আমাদের স্কুল বিল্ডিংয়ের রঙ ছিল হলুদ। এটা আমরা শুরুতেই রঙের অর্থে খেয়াল করিনি। বরং আমরা বোধহয় রঙটাকেই স্কুল ভাবতাম। অথচ জীবনের যে সময়ে আমরা সেই স্কুলে ভর্তী হই তখন আমাদের রঙ পরিচয়ও ঘটেনি। প্রথমত অর পরিচয়ের উদ্দেশ্যে আমরা সেই স্কুলে যাই। এবং এই অক্ষর পরিচয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি আমাদের কাসরুমের কড়িবরগায়, দেয়ালে লেপ্টে থাকা রঙের নাম হলুদ। হলুদ কেন, অন্য রঙ নয় কেন এই ভাবনা আমাদের ছিল না। হয়তো ভাবতাম স্কুল মানেই হলুদ হবে। অন্য কোন স্কুল যখন অন্য রঙের দেখতাম, বুঝতাম এটা আমাদের স্কুল নয়। আর কি অদ্ভূত, হলুদ রঙের দ্বিতীয় কোন স্কুল আমাদের চোখে পড়েনি। অথবা হলুদ রঙের অন্য কোন ভবন থাকলেও সেখানে কাসরুম থাকতো না। ফলে আমরা বলে বেড়াতাম আমাদের স্কুলের নাম হলুদ রঙের স্কুল। সেই স্কুলের জানলা দরজার রঙ নীল এবং ক্লাস চলাকালীন সময়ে ওই জানলা দিয়ে আমাদের পাড়ায় প্রবেশের রাস্তাটা দেখা যায়। সেই রাস্তায় ফেরি করে ছড়া কাটা ফেরিওয়ালার বরিশালের আমড়া ধরি ধরি কামড়া আমাদের কানে গুঞ্জন তোলে। আমরা ক্লাসরুমের পড়া খেয়াল করি না। সাজেদা আপার ধর্ম কথা আমাদের ভেতরে বরিশালের আমড়া হয়ে নাচানাচি করে। সেই আমড়ার রঙ সবুজ, কিন্তু হলুদ রঙের আমড়াও আছে। পেকে গেলে সেই আমড়া নাকি হলুদ হয়ে যায়। এমন একটা মিল খুঁজে পেয়ে যার পর নাই বিস্মিত হই। এই বিস্ময়ের ঘোর চোখে মেখে আমরা বাসায় যাই। আমাদের হলুদ রঙের স্কুল ছেড়ে যেতে খুব খারাপ লাগতো প্রতিদিন। বাসায় যেতাম ঘুর পথে। হলুদ রঙ খুঁজতাম। একদিন আরেকটা হলুদ পেলাম। আমাদের ভয় ঢুকে গেল। স্কুলে যাওয়াও আমরা বন্ধ করে দিবো এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছিলাম। হলুদের এতো বিচিত্র স্বভাব আমাদের কিশোর মনে নানা আলোড়ন তোলে সেই সময়ে। একটা হতবিহ্বলতার মধ্যে পড়ে যাই যখন বুঝতে পারি হলুদ একটা রোগের নাম। এই রোগকে সবাই জন্ডিস বলে। এই রোগ আসলে শরীরে মৃত্যু হয়ে বাস করে। লাল রক্ত নাকি তখন হলুদ হতে থাকে, মুততে গেলেও হলুদ রঙ বের হয়। চোখ হয়ে যায় হলুদ হলুদ, নখের নিচে হলুদ জমে। সব খাবারেই গন্ধ লাগে। খাবার মুখে দিলেই বমি আসে। শরীর তখন খুব কান্ত লাগে। আমাদের বন্ধুর বাবার শীর্ণ শরীরে বিকট হলুদের প্রবেশ দেখে আমরা ভীত হই। আমরা সন্দেহ করি, আসলে মনে হয় আমাদের স্কুলেরও জন্ডিস হয়েছে, তাই সে হলুদ।
তারপরও আমাদের হলুদ স্কুল ঘিরেই আমরা বড়ো হতে থাকি। এবং এই হলুদ আমাদের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার সম্মুখিন করে। আমরা যখন আমাদের বন্ধুর বাবাকে আরেকদিন দেখতে যাই তখন আসলে আমাদের সাথে দেখা হয় এক কবিরাজের। তার মাথার জটায় আমরা চুল খুঁজে পাই না। আমাদের মনে হতে থাকে তার মাথায় বুঝি জটাই গজায়। যা আসলে দড়ি, চুলের দড়ি। সেই জটাগুলো তার ঘাড়ে মুখে এলোমেলো ঝুলে থাকে। কালো য়ে যাওয়া দাঁতের ভেতর সাপের মতো তীক্ষ্ণ জিহ্বা। হাগতে বসেছে এমন ভঙ্গিতে সে একটা বাটি সামনে নিয়ে ঝুঁকে থাকে। সেই বাটিতে কি যেন একটা তরল। খাটে শুয়ে থাকা বন্ধুর বাবার একটা হাত বাইরে ঝুলে আছে। ঘরের ভেতর কেমন আবছায়া অন্ধকার। ফিলিপস বাতিটার আলো এতো কম কেন। কবিরাজের হাঁটু পর্যন্ত উদিলা। আমড়া গেঁথে রাখে যে কাঠিগুলোতে বা আইসক্রিম, তার হাঁটু দেখে আমাদের সেই কাঠির কথা মনে পড়ে। অথচ সে কেমন খরখরে গলায় কথা বলে যায়। আমরা বুঝতে পারি শুকনা পাছার কাউয়ার আসমান ভরা ডাক আসলে কেমন হতে পারে। সে ওই ছোট্ট বাটি থেকে তরলটুকু উঠিয়ে নিয়ে বন্ধুর বাবার হাতে ঘষে। তারপর সেই হাত এরপর পানি দিয়ে ধোয়। হাতের নিচে গামলায় হলুদ হলুদ তরল জমা হয়। হঠাৎ হঠাৎ খেঁকিয়ে ওঠে কবিরাজ, যা বারা, হলুদ রঙ ধুয়ে মুছে যা। আবার বিড় বিড় বিড় বিড় । আবারো হঠাৎ খ্যান খ্যানে গলা যা বারা হাছুলু, আবারো বিড় বিড়। আমরা ভয় পাই। ঘরটায় আলো কম কেন আমরা বুঝতে পারি। ধুপ জ্বালানো হয়েছে, ধোঁয়ায় ভরে আছে চারপাশ। সেই ধোঁয়ার আড়াল থেকে তার লাল জাগা খুনে চোখ আমাদের দিকে তাকায়। আমাদের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তার চোখ দুটো আসলে ফুটন্ত তেলের কড়াই, সেখানে আমাদর নরোম কচি মনগুলোকে সে ভেজে খেতে চায় যেন। আমরা দৌড়ে চলে আসি, একবারে বাসা পর্যন্ত। কিন্তু সেই ছ্যাঁৎ শব্দ ঠিকই শুনতে পাই। পরদিন স্কুলে আসি না আমরা অনেকেই। কারণ স্কুল নয় বাসা-ই আসলে আমাদের জন্য নিরাপদ। সেদিন বাসায় বসে বসে ভাবি, আমরা আসলে স্কুল থেকে কি শিখি জানি না। কিন্তু হলুদ রঙকে কেন্দ্র করে আমরা অনেক কিছুই শিখছি।
আমাদের স্কুলের পেছনে এক হিন্দু সামন্তের বাড়ি। দীর্ঘদিন তার শাদা রঙের দোতলা প্রাসাদটি খালি ছিল। পরে আমাদের হেডমাষ্টার সেখানে নিবাস গড়ে। তার কাশফুলের মতো দাড়িগুলোয় লাল রঙ। ফলে আমাদের তাকে ভালো লাগে না। দাড়িতে যদি হলুদ রঙ থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের পছন্দ হতো। তাকে না হলেও তার গাছের তেঁতুল আর করা করা জলপাই আমাদের খুব পছন্দ হতো। যেদিন আগে ক্লাস শেষ হয়ে যেতো অথবা আমরা যেদিন দল বেঁধে কাস ফাঁকি দিতাম সেদিন আমাদের সময় কাটতো তার তেঁতুল অথবা জলপাই গাছের ডালে ডালে। এই কাস ফাঁকি দিলে আমাদের ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকতো। কারণ চারুকারু নামের উদ্ভট এক কাসে গান কবিতা কিছুই জানতে না পারার কারণে আমাদের কেউ পাত্তা দিত না। আমরাও এটা উপভোগ করতাম। চারু এবং কারু কি জিনিস তা বুঝতে না পারলেও তেঁতুল আর জলপাই যে খুব চুকা এবং অতিরিক্ত ভক্ষণে পেট ব্যাথা করে এটা আমরা জানতাম বেশ ভালো করেই। ফলে বেদখল তেঁতুল গাছের ডালে বসে আমরা হাছুলুর রাজ্য কল্পনা করতাম। হাছুলু নাকি হলুদ রঙের দেবতা। এটা আমাদের কেউ বলে নি। আমাদের মনে হয়েছে। সে দিনের পরে ওই কবিরাজের সাথেও আমাদের দেখা হয়নি। বন্ধুর বাবা মারা যাওয়ার পরে আমরা জন্ডিস সম্পর্কেও ভীতিকর কৌতুহল এড়িয়ে চলি। কিন্তু হাছুলু কি করে যেন আমাদের সাথে সাথে গল্প কথায় তেঁতুল গাছে এসে হাজির হয়। বার কয়েক হাছুলু বলতে বলতে সেই কবিরাজ জটা কাঁপিয়ে মাথা দাপিয়ে ইলিবিলি গিলিগিলি বোম এমনভাবে বলেছিল যে আমরাও জায়গায় দাঁগিয়ে ঝাঁকি খেয়েছিলাম। ফলে হাছুলু নামটা আমাদের মাথায় ঢুকে গিয়েছিল। তাই ধরে নিয়েছিলাম হয়তো হলুদ রঙের দেবতা এই হাছুলু। একদিন হাছুলু সম্পর্কে কথা বলতে বলতে কখন শেষ সন্ধ্যার আলোয় ছম ছম অন্ধকার তেঁতুলের ঝিরি ঝিরি পাতায় এসে জমা হয় আমরা বুঝতে পারি না। কারণ কখন যেন হাছুলু সম্পর্কে কথা বলতে বলতে আমাদের চোখে কেবল তার হলুদাভ অবয়ব ভাসতে থাকে, আমরা নিথর বাতাসে নিরব হয়ে বসে থাকি। তখন আমাদের মনেই হয় না বাসায় ফেরার কথা। হঠাৎ একটা শন শন বাতাসে আমাদের ঠান্ডা লাগতে শুরু করে, তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে ওঠে কি যেন একটা পাখি, অনেকগুলো কাকের ডাক আমাদের আতংকিত করে তোলে। আমরা লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে তেঁতুল গাছ থেকে নেমে পড়ি। যাদের ব্যাগ খোলা ছিল তাদের কেউ কেউ কলম স্কেল কম্পাস হারিয়ে ফেলে। এক দৌড়ে বাসায় গিয়েও আমাদের আতংক কাটে না। ঠিক কি জন্যে অথবা কোন স্বর কিংবা দৃশ্য আমাদের ভয়ের কারণ ছিল আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু সেদিন রাতের ঘুমে আমরা সবাই হাছুলুকে স্বপ্নে দেখি।
পরদিন কে কে স্কুলে আসে আমাদের মনেই থাকে না। আসলে আমাদের স্কুলকেই আর মনে পড়ে না। আমরা একত্রিত হতে অথবা আমাদের অভ্যাসবশত স্কুলে যাই। আর আমরা আমাদের দেখা স্বপ্ন মিলিয়ে মিলিয়ে হাছুলুকে তৈরির চেষ্টা করি। যে স্বপ্নে হাছুলুকে আসলে ওই কবিরাজের মতোই দেখেছে তাকে আমাদের বিশ্বাস হয় না। যে বলে সে বন্ধুর মরা বাবাকেই দেখেছে হাছুলু হয়ে যেতে, মরে গিয়ে তিনি-ই আসলে হাছুলু হয়ে গেছেন, তাকেও আমরা সন্দেহ করি। একজন বলে হাছুলু আসলে স্ফিংক্স এর মতো দেখতে, আমরা তার ফোলা ফোলা চোপার দিকে তাকাই। যে বলে হাছুলু হচ্ছে আসলে সারা গায়ে হলুদ রংওয়ালা একটা ষাঁড় আমরা তাকে দূর দূর করি। আমাদের মনে পড়ে সে একবার কোরবানির হাটে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। অবশেষে কিছুই মেলাতে না পেরে হাসতে হাসতে গড়াগাড়ি খাই। স্কুলের মাঠে শুয়ে আমাদের চোখে পড়ে শরতের নীল শাদা আকাশ। হঠাৎ দম ফাটানো হাসি হাসতে হাসতে একজন বলে হাছুলু আসলে ইষের মতো। কারণ সমস্ত অদেখা, অদৃষ্ট এবং অভাবিত বিষয়-ই ইষের মতো। এই ইষ আসলে চাষের যন্ত্র, যার রুপালি ফলার তীক্ষ্ণ ছেদনে কর্ষিত মাটি বীজ বপন এবং অবশেষে ফলনের উপযোগী হয়। আমাদের মানো জমিনে এই ইষ কতো জানা অজানা ফসলের চাষ করে যায়। তখনই আমাদের মনে হয় ফলনের গায়ে হলুদ রঙ আসলে রোগের লক্ষণ। তার মানে হলুদ একটা রোগ। হাছুলু হলো এই রোগের দেবতা। যার কৃপায় কবিরাজ মানুষ ভালো করে। আমাদের স্কুলকেও কি রোগে ধরেছে। নাকি আসলে স্কুল পেকে গেছে বলেই সে হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। পেকে যাওয়া মানেওতো আসলে শেষ অবস্থা, অথবা অবস্থান্তরের কাল।
আমাদের এক বন্ধু হঠাৎ একদিন খবর দেয় যে সে সেই কবিরাজকে দেখেছে। আমরা অবাক হয়ে তাকে ঘিরে ধরি। সে খানিকটা উত্তেজিত এবং কথা বলার তাড়নায় শব্দ অর বাক্য গুলিয়ে ফেলে, ঘটনার সময়কাল গুলিয়ে ফেলে। তার কথা শুনতে শুনতেই আমাদের মনে হয় ঘটনার বর্ণনার জন্য আসলে কাল-বচন-বাক্য গঠন পড়বার দরকার হয় না, ব্যক্তি এবং ঘটনা ভেদে তা এতোই বিচিত্র এবং তাৎপর্যপূর্ণ হয় যে ঘটনার বিবরণ কখনোই ব্যাকরণে বাধা থাকে না। তা বরংচ মুখাবয়বের অভিব্যাক্তি, শ্রোতাদের মনোযোগ এবং বক্তার উপস্থাপনের ভঙ্গির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। ব্যাকরণ কখনোই ঘটনার সত্য মিথ্যা নির্ধারণ করতে পারে না। বক্তা এবং শ্রোতারাই ঘটনার সত্য মিথ্যা নির্ধারণ করে। অবশ্য এসব নিয়ে ভাবার অবকাশও আমাদের নেই। হাছুলুকে খুঁজে বের করবার জন্য যে আমাদের কবিরাজকেই প্রয়োজন এটা আমরা জানি। আমাদের সেই বন্ধু কবিরাজকে দেখতে পেয়েছে, আমাদের এতোদিনের জল্পনার একটা সমাধান বোধহয় হলো। বন্ধু কি যেন এক কাজে শহরের বাসষ্ট্যান্ডে গিয়েছিল। সেখানেই সে আমাদের পার্শ্ববর্তী থানাগামী বাসে তাকে উঠতে দেখে। কবিরাজকে উঠিয়ে দিতে একজন লোক ও এসেছিল। কবিরাজের কোমরে একটা লালসালু ঝোলানো, পৈতার মতো করে ঘাড় হতে লালসালু জড়ানো, মাথায় খালি একটা হলুদ পট্টি বাঁধা। আমাদের বন্ধুর চিনে নিতে মোটেও দেরি হয়নি। কিন্তু ততক্ষণে বাস ছেড়ে চলে যায়। বন্ধু বাসে উঠিয়ে দিতে আসা লোকটাকে জিজ্ঞেস করে কোথায় থাকে এই কবিরাজ। লোকটা নাকি বলে, এখান থেকে বাসে উঠে আমাদের পাশ্ববর্তী থানার বাসষ্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে আরেক বাসে করে মশলার বাজারে যেতে হবে। সেই বাজারে খালি মশলা বিক্রি হয়, হলুদও নাকি পাওয়া যায় অনেক সস্তায়। সেই বাজার থেকে রিকশায় বা পায়ে হেঁটে হলুদিয়া গ্রাম। বা আসলে হয়তো এই গ্রামের নাম হালদিয়া কিন্তু আমাদের বন্ধু সেই গ্রামকে হলুদিয়া নামেই উল্লেখ করে। গ্রামের নাম উল্লেখে আমাদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তাহলে হয়তো ওই গ্রামেই হাছুলু থাকে বা থাকতো। কবিরাজ নিশ্চিত জানে সেটা। আর নইলে এটুকুতো সে বলতে পারবে যে হাছুলু আসলে কেউ না বা কিছুই না। হাছুলু আসলে কেবলই খেয়ালি চিন্তা।
ফলে আমরা কবিরাজের সাথে দেখা করবার সিদ্ধান্ত নেই। আমাদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। হাছুলু আসলেই কি দৃশ্যমান কোন বিষয়। অথবা হাছুলু খুব ভয়ানক কিছু। দেখা মাত্রই আমাদের খেয়ে ফেলবে-মেরে ফেলবে। কিন্তু আমাদের কৌতুহল ভীষণ হয়ে ওঠে। কৌতুহল আসলে বেয়াড়া কেউ, তাকে দেখা যায় না কিন্তু টের পাওয়া যায়। আমাদের নীলচে অথবা লালচে বইয়ের পাতায় কৌতুহল থাকে না, সে কোথায় যেনো থাকে, আমাদের ভেতরেই হয়তো। কিন্তু সে থাকেই, এবং নিরন্তর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমরাও আসলে কৌতুহলের সুতোয় বাধা ঘুড়ি, উড়ে বেড়ায় আমাদের মন। কিন্তু আমরা আসলে মনে মনেই উড়তে পারি কেবল। আমাদের হলুদ রঙের স্কুল এবং রঙ বেরঙের বাসাগুলো আমাদের সীমানাকে গন্ডীবদ্ধ করে ফেলেছে। ফলে আমরা কবিরাজের বাড়ি যাবার বিষয়ে গভীর সংকটে পড়ি। আমাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে আমরা বাসা থেকেই বের হতে পারি না। আবার স্কুল শুরু হয়ে গেলে ক্লাসরুমেই আটকা পড়ি। দিন দিন একটা বিমর্ষতা আমাদের ঘিরে ধরতে থাকে শীতের কুয়াশার মতো। ফিকে হয়ে আসে হাছুলু সংক্রান্ত ভাবনা। কিছুতেই আমরা সুযোগ বের করতে পারি না। সেই কবিরাজকেও আমরা আর দেখতে পাই না। শাদা কাশফুলের দাড়িওয়ালা হেডমাষ্টার তার বাগানে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেয়। আমরা নিজেদের কোন জায়গা খুঁজে পাই না। আমাদের বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং বিষয়বস্তু ক্রমশ জটিল হয়। বইয়ে ছাপানো অক্ষরগুলোকে আর নিরীহ মনে হয় না আমাদের। বইয়ের কালো কালো অক্ষর-শব্দ-বর্ণ-বাক্য আসলে জোড়া দেয়া শেকল। চারকোনা বইয়ের সীমানা ছাড়িয়ে সেই শেকল আমাদের হাতে পায়ে পেঁচিয়ে ধরে। আমরা আসলে কবন্ধ। কারণ ঘাড়ের ওপর যা আছে সেখানে কেবলই কালি কাগজের খসখসানি, শুকনো। আমরা বই ঘষা চোখে আমাদের বন্ধুদের দিকে তাকাই। আঁৎকে উঠি। সবার ঘাড়ের ওপর কাগজের ঠোঙা, ফাঁপা। আমাদের হাতে পায়ে কালো কালো শব্দশেকল। কোথাও যেতে গেলেই টান পড়ে। আমাদের জন্য বইয়ের অক্ষরগুলো সীমানার শেকল হয়ে ওঠে। হাছুলুকে দেখতে পাবার বাসনা বার বার সেই সীমানায় গিয়ে ফিরে এসেছে। আমরা বুঝতে পারি হলুদ রঙের স্কুলে আটকা পড়া আমাদের কল্পনাগুলো আসলে কেবলই শরতের পেঁজা তুলো আকাশ। স্পর্শহীন।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



