somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তৃতীয় বাংলার প্রজন্ম আর কিছু টুকরো প্রসঙ্গ

০১ লা জুলাই, ২০১১ সকাল ১১:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শুচি সৈয়দ
গত শুক্রবার সকালে নাসের ভাই আমাকে তাঁর সরকারি শকটে তুলে নিলেন মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে। সেখানে তাঁর বিভাগীয় অনুষ্ঠানÑ ফল ও বৃক্ষমেলার উদ্বোধন। এ মাসটি পুরোটাই ব্যস্ত তিনি। বৃক্ষমেলার জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনসহ বৃক্ষসৃজনের কর্মকাণ্ডে। গাড়ি গ্যাস নিতে দাঁড়ালে আমরা নেমে কথা বলছিলাম। তিনি ব্যক্ত করলেন তাঁর নেক্সট লেখার পরিকল্পনা। ‘মাটি ছাড়া চাষাবাদ’Ñ এ বিষয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছে তাঁর। আমার মনে পড়ল, অনেক দিন আগে একটা ফিচার পড়েছিলাম এ বিষয়ে; জাপানিরা ছাদে ধান চাষ করছে বাঁশের পাইপের মত পাইপে। সেটাকে একটা সৌখিনতা কিংবা গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে নাম ওঠাবার তৎপরতা বলে এক ধরনের খসড়া ধারণায় উপনীত হয়েছিলাম। একেবারে মাটি ছাড়া ফসল ফলাবার বাস্তবতাকে বাস্তব বলে উপলব্ধি করা বোধকরি এই একুশ শতকেও বেশ কষ্টকর। অনেক অবিশ্বাস্য জিনিস আমাদের হাতের মুঠোয় বন্দি তবুও যেন অনেক কিছুই বাস্তব নয়Ñ!
বছর কয়েক আগে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ এক কলিগের সঙ্গে গিয়েছিলাম সাভার। সেখানে এক লোক, সবাই তাকে ‘জিন হুজুর’ বলে ডাকেÑ তো প্রতাপশালী সেই ‘জিন হুজুরে’-র হাতে দেখলাম মোবাইল ফোনÑ ‘জিন হুজুর’ সেটার নাম্বার লিখে ফোন করা ছাড়া অন্যান্য অপশন জানেন নাÑ মনে মনে ভাবছিলাম, হুম, ‘জিন হুজুর’ জিন হাজির করেন বটে কিন্তু তার হাতের মুঠোর জিন (মোবাইল ফোনটির) বিষয়ে নেহায়েতই হদিসহীন!
প্রযুক্তি এতোদূর এগিয়েছে যে, জর্জ অরওয়েল-এর লেখা আলোচিত ভবিষ্যৎ কল্পোপন্যাস ১৯৮৪ উপন্যাসের বস সর্বক্ষণ আমাদের অনুসরণ করছে অবয়বহীন এক চোখেÑ দুর্ভাগ্য জর্জ অরওয়েল-এরÑ মানুষের প্রাইভেসি কিংবা ব্যক্তি জীবনকে বিপন্ন করে তোলা সে বসÑ সমাজতান্ত্রিক সমাজের কোনও স্বৈরাচারী শাসক ননÑ সে বস বরং পুঁজিবাদী কর্পোরেট দুনিয়ার অধীশ্বররাই। শুধুমাত্র ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করে হত্যা করাই নয়Ñ এখন আর ইচ্ছে করলেই কেউ হারিয়ে যেতে পারবে নাÑ তার শ্যেন দৃষ্টি থেকে।
‘ধান ভানতে শিবের গীত’ বলে একটা প্রবাদ আছে আমাদের বাংলা ভাষায়। অনেকটা তেমনই আমরা প্রসঙ্গান্তরে চলে এসেছি তবে সেটা প্রসঙ্গক্রমেই। শুক্রবারের দিনই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এই খবরটিও যে, মহাশূন্যে ফসল ফলিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমি নাসের ভাইকে খবরটি পড়ে শোনাইÑ বিষয়টি খুব বেশি উত্তেজিত করে না তাকে। ভেতরে ভেতরে যদিও উত্তেজিত বোধকরি আমি। বলা যায় স্পার্কড হইÑ টুকরো টুকরো নানা স্মৃতি-সত্তা-চিন্তার স্ফূলিঙ্গে। নাসের ভাইয়ের সরকারি চান্দের গাড়িতে ঝাঁকুনি খেতে খেতেÑ ওয়েল্ডাররা যেমন ঘন কাঁচের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ওয়েল্ডিঙের কাজ করে স্ফুলিঙ্গের জš§ দিয়ে তেমনই আমার ভাবনাগুলো স্ফূলিঙ্গ কণার মত ছোটাছুটি করে।
গত কিছুদিন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি চলছে আমাদের দেশের কোন কোন ব্যবসায়ী শিল্পপতি ও শিল্পগোষ্ঠী আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে চাষাবাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী জমি লীজ নিয়ে ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন। ইতিপূর্বে শুনেছি এবং একথা জানাও যে, আমাদের দেশের অনেক ব্যবসায়ী তাদের গার্মেন্টসসহ অন্য অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন ভিয়েতনামে। কেননা সেখানে হরতাল ধর্মঘট ইত্যাদির কারণে উৎপাদন ব্যাহত, রপ্তানি বিঘিœত হয়না। ক’দিন আগে সংবাদ ছাপা হয়েছে দেখলাম, মালয়েশিয়ায় শিল্পমন্ত্রী বাংলাদেশে সফরে এসে এদেশের প্রথম প্রজšে§র কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্র“পকে মালয়েশিয়ার শিল্পপার্কে শিল্প স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বায়নের যুগে এটা একটা স্বাভাবিক প্রবণতা বটে। আমাদের দেশেও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় অনেক বিদেশী শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। বিশ্ব পুঁজিবাদ এখন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী যুগ পেরিয়ে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদী যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বায়নের ভেলকির ভেতর নানান কায়দা কসরতে সাদা অর্থনীতির ভেতর কালো টাকার প্রবেশ-অনুপ্রবেশ-আগমন-প্রস্থানের মধ্য দিয়ে মেলানো হচ্ছে বিবিধ প্রকারের হিসাব-নিকাশ। সেগুলো বোঝার জ্ঞানগম্যি আমার নেই। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেখলাম আপত্তি তোলা হয়েছে বিদেশে চাষাবাদের ওই উদ্যোগের বিরোধিতা করে। এতোদিন আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অদক্ষ শ্রমদাস পাঠিয়ে রেমিটেন্স আহরণ করেছি; এখন জমাজমি চাষ করে অর্থ উপার্জন করবÑ ভেতরে ভেতরে কৃষিতে কি আমরা সাবালকত্ব অর্জন করে ফেলেছি? বোধকরি। বন কেটে বসত গড়ায় আমাদের পূর্ব-পুরুষরা একেবারেই অদক্ষ ছিলেন না। উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে তারা ঘন বনজঙ্গল কেটে সাফ করেই চাষোপযোগী মাটি বের করেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসাম প্রদেশে, ঝাড়-খণ্ডে বাঙালি বসত তো সেভাবেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সারা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে আছে প্রায় এক কোটি বাঙালি, যার সিংহভাগই বাংলাদেশী বাঙালি। পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এই বাঙালিরা নিজেদেরকে পরিচয় দিচ্ছেন ‘তৃতীয় বাংলা’র বাঙালি বলে। আমি জানি না অন্য কোনও জাতি এভাবে নিজেদেরকে ‘তৃতীয়...’ কোনও সম্বোধনে নিজেদের পরিচয় ব্যক্ত করার সামর্থ রাখে কি না। তাদের ব্যাখ্যা অনেকটা এরকম, প্রথম বাংলা হচ্ছেÑ বাংলাদেশ, দ্বিতীয় বাংলা হলÑ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং তৃতীয় বাংলা হচ্ছেÑ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাবৎ বাঙালি। আমি এই হিসেবের মধ্যে ভারতের ঝাড়খণ্ড এবং আসামের বাঙালিদেরও শামিল ভাবতে চাই। বলা হয়, নীল আর্মস্ট্রং নাকি চাঁদে গিয়ে নোয়াখালীর একজন বাঙালিকে দেখে এসেছিলেন। বিশ্বব্যাপী এই বাঙালি বিস্তৃতির কালে বাঙালিরা বিদেশের মাটি চষে ফেরার পাশাপাশি চাষাবাদ করবে সেটা খুব আশ্চর্যজনক কোনও বিষয় নয়। বরং এ হচ্ছে আমাদের এক ধরনের সক্ষমতার নিদর্শনÑ এই খবর পড়ে শুধু এটাই আমার মনে হয়েছে এই সক্ষমতাকে আমাদের দেশে প্রয়োগে আমাদের বাধাসমূহ কি কি? সারা পৃথিবীব্যাপী যখন এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ভূমি উর্বরা বলে খ্যাত! ঊলা হয়, এখানে বীজ ফেললেই ফসল জšে§ তখন সেখানকার উদ্যোক্তারা কেন আফ্রিকার উষর মরুতে শস্য উৎপাদনের কঠিন কাজে পাড়ি জমাবে? যে মাটি তার উর্বরতার জন্য জগদ্বিখ্যাত সেখানে কেন বীজ ফেললে পঁচে যাবে তা? সমস্যাটা কোথায়? প্রতিবন্ধকতাগুলোই বা কি? ব্যবধান গুলো কি কি এই বাংলার বাস্তব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়Ñ সেটাই আমার জানার আগ্রহ। আমরা অনেক আদিখ্যেতা করে বলিÑ ‘‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা/ তোমাতে বিশ্বময়ের, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।’’ সেই পুণ্যময়ী মাটির বুকে পা-টিই রাখবার ভরসা কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে আমাদের?
২৭ জুন ২০১১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×