somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন লিপির মা'র অনিঃশেষ গল্প

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেষ বিকালের আলোর ছটায় নিজের লম্বা ছায়ার দিকে তাকিয়ে শুভ্র নীলাকে নিয়ে শুভ্রনীলা অথবা নীলশুভ্রা বিষয়ক চর্চায় আত্মমগ্ন হয়ে ছিল। তার সামনের কাগজ কলমগুলোতে সাজানোর চেষ্টা চলছিল নীলা অথবা শুভ্রার জন্য খানিক পংক্তিমালা। এমনি সময়েই তার পাশের লম্বা রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়া লিপির মা তার চিন্তার সূত্র ছিড়ে দিলো। লিপির মাকে খুব ভালোভাবে তাকিয়ে দেখতে থাকে সে। নোংরা শরীর আর ছিন্নবস্ত্রের লিপির মা কিংবা তার কোলের ছোট বাচ্চাটির কান্না তাকে বেশি রকম আন্দোলিত করে - আরো পরিস্কার করে বললে লিপির মা মুখ নিঃসৃত তীব্র বাক্যবাণ কিংবা সেই বাণের মাঝেকার তীব্র কর্কশ অথচ করুণ হাহাকার তার কান চাপিয়ে মাথায় আঘাত করে চলে অবিরত। সে নির্লিপ্ত মুখ নিয়ে তাকিয়ে ঠাকে লিপির মায়ের চলার পথের দিকে। লম্বা রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে বায়ে মোড় নিয়ে জরাজীর্ণ বাড়িতে লিপির মা অদৃশ্য হয়ে গেলেও শুভ্রের আপাত অলস মস্তিষ্কে সে আঘাত করে চলে ক্রমাগত।

লিপির মায়ের আসল নাম কী? নিজেকে প্রশ্ন করে চলে শুভ্র। অনেক চেষ্টাতেও সে মনে করতে পারে না। পারবার কথাও না, মাত্র একবার তাও বহুকাল আগে শোনা কোন বিস্মৃত নাম।যে দেশের শিক্ষিতা অনেক মহিলাই বিয়ের পর স্বামীর নামের করাল গ্রাসে নিজের নাম হারিয়ে ফেলে সে দেশে লিপির মায়ের আসল নাম হারিয়ে যাওয়াতে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। লিপির মায়ের নাম মনে না করতে পারলেও তার প্রথম আগমনের দিনটি খুব পরিষ্কার হয়ে ভেসে উঠে শুভ্রের সামনে। অড্ভুত ভাবে কথা বলার জন্যই সেদিনটি মনে আছে শুভ্রের। তার অদ্ভুত কথা বলার ভঙ্গি আর তার মাঝেকার শিশুসুলভ সারল্য তাকে নতুন নামে পরিচয় করিয়ে দিল। তার নাম হয়ে গেল "বেক্কল বুয়া"। এবং খুব অদ্ভুতভাবেই শুভ্র লক্ষ্য করলো এই নামটি সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে গেলো সবার মাঝে। বেক্কল বুয়া কিংবা বেক্কলনী নামটাই টিকে গেলো।

লিপির মায়ের পিছনকার কোন গল্প জানা হয়নি শুভ্রের অথবা সে কখনো আগ্রহ বোধ করেনি সেই গল্পগুলোকে নিয়ে। সেই গল্প গুলো তার কাছে আসতে পারেনি স্বতঃস্ফুর্ত প্রবাহ হয়ে। বয়স অথবা বোধের অপরিপক্কতা অথবা অপ্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলোর প্রতি এক ধরণের উদাসীনতা কিংবা দুটোরই প্রভাব। লিপির মাকে সে দেখতো বস্তি থেকে হেঁটে আসতে প্রতিদিন। লিপির মাকে দেখত সে প্রতিদিন ক্রমাগত যন্ত্রচালিতের ন্যায় কাজ করে যেতে। হয়তো লিপির মায়ের কোন খোঁজই তার কাছে বড় হয়ে উঠত না যদি না তার ছোট বোনটি একদিন হৈ চৈ জুড়ে না দিত। বলতে গেলে বড় সড় গোলমাল পেকে যায়। চিরকালের নির্লিপ্ত শুভ্র সেদিকে কান দেবার বিশেষ আগ্রহ বোধ করে না। কিন্তু চিৎকারটা যখন তার বোন অথবা লিপির মাকে ছাপিয়ে তার মা আর দাদীর মাঝেকার হৈ চৈ হয়ে যায় সে কৌতুহলী হয়ে উঠে। দরজার ফাঁকে মাথা গলিয়ে ঘটনার বিবরণ শুনতে গিয়েই ধাক্কা খায়। লিপির মা খাবার চুরি করে খেয়েছে। আর তার মা নাকি সেটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছেন -- এহেন বিলাসিতা দাদীর সহ্য হয়নি। হৈ চৈ ক্রমাগত চলছে। এক সময় থামলো ঝগড়া লিপির মাকে বিদায় দেবার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।

চিরকালের মা ন্যাটা শুভ্র মায়ের চেহারার দিকে খানিকটা তাকায়। এক ধরণের বিষণ্ণতা দেখতে পায় সে চেহারায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মায়ের চোখপানে চায়। তারপরে হ্যা তারপরে তার মায়ের মুখে শুনেই তার পরিচয় হয় অন্য এক জগতের সাথে। সে শুনে যায় লিপির মা কিংবা বেক্কলনীর সংগ্রামের গল্প। গ্রাম হতে হঠাৎ করেই আসা এই পরিবারটির গল্প তাদের সুখ দুঃখের গল্প-- যে জগত শুভ্রের কাছে বড়ই নোংরা বড়ই বিরক্তিকর সে জগতের মাজেকার কমনীয়তাগুলোকে মানবিকতাগুলোকে সে আবিষ্কার করতে থাকে। তার মা বলে চলেন অদ্ভুত সব কথা। তার কিছু কথাগুলো বিঁধে যায় একেবারে শুভ্রের মনে। " মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সম্মান। কিন্তু অভাবের করাল গ্রাস সে হলো বাস্তব-- তার ছোবলেই লিপির মায়েরা নিজেদের সম্মানটুকু বেঁচে দুঃখের সাথে সংগ্রাম করে।" শুভ্রর কাছে লিপির মা উপস্থিত হন এক কঠোর সংগ্রামী অথবা গভীর মমতাময়ী মা হিসেবে। অসুস্থ স্বামীর আর ছোট চার ছেলে মেয়ের অসহায় মুখের দিকে চেয়ে তিনি আর তার বড় মেয়ে খেটে চলেন। কিন্তু --- তাদের অভাবের তুলনায় তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পারিশ্রমিকও অপ্রতুল। মা বলতে থাকেন, তুই হয়তো দেখিস না, "লিপির মাকে যে খাবার প্রথমদিকে দিতাম তার কিছুই নিজে খেত না। তার ছেলেমেয়েদের জন্য বোধ করি নিয়ে যেত। এখন বাড়িয়ে দিছি, তারপরে সে একটু খায় বাকিটা নিয়ে যায়। সে একটু খাওয়াতে ওর হয় না কিন্তু আমি ও তো তাকে সেই পরিমাণ খাবার দিতে দিতে পারি না। তার নির্ঘুম লাল চোখ আর কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে ছোট্ট ঝিমুনি দেখলে কষ্ট লাগেরে বড়। "

হঠাৎ করেই জীবন সংগ্রামী লিপির মায়ের প্রতি ভক্তি এসেছিল। কিন্তু সে যেন শুধু কোন দুর্বল মূহুর্তের দুঃখবিলাসি মনের বিলাস দুঃখ হয়ে। লিপির মায়ের সংগ্রামের জীবনটাকে সে দেখেনি। কিন্তু সে মাঝে মাঝে মনে করত এই মহিলাকে প্রতারক। নিজের মাঝে অভাবের লেবাস লাগিয়ে তার মায়ের মাথা ভাঙিয়ে খাচ্ছে। আবারপরমূহুর্তে সে অনুশোচনায় দগ্ধ হতো একজন সংগ্রামীর প্রতি অশ্রদ্ধার অপরাধে। কিন্তু কখনো সে লিপির মাকে সামনে থেকে দেখতে পারেনি যেভাবে দেখলে মানুষকে বোঝা যায়। তাই লিপির মায়ের প্রতি তার ধারণা রয়ে গেছে খুব সম্ভবত পরস্পর বিরোধী কিছু দোষ গুণের অদ্ভুত মিশ্রণে । কখনো তা শুধুই করুণা কখনো শানুভূতি কখনো রাগ কখনো ঘৃণা এমনি নানা অদ্ভুত অনুভূতিগুলো জমা হতো তার মাজে লিপির মায়ের স্মরণে। সেই লিপির মা কাজ ছেড়েছে অনেকদিন আগে। তারপরে হ্যা তারপরেও সে আসত। সে আসত তার চির অভাবী চেহারা নিয়ে। তার মায়ের কাছে বসত। গল্প করতো তার মায়ের সাথে, সেসবের কোনটাই যে সুখের না বেশ বুঝতে পারতো। তারপরে ছোটখাটো কাজের বিনিময়ে তার মায়ের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতো। তখনকার তার চোখটিকে শুভ্রের কাছে লোভী মনে হতো। আর তার বোনের কাছে খাবার চুরির গল্প শুনে তাকে পেটুক মনে হতো। কিংবা তার মায়ের কাছে লিপির মায়ের গল্প বলা আন্টিদের খানিক বর্ণনায় মহিলাটিকে ক্রিমিনাল মনে হতো। সেই সাথে তার মাকে মনে হতো সবচেয়ে বোকা মা। আবার পরক্ষণে ই সেই মহিলাটিকে একজন কষ্টে ন্যুব্জ মায়াবতী মনে হতো।

খুব সামনে থেকে বেক্কলনীকে দেখেছে একবছর হয়ে গেল প্রায়। তার মা মারা যাবার পর সে আর আসে না। শুভ্র তাকে দেখতে পায় শুধু সেই চিরঅপরিচিত রূপে। বস্তি হতে ড্রেনের পাশ দিয়ে আসা সরু রাস্তার উপর দিয়ে দুঃখ বয়ে বেড়ানো এক মহিমাময়ী মানবীরূপে কিংবা নিজের কষ্ট আর অসম্মান দিয়ে সন্তানের সুখ কেনা এক মমতাময়ী মা রূপে।

তার চোখের সামনের সরু পথটি অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। ক্রিং ক্রিং করে তার ফোন বাজছে-- সম্ভবত নীলার। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে বাতিটা জ্বেলে দেয়। তীব্র আলোতে ভরে উঠা রুমে আয়নাতে একবার নিজের দিকে তাকায় আরেকবার দূরের জরাজীর্ণ বস্তি পল্লীর দিকে তাকায়। বস্তির আঁধারে ডুবে থাকা লিপির মা'দেরকে তার কাছে আগের চেয়ে রহ্স্য ময় মনে হয়।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১:৪৯
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×