতে, যার অর্থ পশম। পূর্বে সংসারত্যাগী সাধু সন্ন্যাসীগণ মোটা কর্কশ পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন। এই পশমী কাপড় তাঁদের অতি সাধারণ নির্বিলাস জীবনযাপনেরই পরিচায়ক ছিল।
অনেকের মতে সুফী শব্দের উদ্ভব আরবী ‘সাফা’ শব্দ হতে, যার অর্থ পবিত্রতা। তাঁদের মতে যেসকল মহাত্মা সাংসারিক পাপ-পঙ্কিলতা হতে কায়মনোবাক্যে পবিত্র, তাঁরাই সুফী।
আবার অনেকের মতে ‘আসহাবে সুফফা’ হতে সুফী শব্দের উৎপত্তি। নবী করীম (সাঃ) এর সময়ে একদল নবীপ্রেমী সংসারধর্ম ত্যাগ করে নবীজীর (সাঃ) মদীনা মুনাওয়ারাস্থ আবাসস্থল সংলগ্ন স্থানে বসবাস করতেন এবং সর্বদা আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁদের আসহাবে সুফফা নামে অভিহিত করা হয়।
বস্তুত পার্থিব কামনা-বাসনা মুক্ত, নির্বিলাস সহজসরল জীবনযাপনকারী মহৎ সাধু পুরুষগণ যারা সাধারণত্বের সীমা অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছেন, পার্থিব জ্ঞানের পাশপাশি যাদের অন্তরে সৃষ্টিকর্তা তাঁর গুপ্ত রহস্যময় জগতকে উন্মুক্ত করেছেন, যারা বহুত্বকে অতিক্রম করে একক মহাসত্যকে খুজে পেয়েছেন এবং আপন ‘আমিত্ব’ এর বিনাশে সমর্থ হয়েছেন, তাঁরাই সুফী। তাঁরাই প্রকৃত জ্ঞানী, পূর্ণমানব, সিদ্ধপুরুষ, তাঁরাই যোগ্যতম পথপ্রদর্শক, যেহেতু তাঁরা জগতপথ অতিক্রমে মহাসত্যের আলোকপ্রাপ্ত পবিত্র আত্মা। তাঁদের শারীরিক অবয়ব ভিন্ন হলেও তাঁদের আত্মা মহাপ্রভুর সত্ত্বায় সম্পূর্ণরূপে বিলীন। তাঁদের কথা-বার্তায়, কাজে-কর্মে, চলনে-বলনে তাই কেবলমাত্র সত্যের নূর তথা আলো প্রকাশিত ও বিচ্ছুরিত হয়। তাঁরা কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনার বলে আপন প্রবৃত্তি তথা কামনা, বাসনা, হিংসা, ক্রোধ, লালসা হতে মুক্ত ও পবিত্র বিধায় খোদার খোদায়ীর প্রকাশস্থল সাব্যস্ত হোন। যার ফলে তাঁদের মাধ্যমে প্রায়শ নানান অলৌকিকত্ব প্রকাশ পায়, যা প্রকৃতপক্ষে খোদার কুদরতেরই পরিচায়ক। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন-
“বান্দাগণ নফল ইবাদতের দ্বারা আমার সান্নিধ্যের প্রতি অগ্রসর হতে থাকে যে পর্যন্ত না আমি তাকে ভালোবাসি এবং আমি যখন ভালোবাসি তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হয়ে যাই যা দ্বারা সে শ্রবণ করে, আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দ্বারা সে দেখে।“ (হাদিসে কুদসী)
তাই তাঁদের কথাবার্তা, কাজকর্ম আপন ইচ্ছায় নয় বরং খোদার ইচ্ছানুযায়ী হয়ে থাকে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ পাকের সগৌরব ঘোষণা-
“আর তুমি মাটির দলা নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং।“ (সূরা আল আনফাল – আয়াতঃ ১৭)
সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই যখনই মানবজাতি অন্যায়, অবিচার, অসত্য ও পাপাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে তখনই বিশ্বকর্তা মহাপ্রভু আল্লাহ জাল্লা শানুহু স্বীয় নির্ধারিত প্রতিনিধি তথা নবী-রাসুল প্রেরণের মাধ্যমে মানবজাতিকে হেদায়েত ও মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। এই সকল নবী-রাসুলগণের প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট জাতি, গোত্র, কিংবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মানবগোষ্ঠীর হেদায়েতের দায়িত্বভার নিয়ে ধরাধমে আগমন করেন এবং স্ব স্ব দায়িত্ব যথার্থতার সহিত সুসম্পন্ন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় মানব ইতিহাসের কোন এক সুকঠিন সন্ধিক্ষণে নিকষ কালো রাত্রির শেষে প্রভাতরবির ন্যায় আবির্ভূত হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সারকারে কায়েনাত, শাহেনশাহে মদীনা, নূরে মুজাসসাম, হুযুর পুর নূর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মোজতবা (সাঃ)। তিনি খোদার খোদায়ীর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন রূপে এ ধরায় আগমন করেন এবং জাতি-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এমনকি শুধুমাত্র মানবজাতিকে নয় বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতকে তাঁর রহমতের আওতাভুক্ত করে ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ রূপে খোদায়ী প্রশাসনের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হোন। অতঃপর তিনি বিশ্ববাসীর জন্য খোদাপ্রদত্ত দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান করেন এবং ‘খাতেমুন নবীঈন’ রূপে নবুয়ত যুগের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন।
পরম করুণাময় আল্লাহতাআলার প্রিয়তম মাহবুব সৈয়দুল মুরসালীন নবী করীম (সাঃ) তাঁর রবের পক্ষ হতে দুইটি সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত অর্জন করেন। এর একটি হল নবুয়ত[(অহীর মাধ্যমে খোদায়ী নির্দেশ লাভ) এবং অপরটি হল বেলায়ত(খোদার নিকটতম রহস্যপূর্ণ সম্পর্ক)। একমাত্র নবীজির (সাঃ) সত্ত্বায়ই এই দুইটি নেয়ামত পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয় বিধায় তিনিই সমগ্র জগতে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রুপ। নবুয়ত যুগের পরিসমাপ্তির সাথে সাথে হুযুরে পাক (সাঃ) বিপদগ্রস্ত বিশ্বমানবতার জন্য হেদায়েতের ধারা অব্যাহত রাখার মানসে হযরত আলী (রাঃ)কে বেলায়তের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার মাধ্যমে বেলায়ত যুগের আনুষ্ঠানিক সুচনা করেন(যদিও সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকেই নবুয়তের মাঝেই বেলায়ত বিদ্যমান ছিল) এবং বেলায়তকে রেসালাতের প্রতিনিধিত্বকারী সাব্যস্ত করেন। অতঃপর তাঁরই পবিত্র বংশধারায় অসংখ্য আউলিয়া কেরাম তাঁরই উসুল এবং আদর্শের মশাল হাতে যুগে যুগে এ ধরায় আগমন করেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন মানব হৃদয়ে আল্লাহতাআলা ও তাঁর মাহবুবের প্রেমের প্রদীপ প্রজ্বলনপূর্বক পথভ্রষ্ট ও দিকভ্রান্ত মানবজাতিকে নানান হেকমত সহকারে ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ এর পথে আহ্বান করেন। বেলায়তের এ ক্রমপ্রবাহমান ধারায় গুপ্ত ও ব্যক্ত অসংখ্য অলী-উল্লাহ্‌র আবির্ভাব যুগে যুগে ঘটে এবং এই ধারা পৃথিবী নশ্বরের শেষদিন পর্যন্ত জারি থাকবে। এইসকল সুফীসাধক কিংবা আউলিয়াকেরামগণ মূলত খোদার প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রূপে নিয়োজিত থাকেন এবং মহাপ্রভুর নির্দেশে সমস্ত কার্য সমাধা করে থাকেন।
এখন বর্তমান সময়ে এই সুফীবাদের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অবিশ্যম্ভাবী বাণী- “ শেষ জামানায় আমার উম্মত ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত হবে” এর পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় প্রকৃতপক্ষেই সমগ্র মানবজাতি আজ তিন কুড়ি তের ফেরকায় বিভক্ত। প্রত্যেকেই আজ স্রষ্টা প্রদত্ত সত্যকে জানার চেষ্টা না করে আত্মোপলব্ধ ধর্মকে প্রতিষ্ঠায়ই ব্যাতিব্যস্ত। এমনকি বিশ্বের প্রসিদ্ধ বহু আলেমগণ(Islamic scholars) আজ পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে আপন অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি সরলমনা সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি আরও বৃদ্ধি করছেন। এমতাবস্থায় সত্যানুসন্ধিৎসু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্ত, দ্বিধান্বিত হয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে।
দ্বিধাগ্রস্ত এই মানজাতির জন্যই কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট নির্দেশনা-
“আমাদের সরল পথ দেখাও। সেই সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাঁদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।“
(সূরা ফাতিহা - আয়াতঃ ৬-৭)
“অনুসরণ কর তাঁদের, যারা তোমাদের কাছে কোন বিনিময় কামনা করে না, অথচ তাঁরা সুপথপ্রাপ্ত।” (সূরা ইয়াসীন - আয়াতঃ ২১)
নিঃসন্দেহে আল্লাহর অলিগণই এই ‘সুপথপ্রাপ্ত’ ও ‘অনুকরণীয়’ দের দলভুক্ত। তাঁদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি, সার্বজনীন প্রেমময় জীবন দর্শন, উন্নত চরিত্র, খোদায়ী জগত হতে আহরিত গুপ্ত জ্ঞান সর্বোপরি তাঁদের নানান অলৌকিক ঘটনাবলি বা কারামত তাঁদের খোদায়ী সম্পর্কের সনদ প্রদান করে।
ফেরেশতাদের সর্দার আযাযীল ৭০ হাজার বছর আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকার পরও আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত যখন স্বীয় প্রতিনিধি হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করলেন এবং সমস্ত ফেরেশতাদের প্রতি তাঁকে সিজদার নির্দেশ জারী করলেন, আযাযীল অহংকারবশত তা প্রত্যাখ্যান করল, যেহেতু আদম (আঃ) মাটির তৈরি অথচ সে আগুনের তৈরী (''কাসাসুল আম্বিয়া'' গ্রন্থ অনুসারে ফেরেশতা সর্দার আজাজীল প্রকৃতপক্ষে জীন সন্তান ছিল। পৃথিবীতে মানবজাতি সৃষ্টির পূর্বে জীনদের বসবাস ছিল, এইসকল জীনদের পাপাচার যখন অত্যাধিক হয়ে গিয়েছিল, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতা প্রেরণ করেন এই সকল জীনদের বিনাশ করতে। ফেরেশতারা সব জীনদের হত্যা করলেও অত্যন্ত মায়াময় এক জীন সন্তান কে দেখে তাঁদের দয়া হয়, তাঁরা ঐ জীন সন্তানকে হত্যা না করে তাকে ফেরেশতাদের রাজ্যে নিয়ে আসে। কালক্রমে এই জীন সন্তানই তার অত্যাধিক ইবাদতের মাধ্যমে ফেরেশতাদের সর্দার হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তাই ফেরেশতা সর্দার আযাযীল আল্লাহর নূরের নয় বরং আগুনের তৈরি(জীনদের ন্যায়), ইহাই মূলত তার অবাধ্য আচরণের কারন।) । ফলে ইলম(জ্ঞান) ও আমল(কর্ম) এর দম্ভে মোহান্ধ ফেরেশতা সর্দার শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধিকে অস্বীকার ও অসম্মান করায় তার সমস্ত ইবাদত তার রবের দরবারে প্রত্যাখ্যাত হল এবং সে চিরকালের জন্য অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হল। এই ঘটনার আলোকে প্রতীয়মান হয় আল্লাহর প্রতিনিধিকে স্বীকৃতি প্রদান, তাঁর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁর পরিপূর্ণ আনুগত্য স্বীকার ব্যতীত ঈমান, ইলম ও আমল সবই স্রষ্টার নিকট অপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য। তাই আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি রূপে যেমন নবী- রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য অপরিহার্য তেমনিভাবে নবুয়ত যুগের পরবর্তী এ যুগে আমিত্বের বিনাশ ও অহংকার পরিহারপূর্বক স্রষ্টার প্রতিনিধি রূপে তাঁর আউলিয়াকেরামের আনুগত্য ও অনুসরণও অনস্বীকার্য।
অতএব বোঝা যায়, বর্তমান দ্বিধাবিভক্ত বিশ্বের এই আখেরি জামানায় যখন বিশ্বাস তথা ঈমান সংরক্ষণ হাদিসে নববী অনুসারে ‘হাতের তালুতে জ্বলন্ত কয়লার টুকরা ধারণের চাইতেও কঠিনতর’ এরূপ অবস্থায় একজন প্রকৃত জ্ঞানী শিক্ষক কিংবা পথপ্রদর্শক ব্যতিরেকে সত্যানুসন্ধান তথা মহান সৃষ্টিকর্তার পরিচয় ও সন্ধান লাভ অসম্ভব। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য যেরূপ উক্ত বিষয়ে পারদর্শী শিক্ষক নির্ধারিত, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ কিংবা তন্ত্রের রোগের চিকিৎসার জন্য যেরূপ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুনির্দিষ্ট, ঠিক তেমনিভাবে মানবাত্মা যখন অনিয়ন্ত্রিত প্রবৃত্তির(কামনা, হিংসা, লালসা, ক্রোধ, ভোগবৃত্তি) বশবর্তী হয়ে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন একজন রুহানী চিকিৎসকের আবশ্যকতা প্রকট হয়ে পড়ে। বস্তুত নবী-রাসুলগণের পর এই সকল সুফিসাধক, আউলিয়াকেরামগনই যুগ যুগ ধরে রোগাক্রান্ত মানবাত্মার সুচিকিৎসার মহান ব্রত নিয়ে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে নিরবে নিভৃতে কাজ করে আসছেন। এই চিকিৎসক, শিক্ষক তথা পথপ্রদর্শকের অনুসন্ধানপূর্বক তাঁর পবিত্র সত্ত্বায় পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাঁর দর্শন বা তরীকার অনুশীলন প্রতিটি সত্যান্বেষী মানুষের জন্যই অপরিহার্য। উল্লেখ্য বিশ্বে সময় ও যুগের প্রয়োজনে অসংখ্য সূফীদর্শন তথা তরীকার উদ্ভব ও বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। তন্মধ্যে কাদেরীয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, মৌলবিয়া, মাইজভাণ্ডারী তরীকাসহ বহু তরীকা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে যখন সকলেই আপন পার্থিব জ্ঞান ও যোগ্যতার অহংকারে মোহাচ্ছন্ন হয়ে অপরের মতাদর্শের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অবজ্ঞা, পরচর্চা, পরশ্রীকাতরতা, হিংসা ও ক্রোধের চরিতার্থে ব্যতিব্যস্ত, তখন তাসাউফ বা সূফীবাদ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রজ্বলিত প্রদীপের ন্যায় মানবঅন্তরে প্রেম, ধর্মসাম্য, পরচর্চা পরিহারপূর্বক আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধন, আমিত্বের বিনাশ, অহংকারের পরিহার ও আদবের দীক্ষার আলো বিকিরণে তৎপর। তাই সূফীবাদ সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানার্জন ও এর চর্চার মাধ্যমে বর্তমান বিক্ষুব্ধ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ব্রতি হয়ে খোদায়ী অনুগ্রহ ও নৈকট্য অর্জনের আহ্বান জানাই। পরিশেষে লালনের ভাষায় আবারও আপন জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার সরল স্বীকারোক্তি-
বলব কি সে নূরের ধারা, নূরেতে নূর আছে ঘিরা, ধরতে গেলে না যায় ধরা...




সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১২:৪৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×