২রা আগষ্ট ১৯৯৯, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খুনি ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস। নব্বই পরবর্তী সময়ে দেশের ছাত্র আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য নাম জাহাঙ্গীরনগর। অসংখ্য সংগঠন আর শিক্ষার্থীর মিলিত আন্দোলনের ইতিহাস সেই সময়ে তৈরি হয়েছে। তারই একটি ২রা আগষ্ট। ১৯৯৮ সালে ধর্ষক মানিক বাহিনী আন্দোলনের জোয়ারে কুল না পেয়ে জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে পালায়। তাদের প্রতিপক্ষ খুনি গ্রুপ কয়দিন পর সমস্ত হলের দখল নেয়। কিন্তু তখনও সব জায়গায় আন্দোলনের উত্তাপ আর শিক্ষার্থীদের একচ্ছত্র আনাগোনা, বাধাহীন হল জীবন। কিন্তু হিংস্র শ্বাপদ ফিরে এলো কোন এক রাতের আঁধারে। ধর্ষক গ্রুপ জুলাইয়ের ৩০/৩১ তারিখে বাহিরাগত আর অস্ত্র নিয়ে পাল্টা হল দখল নেয়। ছাত্র হলগুলোর গেইটে গেইটে অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিতে থাকে বহিরাগত সন্ত্রাসী আর ধর্ষকরা। ছাত্রীদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে সেই রাতেই মিছিল হয় প্রত্যেক হলে। পরদিন সকালে সম্মিলিত মিছিল প্রশাসনিক ভবনে সমস্ত ধর্ষক-সন্ত্রাসী এবং খুনীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের দাবী করে। রাতে প্রশাসন নামকাওয়াস্তে পুলিশ দিয়ে হল তল্লাশি চালায়। ছেলেদের হলগুলো তখন অস্ত্রের মজুদাগার। আর পুলিশ বোধহয় খুঁজে পেল দুইটা পিস্তল। ব্যাস প্রশাসন আবার চুপ।
কিন্তু লাঞ্চিতের যন্ত্রণা বাধ না মানার। যারা একদিন সমস্বরে চিৎকার করে নিজেদের ধর্ষিতা দাবী করেছিল তারাই আবার কন্ঠ মেলালো-খুনি
ধর্ষকদের ক্যাম্পাস ছাড়া করার প্রতিজ্ঞায়। পরদিন অর্থাৎ ২আগষ্ট আবারো প্রশাসনিক ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়। এমনিতেই ছাত্র হলগুলো বেশিরভাগ সময় তালাবদ্ধ থাকায়। এবং সন্ত্রাসীদের দ্বারা ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্ররা নানা মাত্রায় নির্যাতিত ও হল ছাড়া হওয়ার কারণে পুরো আন্দোলনেই ছাত্রীদের উপস্থিতিই ছিল প্রধাণ। কেবল মাত্র অংশ গ্রহণেই নয় নেতৃত্ব প্রদান ও আন্দোলনকে সংগঠিত করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন জারি রাখার বিষয়েও তাদের সেই সময়কার কর্মকান্ড স্মরণীয়। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন এবং সম্মিলিতভাবে জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সেই আন্দোলনে অংশ নেয়। আটানব্বইয়ের ধর্ষণ বিরোধী প্রথম আন্দোলনে রাতভর প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও-দিনভর মিছিল মিটিং সমস্ত কিছুতেই অসংখ্য শিক্ষক সহযোগীতা করেছেন। যদিও অনেক শিক্ষকই বিরোধীথা করেছিলেন। তবে সেই সমস্ত আন্দোলনে যাদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয় তারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বাসবাসরত ডাইনিং কর্মচারী-রিকশাওয়ালা এবং নানা পেশার নিম্নবিত্তের মানুষেরা।
সেই সময়ের আন্দোলনে হলে থাকতে না পারা ছাত্রদের অনেকেই রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নীচে-পাশের গ্রামে। ছাত্রীরা অস্বীকার করেছেন বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরিবারের আহ্বানকে। আন্দোলনে খিমন নির্দ্বিধায় তারা সকলেঈ নিজেদের ধর্ষিতা বলেছিলেন। সেই তাদের হারানোর কিছূ ছিলো না। দিনভর গোটা ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে মিছিল, রাতে হলে মিছিল, যারা আন্দোলনে আসছিল না তাদের বোঝানো। সবই করেছে তারা। কোন এক নতুন দিনে ডাক শুনতে পেয়েছিল বোধ হয়। আর নিশ্চিতভাবেই গুমরে ওঠা ধর্ষিতা বোনের কান্না তাদের নিরুপায় করে তুলেছিল।
২আগষ্ট ১৯৯৯। এই দিন ছাত্রীদের হল থেকে কয়েকশ জনের মিছিল সুপারিতলায় ছাত্রদরে সঙ্গে যুক্ত হয়। আমাদের ক্যাম্পসে ধর্ষক-খুনীদের ঠাঁই নাই, আমি আর ধর্ষক এক ক্যাম্পসে থাকবো না, এক সনদ নিবো না। এমন অনেক স্লোগান ছিল। সম্মিলিত মিছিল প্রশাসনিকভবন ঘেরাও করে থাকলেও উপাচার্য বা অন্য কোন দায়িত্বশীল শিক্ষক সেই মিছিলে কর্ণপাত করলেন না। দুপুরের দিকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই মিছিল ধর্ষকদের দখল করে রাখা ছাত্র হলের দিকে যায়। সেই সময়ে হলগুলোতে খুনি-ধর্ষকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ তৈরি হয়। তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে অস্ত্র তাক করে অবস্থান নেয়। দুই একটা বোমা ফাটায়। কিন্তু সেই মিছিলে অসংখ্য নারী কন্ঠের বজ্র নিনাদ-পুরুষ কন্ঠের সম্মিলন এক দুর্দমনীয় জোয়ার তৈরি করে। যে জোয়ার ইতিহাস বাহিত, হাজারো ধর্ষিতার অপমানের যন্ত্রণার প্রতিশোধের আস্থিরতায় সে অবাধ্য। বোমা গুলির প্রস্তুতি কিছুই টিকলো না সেই অভূতপূর্ব জোয়ারের ধাক্কায়। সেই সময়ে খুনী-ধর্ষকরা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই আগে থেকে কেটে রাখা পিছনের জানালার গ্রিলের ফাঁক গলে লাফিয়ে ঝাপিয়ে পালায়। কেউ প্যান্ট পড়া, কেউ আবার শুধু হাতে লুঙ্গি নিয়ে।
এই আন্দোলনের নানামুখী তাৎপর্য আছে। সেই আলোচনার ভার সকলের। কেবল কখনো ধর্ষিতার জ্বালা বুকে এলে মনে পড়ে দিনটির কথা। কেন তবে এমন একটা দিনের জোয়ার আবার ফিরে আসে না আমাদের সমকালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে সংক্ষেপে জানবিবি ডাকে অনেকেই। এই জানবিবি যেন আমাদের নিপীড়িত নারীমূর্তি যার আকাশে ক্ষোভের লাল কৃষ্ণচূড়া জ্বলজ্বল করে।
[২আগষ্টসহ বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনরে ছবি]
এ বছরের আয়োজন
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০০৯ রাত ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



