ঢাকায় বড় হয়েছি।স্কুল, কলেজ সবই ঢাকায়। তাই ইউনিভার্সিটিটা যখন হলো ঢাকার বাইরে, তখন তো খারাপ লাগবেই। বিশাল ফ্রেন্ড সার্কেল, বাবা-মা-বোন সব ছেড়ে কিনা যেতে হবে অন্য একটা শহরে?।ভর্তি পরীক্ষার সময় দুইদিনের জন্য সিলেট শহরটা ঘুরে ভালোই লেগেছে। পাহাড় টাহাড় আছে।তাই বলে চার বছর! কেন যে ঢাকায় কোথাও ভর্তি হলাম না ।কি আর করা-‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’ জ্ঞানী গুনীরা তো আর এমনি এমনি বলে যান নি।আমি জ্ঞানীও না, গুনীও না। ছোট বেলা থেকেই গবেট টাইপ। আমিতো ভুল করবই।তাই ভুলের মাশুল দিতে ওরিয়েন্টশনের আগের দিন বাক্স প্যাটরা, খাতা বালিশ নিয়া ট্রেনে করে রওনা দিলাম সিলেট।
আগে থেকেই মেস ঠিক করা ছিল। একটা মাত্র ছাত্র হল (২০০১ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা মাত্র ছাত্র হল আর অর্ধেকটা ছাত্রী হল ছিলো)।হলে জায়গা হয় না নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রদের। তাই শহরের নানান জায়গায় মেস করে থাকতে হয়।মেস মানে কয়েকজন মিলে একটা বাসা ভাড়া করে থাকা আর কি।খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা নিজেদের। আমার ক্লাশেরই কয়েকজন আমার মেস মেট। আগে একবার দুইবার দু একটা কথা টথা হয়েছে, এটুকুই পরিচয়।একা নতুন শহরে নতুন জায়গায় কিভাবে থাকবো এ নিয়ে একটা ভয় ছিলো, তার ওপর আমি সহজে নতুন কারো সাথে মিশতে পারি না।খুব সুন্দর একটা ওরিয়েন্টশন সব শঙ্কা কাটিয়ে দিল।অদ্ভুত সুন্দর একটা ক্যাম্পাস। সুন্দর মনের এখানকার মানুষ গুলো। র্যাগ বলে একটা জিনিস শুনেছিলাম। সব ক্যাম্পাসেই নাকি নতুনদের এই জিনিসটা দেয়া হয়। স্পেশালি আমার মত গবেটদের জন্য তো সেটা নাকি মাস্ট। কিন্তু সেরকম কিছুই হলো না।মুহম্মদ জাফর ইকবাল, যেই মানুষটার লেখা বইই কেবল পড়েছি, প্রথমবার চোখে দেখলাম।তিনি আমাদের ডিপার্টমেন্টের হেড।এই ছাত্র ছাত্রীরা একদিন কম্পিউটার প্রকৌশলী হবে, তাই ম্যাথ, লজিক টাইপের কিছু মজার অংশ ছিলো ওরিয়েন্টশনে।একটা প্রতিযোগিতা মত হলো, লজিক রিলেটেড।টুকটাক প্রগ্রামিং করতাম, লজিকের সাথে পরিচয় ছিলো, একটা পুরস্কারও জুটে গেল ভাগ্যে। আমিতো মহাখুশি।
রাতে মেসে ফিরে চুলা লাগানোর কথা ছিলো। কিন্তু দেখা গেল আমরা যে চুলা কিনেছি সেটা লাগছে না। আর একটা কিনতে হবে? আমাদের মেস মেটদের একজন ছিলো মহা কিপটা।তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি। সে বললো আর একটা চুলা কিনবো কেন শুধু শুধু, তার চেয়ে কয়েকদিন পর মেসটাই বদলে ফেলবো! ততদিন না হয় হোটেলে খাব।ব্যাপারটা সবারই পছন্দ হলো, কারন চুলা লাগালেই নানান দায়িত্ব নিতে হবে, বাজার করা, বুয়া ঠিক করা, আরো কত কি কে জানে। হাড়ি পাতিল কিছুই নাই, আছে একটা চুলা। আবার হাড়ি পাতিলো কিনতে হবে।সেগুলো কিভাবে কিনতে হয় তাও কেউ জানি না।তাই সেই বয়সের বুদ্ধিতে এটাই ভালো সিদ্ধান্ত মনে হলো সবার। বের হলাম হোটেলের খোজে।
রাস্তায় বের হয়ে অবাক হয়ে গেলাম। একটু আগে রাস্তা দেখে গেলাম, এখন সেখানে ঘাসের আবরন?পুরো রাস্তা সবুজ হয়ে আছে। ব্যাপারটা কি? ব্যাপার আর কিছুই না, কোথা থেকে জানি হাজার হাজার ঘাস ফড়িং এসে ঢেকে ফেলেছে পুরো শহর। কেউ কল্পনাও করতে পারবে না, পুরো রাস্তা এমন সবুজ হতে পারে। তার মাঝে বিশাল এক মোটর সাইকেল বাহিনী আমাদের সামনে দিয়ে নির্বাচনী(২০০১ সালের কথা) সো ডাউন করে চলে গেল, আর ঘাস ফড়িঙ বাহিনীকে রাস্তার সাথে মিশিয়ে দিয়ে গেল। ।আমি বরাবরই ভীতু টাইপের। মোটর সাইকেল মিছিল দেখে অনেক আগে দেখা হিন্দি গুলাম ছবির কথা মনে পড়ে গেল।মনে মনে ভাবলাম এ কোথায় এসে পড়লাম রে।কিপটে সেই মেস মেটের কারনে ভাত খাওয়া গেল না। ভাত, মাছ, মাংস সবকিছুর দাম অনেক বেশী। সে নাকি পরটা সবজি খাবে, আমরা ভাবলাম বেচারা একা কষ্ট করবে, আমরাও খাই। মেসে ফিরে আর এক কান্ড। আমাদের এক মেস মেট কঠিন ধার্মিক। একটা মোটে বাথরুম। সে একবার ঢুকলে আর বের হয় না। তার নাকি খুলুক(শব্দটা ঠিক লিখেছি কিনা জানি না) নিতে হয়।বোঝো ঠেলা।সবাই আড় চোখে খেয়াল করি কখন সে বের হয় বাথরুম থেকে।পরের দিনও কিপটা মেসমেটের কারনে তিনবেলা পরটা-সবজি।তার পরের দিনও।তার পরের দিনও।আর বাথরুমের সামনে লাইন। তিন দিনের দিন সপ্তাহটা শেষ হলেই ট্রেনে উঠে বসি।আমি একা না আমার মত আরও কয়েকজন, যারা কখনোই বাসার বাইরে থাকে নি। ট্রেন ছাড়লে হাফ ছেড়ে বলি ‘হায় এ কোথায় এলাম’।
পরিশেষ: এরপর পাঁচ বছর ছিলাম সিলেটে। অসাধারন একটা সময় কেটেছে সেখানে। একটা সময় এমন হলো যে, লম্বা ছুটিতেও ঢাকা আসতাম না।আর, এরপর কোনদিনই ঘাসফড়িংদের সেই মিছিল দেখিনি।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


