somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কলেজ,টেরেন্স স্যার আর পরীক্ষাহল...

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দু’বছর সময়টা খুব বেশী না।তার ওপর যদি আমার মতো খাপছাড়া কাউকে হঠাৎ করে খুব শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয় খাপ খাইয়ে নিতে তার তো একটু সময় লাগবেই।আমারো লেগেছিলো।ভর্তি হয়েছি নটরডেম কলেজে।শুনেছিলাম কলেজ লাইফ নাকি কঠিন মজার জীবন। ইচ্ছে হলে ক্লাস করো, না হলে নাই।ক্লাসের সময় পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাও।কিন্তু কলেজে ভর্তি হবার পর খুবই হতাশ হলাম। কারন পুরো ক্লাশরুমে একটা মাত্র দরজা।সেটা স্যারের সামনে।কোন পেছনের দরজা নেই।পেছনের দরজাই যদি না থাকে, পালাবো কিভাবে? আমার অনেক বন্ধু ভর্তি হয়েছে ঢাকা কলেজে।তাদের সাথে গিয়ে ঢাকা কলেজে ক্লাশ করে এলাম।কি আনন্দ, কি আনন্দ।সবাই যার যার ইচ্ছে মতো ক্লাশ করছে।কেউবা কেন্টিনের পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছে, কেউবা তাস খেলছে।কেন্টিনটা দেখলাম জম্পেস আড্ডার যায়গা।কাপের পর কাপ চা আসছে।ধুয়ো ওঠা চায়ের টেবিলে গরম গরম আড্ডা বোধহয় একেই বলে।নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নিজেকে অসংখ্যবার গালি দিলাম।কেন এতো দারুন একটা কলেজে ভর্তি হলাম না।আমাদের কলেজটা যেন একটা ক্যাডেট কলেজ।এটা করতে এই নিয়ম, ওটা করতে ওই নিয়ম।ভর্তির দিনতো আমাদের সবাইকে একটা করে নিয়মাবলীর বই ধরিয়ে দেয়া হলো।পরের বৃহস্পতিবার সেই বইটার উপর পরীক্ষা।আমি অথৈ সাগরে পড়লাম।কোথায় আমার স্বপ্নে দেখা সেই সুনীল-শীর্ষেন্দুর বইয়ের কলেজ লাইফ??

প্রথম ক্লাশটা ছিলো খুব মজার।ফিজিক্স ক্লাশ।ফাদার পিসোতো বলে একজন ফরেনার ক্লাশটা নিয়েছিলেন।খুব সুন্দরভাবে বাংলা বলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তার বাংলা বলা শুনি।মুগ্ধতার মাঝেই শিখে ফেলি মোশন, নিউটন্স ল, এনার্জির কঠিন কঠিন সূত্র।জহরলাল স্যার আমাদের ম্যাথ নিতেন। খুব মজা করে কথা বলেন।খরাপ লাগে না যখন বইয়ের কমপ্লেক্স নাম্বারের থিওরিটা তার লেকচারে খুব সহজ মনে হয়।

টেরেন্স পিনেরো নামে এক স্যার ছিলেন।তিনি নাকি হাতে নোটিশের বই নিয়ে ঘোরেন।কাউকে কোথাও কোন অনিয়মের কাজ করতে দেখলেই নাকি সেখান থেকে একটা পাতা ছিড়ে হাতে ধরিয়ে দেন আর বলেন ‘কাল থেকে তোমার আর কলেজে আসার দরকার নেই’।সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকি কবে আমার হাতে নোটিশ চলে আসে।তবে অল্প দিনেই আবিস্কার করে ফেলি এখানে অনেক নিয়মের মাঝে সবচেয়ে মজার জিনিসটা হলো, নিয়ম ভাঙ্গার চেষ্টা করা।ধরা পড়লে নির্ঘাত হাতে টেরেন্স স্যারের নোটিশ বইয়ের পাতা হাতে চলে আসবে আর কলেজ থেকে বের করে দিবে।তারপরো ক্লাশে তাসের প্যাকেট নিয়ে আসি।লুকিয়ে লুকিয়ে ক্লাশের ফাকে একটা তাসের চাল দেয়াতে যে এতো মজা কে জানতো? খেলার চেয়ে বেশী মজা পাই নিয়ম ভাঙ্গতে।নিষিদ্ধ আনন্দ, তবে অনেকগুন বেশী মজার।

নটরডেম কলেজের সবচেয়ে বোরিং ব্যাপার সম্ভবত ল্যাব ক্লাশগুলো।আমার কাছে এক একটা ল্যাব ক্লাশকে মনে হতো কন্সেট্রেশন ক্যাম্প।ফিজিক্স ল্যাবের নিয়মটা ছিলো এমন যে যেদিন যে ল্যাব থাকবে তার জন্য একটা রাফ সিট তৈরী করে আনতে হবে।সেখানে এক্সপেরিমেন্টের ডাটা তুলতে হবে।আমি ভাবলাম, রাফ সিট,এমন আর কি।কোন রকম একটা সিট তৈরী করে নিয়ে গেলাম।ল্যাবে ঢোকার মুখে সেই রাফ সিট চেক করে তাতে একটা বিশেষ সিল দিয়ে দেয়া হয়।আমার সিট দেখে টান দিয়ে ছিড়ে ফেললো।কিছুই নাকি হয় নি!মেকাপ করতে হবে।মানে অন্যদিন অন্যব্যাচ, যাদের হয়তো কাউকেই চিনি না তাদের সাথে ল্যাব করতে হবে।নিজেকে মনে হলো দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যবানদের একজন।কেমিস্ট্রি ল্যাবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিলো সল্ট টেস্ট।পান থেকে চুন খসলেই মেকাপ।এ রকম কত মেকাপ যে খেয়েছি তার ইয়াত্তা নাই।

সারা বছর লেখাপড়া করি না।তারপরো কিভাবে জানি সিলেবাস শেষ হয়ে যায়। কারন সপ্তাহে দুই দিন কুইজ পরীক্ষা হতো।সেই কল্যাণে নেহাত খারাপ হয় না ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা।একটা পরীক্ষার কথা বলি।সাধারনত পাশাপাশি রোলের সবার সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়।কারন একসাথেই ল্যাব ক্লাশের ভয়াবহ সময়টা কাটাতে হয়।আমার আগের রোল যার তার নাম রবিন।খুবই ব্রিলিয়ান্ট ছেলে।তবে তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পরীক্ষার মাঝে যদি তাকে বলি, রবিন এই জিনিসটা পারছি না, তুমি কি পারো? সে তখন তার লেখা বাদ দিয়ে সেই প্রশ্নটা নিয়ে ভাবা শুরু করে।কলম রেখে কি যেন ভাবে তারপর উত্তরটা বলে।এদিকে হয়তো তার অনেক প্রশ্ন লেখা বাকি আছে।কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।আমার পরে যার রোল তার নাম মিথুন।প্রচন্ড রেখাপড়া করে।পরীক্ষার মাঝে আমার সবচেয়ে বড় সহায় সে।তবে আমার কাছ থেকে কোন কিছু দেখতে গেলেই সে আমাকে পরীক্ষার হলের মাঝেই জোরে জোরে গালাগালি শুরু করতো।কারন আমার হাতের লেখা নাকি সে বুঝতে পারছে না।তাই যাতে তার গালাগালি খেতে না হয় সেজন্য সুন্দর হস্তাক্ষরে পরীক্ষা দেয়ার চেষ্টা করি।যে পরীক্ষাটার কথা বলছি, সেদিন আমাদের ক্লাশে গার্ড পড়েছেন স্বয়ং টেরেন্স স্যার।আড়ালে দেখার চেষ্টা করলাম তার হাতে নোটিশের খাতা আছে কিনা।নেই। তবে থাকলেও সমস্যা ছিলো না।কারন সেদিন প্রশ্নটা বেশ সোজা ছিলো।একটা প্রশ্ন বাদে আর সবগুলো উত্তর সময় শেষ হবার প্রায় আধঘন্টা আগেই শেষ করে ফেললাম সবাই।ওই একটা প্রশ্নের উত্তর আমি কেন আমাদের পুরো ক্লাশের বেশীরভাগ ছেলেই জানে না।কানে কানে মিথুনের কাছে খবর পেলাম আমাদের পরের সারিতে একদম পেছনে বসে আছে সরফরাজ, ও নাকি প্রশ্নের উত্তরটা পারে। ঠিক হলো সরফরাজ প্রোশ্নের উত্তরটা তার সামনের জনকে বলবে, সে বলবে তার সামনের জনকে,সে তার পাশের জন কে, এভাবে উত্তরটা মিথুনের কাছে পৌছুবে, মিথুন আমাকে,আমি রবিনকে,রবিন তার সামনের জনকে। কাজটা করতে হবে খুবই সাবধানে।কারন, টেরেন্স স্যার গার্ড দিচ্ছেন।ধরা পড়লে খবর আছে।মিশন শুরু হলো।সরফরাজ অনেক সাবধানে একটা বা দুইটা শব্দ তার সামনের জনকে বললো।সে তার সামনের জন্,সে তার পাশের জনকে।এভাবে বেশ কিছুক্ষন পর পর আমরা একটা বা দুইটা করে শব্দ ডেলিভারী পেতে থাকলাম।তবে পুরো কাজটা করতে হলো খুবই সাবধানে, টেরেন্স স্যারের চোখ এরিয়ে। একটা দুইটা করে শব্দ আসতে আসতে যখন পুরো উত্তরটা দাড়ালো, তখন আমরা খুবই অবাক হলাম। কারন বিভিন্নজন মারফত আসতে আসতে শব্দগুলো পরিবর্তন হয়ে গেছে। এবং শেষ পর্যন্ত বাক্যগুলো যা দাড়িয়েছে সেটা আর যাই বলা হোক কোনটাকেই অর্থবোধক কোন বাক্য বলা যাবে না।অনেকগুলো এলোমেলো সম্পর্কহীন শব্দর সমষ্টি ছাড়া সেটা আর কিছুই হয় নি।তারপরো আমরা খুশি কারন পুরো কাজটা সম্পূর্ণ করা গেছে টেরেন্স স্যারের হাতে ধরা না পরে।আর যাই হোক অন্তত প্রশ্নের উত্তরটা তো দিতে পেড়েছি।ছেড়ে তো আসি নি।সব লেখা শেষে যখন আমরা খাতা দিয়ে দেবার জন্য তৈরী হচ্ছি, তখন টেরেন্স স্যার এসে বললেন,’আচ্ছা তোমারা যে এতো কষ্ট করে ওই পেছনের ছেলেটার কাছ থেকে প্রশ্নের উত্তরটা যোগার করলে, যদি উত্তরটা যদি ভুল হয়? পুরো কষ্টটাই তো মাটি’।
আমাদের তখন কেবল অবাক হতে বাকি।

পরিশেষ: সেই প্রশ্নে আমরা কেউই কোন নাম্বার পাইনি। কারন উত্তরটা যে আসলেই ভুল ছিলো।টেরেন্স স্যার গত বছর মারা গেছেন।স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি তিনি ভালো থাকুন।তবে কঠিন নিয়মের মধ্যে থেকে আমি এমন অনেক কিছু শিখেছি, যা সারা জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি।সরফরাজ ঢাবি হয়ে এখন গুগলে কাজ করে,মিথুন আছে জিপিতে,রবিনও সেখানে, আর আমি? এখন ব্লগ লিখি।:)



সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১১:১৪
১৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×