সম্প্রতি ডেইলি ষ্টার এর উদ্যোগে ঢাকার মিরপুরে ইন্ডোর ষ্টেডিয়ামে ইংরেজী মাধ্যমের এ লেভেল এবং ও লেভল পাশ করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেই সমস্ত শিক্ষার্থীদের অবিহিত করা হয় এক্সট্রাঅরডিনারি হিসেবে যার বাংলা বোধহয় অসাধারণ। এবং এই অসাধারণদের পুরষ্কৃত করার উদ্যোগ নিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয় যেখানে সর্বজন পরিচিত ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ আরো কয়েকজন ছিলেন। যথারীতি গ্রামীণ ফোন এবং ব্র্যাক ব্যাংকসহ আরো কারা কারা যেন সেই মহতি অনুষ্ঠানের স্পন্সর ছিলেন। তো সমস্ত আয়োজনকে ডেইলি ষ্টার মলাটবদ্ধ করে একটি প্রকশনা বের করে। সেই প্রকাশনাটিই এই লেখার সূত্র।
অনুষ্ঠানটিতে কয়জন শিক্ষার্থী ছিলেন তার হিসেব জানা নেই। তারা সকলেই ২০০৭-২০০৮ ও লেভেল এবং এ লেভেলের শিক্ষার্থী। তাদের কেউ কেউ বিশ্বব্যাপি ও লেভেল এবং এ লেভেল এ সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে। ফলে তারা আলাদা মনোযোগের দাবি রাখেই। কিন্তু খটকা তৈরি হল-স্যল্যুটিং দি নেশন বিল্ডার্স অব টুমরো স্লোগানটি দেখে। মনোযোগ দিয়ে প্রকাশনাটি পড়তে শুরু করলাম। সেখানে তেমন কিছুই নেই। অংশগ্রহণকারীদের জীবনের উদ্দেশ্য আর প্রিয় সংলাপকে প্রধাণ করেই ছাপানো হয়েছে। ফলে এই সমস্ত অসাধারণরা কিভাবে নেশনকে বিল্ড করবে তা সহজেই আঁচ করা যায়। তাই নিয়ে আপনাদের সাথে একটু আলোচনা করতে চাই।
তার আগে নেশন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতিটুকু দিতে চাই- নেশন একটি সজীব সত্ত্বা, একটি মানস পদার্থ। দুটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর-একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর-একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা-যে অখন্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা।
যে পাতা থেকে শুরু হয়েছে শিক্ষার্থীদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং প্রিয় উদ্ধৃতি তার প্রথম এবং শেষ পাতাতেই আপনাকে আঁৎকে উঠতে হবে। প্রথম পাতায় একজন চায় গুড মুসলিম হতে-শেষ পাতায় একজন চায়-টু বি এ সাকসেসফুল ফিগার ইন দি করপোরেট ওয়ার্ল্ড। গুড মুসলিম হওয়া খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সেটা কখন জীবনের প্রধাণ উদ্দেশ্য হয়। আর যে করপোরেট নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে গোটা জাতির-তাই হতে চায় এই অসাধারণরা। একজন নয়, এমন কয়েকজন আছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থীই ইঞ্জনিয়ার হতে চান ডাক্তার হতে চান-কেউবা অর্থনীতিবীদ। সবাই চান সাফল্য-বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে চান। কিন্তু নিজের মুখ কালো রেখে কিছুতেই তা সম্ভব নয়-এই বাস্তবতা ঠিকই শিখে গেছেন তারা। একজন চান জীবনে সফল মানুষ হতে। তার প্রিয় উদ্ধৃতি-এন্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ, এন্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ। আশা জাগে হয়তো। কিন্তু ঐকতান যে নেই তাতো বোঝাই যায়। একজন ডাক্তার হতে চায়-কিন্তু এটাই তার জীবনের শেষ বিশ্বাস যে,আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, মোহাম্মদ আল্লাহর দূত। আরেকজনও ডাক্তার হতে চান। তবে- আল্লাহ্ ইস হিস গার্ডিয়ান, ইমান ইস হিস এসট্রেন্থ, ইট ডাস নট ম্যটার হোয়াট হ্যাপেনস। আল্লাহ ডিসাইডস হিস ফেইট। তারপরও হয়তো আশা জাগে যখন কেউ বলে সে পৃথিবী থেকে নৃশংসতা দূর করবে। কিন্তু তার প্রিয় উদ্ধৃতি যখন-স্ট্রাইভিং ফর এক্সিলেন্স মোটিভেটস ইউ, স্ট্রাইভিং ফর পারফেকশান ডিমোরালাইজেস ইউ, তখন ভরসা কোথায় পাই।
কিছু এ্যম্বিশন শুনে মজা পাবেন- একজন আকাশের তারা দেখে নিজের উৎসাহ খুঁজে পান-তিনি ভবিষ্যতে জ্যোতিষ হতে চান। আরেকজন চেলসি ফুটবল দলের দায়িত্ব নিতে চান। আরেকজনের মতামত কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না। তিনি ধর্মবিজ্ঞান গড়ে তুলতে চান। নাম দিয়েছেন রিলিওসায়েন্স। আরেকজন কিছুই হতে চান না। কারণ ভবিষ্যত বসে থাকলেও আসবে। একজনতো তার উদ্দেশ্যই উল্লেখ করেন নি। শুধু উদ্ধৃতি দিয়েছেন-খুবই দারুণ। এ ড্রিম ইউ ড্রিম এলোন ইস অনলি এ ড্রিম। এ ড্রিম ইউ ড্রিম টুগেদোর ইস রিয়েলিটি। আরো হয়তো আছে পুরোটা পড়া হয়নি।
একজন হতে চান পৃথিবীর সেরা ব্যবসায়ী। এবং তার এই সংক্রান্ত আত্ম বিশ্বাস যে অনেক তা তার উদ্ধৃতি থেকেই বোঝ যায়- ইট অলওয়েস সিমস্ ইমপসিবল। আনটিল ইটস ডান। আরেকজন হতে চান ধনী এবং বিখ্যাত। তার প্রিয় উদ্ধৃতি- সবসময়ই রংধনু এবং প্রজাপতি থাকে না, আপোষই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কি ভয়াবহ-জীবনের মানে তবে কি। পশ্চিমা জীবনবোধ এতোই প্রচন্ড। রবীন্দ্রনাথের নেশন এরা বোঝে না। এই উদ্ধৃতি পড়লে আপনারও তাই মনে হবে। যিনি উল্লেখ করেছেন তার জীবনে শুধুই সাফল্য প্রয়োজন। এবং সাফল্যের মূল মন্ত্র হচেছ-টু বি সাকসেস ইউ নিড ফ্রেন্ডস টু বি ভেরি সাকসেস ইউ নিড এনিমি। একবার শুধু এর অন্তর্গত অর্থ ভাবুন। এটা যদি না বোঝেন-তবে এই উদ্ধৃতি যে রবীন্দ্রনাথকে সরাসরিই নাকচ করছে তা বুঝবেন-আমি আমার দাদাকে চিনি না। আমি অনেক বেশি সচেতন তার নাতি কি করবে। এই জাতি তবে তাদের মননে ক্রমশ উন্মুল হয়ে উঠছে।
নিজের জীবনে সাফল্য পেতে চান -বাবা মায়ের মুখ রাখতে চান, এমন অনেক আছেন। তদের একজনেরই প্রিয় উদ্ধৃতি-সিক নট গ্রেট, বাট সিক ট্রুথ এন্ড ইউ উইল ফাইন্ড বোথ। কি দাঁড়ায় সব শেষে। কিছুই না। অন্তত এই জাতির জন্যে কিছুই না। যিনি ভালো মানুষ হয়ে ইঠতে চান, মানুষের সেবা করতে চান। তিনিও কথা বলেন সক্রেটিসের কন্ঠে। নো দাইসেলফ। আমি অনেক পড়েও একটা রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি খুঁজে পাইনি। সেকি এ জন্যেই যে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজীতে লিখেন নি। তাহলেওতো ওনাদের দিয়ে নেশন রক্ষা হবে না।
লিখা বড়ো করার উদ্দেশ্য নেই। যদি কেউ প্রবণতাগুলো ধরতে পারেন তাইলেই যথেষ্ট। একটা প্রজন্ম কোন মানসিকতায় গড়ে উঠছে তাই জানাতে চাইলাম বলে এই পোষ্ট। কিন্তু আশা খুঁজে পাইনি কোথাও। নিজের সংস্কৃতি-কোটি মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। ক্ষুন্নিবৃত্তির জীবনে বাঁধা পড়ে থাকা মানুষগলো থেকে ওরা কতোদূরে। কেউ কবি হতে চায় না-লেখক-চিত্রকর হতে চায় না। কোথাও বর্ষাবসন্ত নেই। পাল তোলা নৌকা নেই। কেবল অর্থ আর প্রতিপত্তিতে মিলেছে সমস্ত চাওয়া। কি তবে তৈরি হবে শেষে। কোন নেশনকে গড়ে তোলার জন্যে এতোবড় আয়োজন। যে ইংরেজী মাধ্যম বাংলা শিখায় না-তাদের স্যালুট করতে বলছেন কেন দেশের এতো বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাক্তিরা। এদের কেউ তো বলেনি গ্রামে ফিরে যেতে চায়। শহরমুখী জাতি কার স্বার্থ রক্ষা করবে।
আয়োজক-অতিথি-অর্থায়ন নিয়ে কিছু বলাটা বাহুল্য হবে। রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই শেষ করি।
আমরা যাহাকে পলিটিক্স বলি তাহার মধ্যেও এই ভাবটা দেখিতে পাই। প্রথমে যাহা সানুনয় প্রসাদভিক্ষা ছিল দ্বিতীয় অবস্থাতে তাহার ঝুলি কমে নাই, কিন্তু তাহার বুলি অন্যরকম হইয়া গেছে-ভিক্ষুকতা যতদূর পর্যন্ত উদ্ধত স্পর্ধার আকার ধারণ করিতে পারে তাহা করিয়াছে। আমাদের আধুনিক আন্দোলনগুলিকে আমরা বিলাতি রাষ্ট্রনৈতিক ক্রিয়াকলাপের অনুরূপ মনে করিয়া উৎসাহবোধ করিতেছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



