somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্যালুট এড্রিক বেকার

০২ রা জানুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৫:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭১। বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। ভিয়েতনামে একটি চিকিৎসক দলের হয়ে কাজ করছিলেন তিনি। সংবাদমাধ্যমে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই—এসব কথা জানতে পারেন। পত্রপত্রিকায় দেখা নির্যাতিত মানুষ ও শরণার্থীদের অসহায় মুখগুলো মনে দাগ কাটে তাঁর। তখনই ঠিক করে ফেলেন, সময়-সুযোগ হলে বাংলাদেশে ঘুরে আসবেন। একসময় সুযোগ মিলে। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। কিছু দিন ঘুরে বেড়ানোর পর এ দেশের মাটির টানে তিনি বাঁধা পড়ে যান। তারপর একে একে কেটে গেল ৩২টি বছর। এর মধ্যে গত ২৮ বছর ধরে তিনি বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে। এই ভিনদেশি মানুষটির নাম এড্রিক বেকার। মধুপুরের শোলাকুড়ি ইউনিয়নের কাইলাকুড়ি গ্রামে চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে তাঁর। সেখানে প্রতিদিন গড়ে বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছে দেড় শতাধিক রোগী।

১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে এড্রিক বেকারের জন্ম। বাবা জন বেকার একজন পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন। মা বেটি বেকার শিক্ষক ছিলেন। এখন নিজ দেশে অবসরজীবন কাটাচ্ছেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বেকার দ্বিতীয়। তাঁর ভাইবোনেরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। ছোটবেলা থেকেই বেকারের ইচ্ছা, বড় হয়ে মানুষের সেবা করবেন। চিকিৎসক হলে এই সুযোগ বেশি বলে তিনি ঠিক করেন এ পেশায় আসবেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ডুনেডিন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ওয়েলিংটনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের শল্য চিকিৎসক দলে যোগ দেন। চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কাজ করেন। মাঝে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে শিশুস্বাস্থ্যসহ তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। এর মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। সুস্থ হয়ে ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
বাংলাদেশে এসে বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দুই বছর কাজ করেন। পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে আট মাস কাজ করেন। বেকারের কোনো বড় হাসপাতালে কাজ করার ইচ্ছা ছিল না। ইচ্ছা ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার। সে চিন্তা থেকেই তিনি যান মধুপুর গড় এলাকায়। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে টের পান স্থানীয় ভাষা শিখে নেওয়া দরকার। মধুপুরের জলছত্র খ্রিষ্টান মিশনে এক বছর থেকে বাংলা ভাষা শিখে নেন। এরপর যোগ দেন স্থানীয় থানারবাইদ গ্রামে অবস্থিত চার্চ অব বাংলাদেশের একটি ক্লিনিকে। তখন থেকেই পাহাড়ি এলাকায় গরিব ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন বেকার।

১৯৮৩ সালে চার্চ অব বাংলাদেশের ক্লিনিকে দুজন খণ্ডকালীন ও তিনজন সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়ে বেকারের যাত্রা শুরু হয়। দিন দিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। তখন বেকার থানারবাইদের পাশের গ্রাম কাইলাকুড়িতে ১৯৯৬ সালে উপকেন্দ্র খুলে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে কাইলাকুড়ি গ্রাম। ২০০২ সালে কাইলাকুড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন তিনি। চার একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত বেকারের চিকিৎসাকেন্দ্র। ছোট ছোট মাটির ঘরে ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষ্মা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগ রয়েছে। সব বিভাগ মিলিয়ে ৪০ জন রোগীকে ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানেই চলছে তাঁর সেবা কার্যক্রম। বেকার দু-এক বছর পরপর নিজ দেশে গিয়ে স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই চিকিৎসাকেন্দ্র চালানোর টাকা জোগাড় করেন। এখানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় ৮৭ জন তরুণ-তরুণী। সেবা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে নিয়েছেন।

চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক রোগী আসে। সেখানে জ্বর, ডায়াবেটিস, পেটের পীড়া ও পুষ্টিহীনতায় ভোগা রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ দেওয়া হয়। হাত-পা ভাঙাসহ অন্যান্য জটিল রোগীদের জন্য আবাসিক চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে রোগীর জন্য ১০০ টাকা ও রোগীর সহযোগীর জন্য ২০০ টাকা এককালীন নেওয়া হয়। বাকি সব ব্যয় চিকিৎসাকেন্দ্র বহন করে।

বেকার বলেন, এ দেশের মানুষ খুব ভালো। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষই চিকিৎসাসেবা পায় না। এসব মানুষের সেবা করতেই আমি এ দেশে থেকে যাই। দেশে গেলে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কবে আবার তোমার দেশে ফিরে যাচ্ছো?’ বেকার আরও বলেন, ‘প্রতিবছর এ দেশে অনেক ছেলেমেয়ে চিকিৎসক হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ না কেউ একদিন চলে আসবেন আমাদের হাসপাতালে। গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবা করবেন। সে রকম একজন মানুষের অপেক্ষায় আছি।’

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন বেকার। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তার নেই। বাংলাদেশ সরকার কি পারে না মহান এই চিকিৎসককে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করতে?

(লেখাটি ২০১০ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। এড্রিক বেকারকে নিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১১ শুক্রবার বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছে। তাছাড়া বিকল্প মিডিয়া, ফেইসবুকে লেখা হয়েছে।)
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×