১৯৭১। বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। ভিয়েতনামে একটি চিকিৎসক দলের হয়ে কাজ করছিলেন তিনি। সংবাদমাধ্যমে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই—এসব কথা জানতে পারেন। পত্রপত্রিকায় দেখা নির্যাতিত মানুষ ও শরণার্থীদের অসহায় মুখগুলো মনে দাগ কাটে তাঁর। তখনই ঠিক করে ফেলেন, সময়-সুযোগ হলে বাংলাদেশে ঘুরে আসবেন। একসময় সুযোগ মিলে। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। কিছু দিন ঘুরে বেড়ানোর পর এ দেশের মাটির টানে তিনি বাঁধা পড়ে যান। তারপর একে একে কেটে গেল ৩২টি বছর। এর মধ্যে গত ২৮ বছর ধরে তিনি বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে। এই ভিনদেশি মানুষটির নাম এড্রিক বেকার। মধুপুরের শোলাকুড়ি ইউনিয়নের কাইলাকুড়ি গ্রামে চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে তাঁর। সেখানে প্রতিদিন গড়ে বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিচ্ছে দেড় শতাধিক রোগী।
১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে এড্রিক বেকারের জন্ম। বাবা জন বেকার একজন পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন। মা বেটি বেকার শিক্ষক ছিলেন। এখন নিজ দেশে অবসরজীবন কাটাচ্ছেন। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বেকার দ্বিতীয়। তাঁর ভাইবোনেরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। ছোটবেলা থেকেই বেকারের ইচ্ছা, বড় হয়ে মানুষের সেবা করবেন। চিকিৎসক হলে এই সুযোগ বেশি বলে তিনি ঠিক করেন এ পেশায় আসবেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ডুনেডিন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ওয়েলিংটনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের শল্য চিকিৎসক দলে যোগ দেন। চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি কাজ করেন। মাঝে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে শিশুস্বাস্থ্যসহ তিনটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। এর মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। সুস্থ হয়ে ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
বাংলাদেশে এসে বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দুই বছর কাজ করেন। পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী হাসপাতালে আট মাস কাজ করেন। বেকারের কোনো বড় হাসপাতালে কাজ করার ইচ্ছা ছিল না। ইচ্ছা ছিল প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করার। সে চিন্তা থেকেই তিনি যান মধুপুর গড় এলাকায়। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে টের পান স্থানীয় ভাষা শিখে নেওয়া দরকার। মধুপুরের জলছত্র খ্রিষ্টান মিশনে এক বছর থেকে বাংলা ভাষা শিখে নেন। এরপর যোগ দেন স্থানীয় থানারবাইদ গ্রামে অবস্থিত চার্চ অব বাংলাদেশের একটি ক্লিনিকে। তখন থেকেই পাহাড়ি এলাকায় গরিব ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন বেকার।
১৯৮৩ সালে চার্চ অব বাংলাদেশের ক্লিনিকে দুজন খণ্ডকালীন ও তিনজন সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়ে বেকারের যাত্রা শুরু হয়। দিন দিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। তখন বেকার থানারবাইদের পাশের গ্রাম কাইলাকুড়িতে ১৯৯৬ সালে উপকেন্দ্র খুলে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে কাইলাকুড়ি গ্রাম। ২০০২ সালে কাইলাকুড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন তিনি। চার একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত বেকারের চিকিৎসাকেন্দ্র। ছোট ছোট মাটির ঘরে ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষ্মা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগ রয়েছে। সব বিভাগ মিলিয়ে ৪০ জন রোগীকে ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানেই চলছে তাঁর সেবা কার্যক্রম। বেকার দু-এক বছর পরপর নিজ দেশে গিয়ে স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই চিকিৎসাকেন্দ্র চালানোর টাকা জোগাড় করেন। এখানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে রোগী দেখেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় ৮৭ জন তরুণ-তরুণী। সেবা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে নিয়েছেন।
চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় শতাধিক রোগী আসে। সেখানে জ্বর, ডায়াবেটিস, পেটের পীড়া ও পুষ্টিহীনতায় ভোগা রোগীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র ও ওষুধ দেওয়া হয়। হাত-পা ভাঙাসহ অন্যান্য জটিল রোগীদের জন্য আবাসিক চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে। এসব রোগীর ক্ষেত্রে রোগীর জন্য ১০০ টাকা ও রোগীর সহযোগীর জন্য ২০০ টাকা এককালীন নেওয়া হয়। বাকি সব ব্যয় চিকিৎসাকেন্দ্র বহন করে।
বেকার বলেন, এ দেশের মানুষ খুব ভালো। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষই চিকিৎসাসেবা পায় না। এসব মানুষের সেবা করতেই আমি এ দেশে থেকে যাই। দেশে গেলে মা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কবে আবার তোমার দেশে ফিরে যাচ্ছো?’ বেকার আরও বলেন, ‘প্রতিবছর এ দেশে অনেক ছেলেমেয়ে চিকিৎসক হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ না কেউ একদিন চলে আসবেন আমাদের হাসপাতালে। গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষের সেবা করবেন। সে রকম একজন মানুষের অপেক্ষায় আছি।’
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আছেন বেকার। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব তার নেই। বাংলাদেশ সরকার কি পারে না মহান এই চিকিৎসককে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করতে?
(লেখাটি ২০১০ সালে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। এড্রিক বেকারকে নিয়ে গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১১ শুক্রবার বিটিভিতে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছে। তাছাড়া বিকল্প মিডিয়া, ফেইসবুকে লেখা হয়েছে।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

