১.
মনা পাগলের দুই দিন থেকে বেজায় মন খারাপ। পাগল বলে কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। তারও যে একটা বিচার বিবেচনা আছে সেটা কেউই বুঝে না। তা না হলে এবার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে কেউ তাকে ভোট দিতে বলে নাই কেন। বেছু মেম্বার গ্রামের সবার কাছে গিয়ে গিয়ে দোয়া চাচ্ছে, ভোট চাচ্ছে, টাকাও দিচ্ছে, অথচ যে মনা পাগল দিন রাত নবীগঞ্জ হাটে তার দোকানটার সামনে বসে থাকে এখনো তার কাছেই ভোট চায় নি। এসব কঠিন কঠিন কথা ভাবতে গিয়ে মনার মাথা আবারো গরম হয়ে যায়। আজকাল আর সে কঠিন কথা তেমন ভাবতেই পারে না। বয়স হচ্ছে তো। এই যেমন আজ সকালেই সে খুব কঠিন একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলো। বিষয়টা হলো গাড়ির চাক্কা কেন ঘোরে। এইটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনার মাথা গরম হয়ে গেলো। গরম মানে মহা গরম। শেষে হাটের আলু ব্যাবসায়ী মোটকা হেমায়েত মিয়াকে এক দৌড়ে হাটের বাইরে তাড়িয়ে দিয়ে এসে তার মাথা ঠান্ডা হলো। মাথা গরম হলে কাউকে না কাউকে দৌড়ান দিতে হয়। কিছুই করা লাগে না, মনা একটা হাক ছেড়ে দৌড় লাগালেই সামনে যে থাকে ভয়ে এমন দৌড় দেয়, যে আর ফিরার নাম করে না দুই ঘন্টায়। মনা কিছুই করে না খালি ভয় দেখায়। আর কেউ বেশী সাহস দেখালে তার গায়ে বমি করে দেয়। এ জন্য বাজারে তার নাম হয়েছে বমি মনা।
মনা সারাদিন বসে বসে হাটের লোকজনের কাজকাম দেখে। রাতে বেছু মেম্বারের দোকানের সামনে ঘুমায়। হাটের দোকানদাররাই তাকে দুপুরে আর রাতে খাবার দিয়ে যায়।খেয়ে দেয়ে আর কঠিন কঠিন জিনিস ভেবে মনার দিন কাটে। কিন্তু তার একটাই দুঃখ তাকে এবার কেউ ভোট দিতে বলে নাই। পুরা নবীগঞ্জ হাট নানান রঙের পোষ্টারে ছেয়ে গেছে। বেছু মেম্বার দাঁড়িয়েছে মই মার্কায়। তবে তার জেতার তেমন সম্ভাবনা নেই। তার বিপক্ষে আছে পূব পাড়ার হাসেম। হাসেম ভালো লোক। গাঁয়ের লোকজন তাকে খুব পছন্দ করে। আর বেছু মেম্বার এক নাম্বার সুদ খোর। যুদ্ধের সময় সে পাক বাহিনীর হয়ে রাজাকার বাহিনীতে কাজ করেছে। কত যে মানুষকে মেরেছে। এখন দাড়ি রেখে মৌলানা সেজেছে।মনা ঠিক করেছে তাকে যদি সত্যিই ভোট দিতে বলা হয়, তবে সে হাসেমকেই ভোট দিবে। কিন্তু কেউ তাকে ভোট দিতে বলে না। ভাবতে ভাবতে আবারো মনার মাথা গরম হয়ে যায়।মাথা ঠান্ডা করা দরকার। দেখা যাচ্ছে ঠিকাদার জমিল মিয়া আসছে। তাকে একটা দৌড়ান দিবে কিনা ভাবতে থাকে মনা পাগল।
২.
বেছু মেম্বারের কাছারিতে মিটিং বসেছে। হাসেমের সাথে পাল্লাদিয়ে পেড়ে উঠা যাচ্ছে না। কিছু একটা করা দরকার। বেছু মেম্বার তার লোকজন নিয়ে বসেছে সেই আলোচনায়।
-তোগোরে দিয়া কোন কাম হইবো না। এতো টাকা ঢালনের পড়ো সবাই হাসেইম্মার নাম কয় ক্যান।
বেছু মেম্বার বেজায় খেপে আছে। আজ সকালে নাকি উত্তর পারার বাচ্চাদের একটা দলকে খেলার ছলে সে মিছিল করতে দেখেছে। সবাই নাকি চিৎকার করে ‘আমার ভাই তোমার ভাই , হাসেম ভাই কাসেম ভাই’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলো।
-মেম্বার সাব, আমরার কি করার আছে। গন্ডগোলের সময় আপনের কাজকাম নিয়া কথা কয়। আপনে নাকি রাজাকার। এই সব।
নিজের দলের এক সদস্যের কথা শুনে কিছুক্ষন চুপ করে থাকেন বেছু মেম্বার।
-কিছু একটা করন লাগবো। হাসেম যে ভালা মানুষ না এইটা সবাইরে বুঝাইতে হেইবো। ,মিজান...
পেছন থেকে লম্বা আর কালো মতো মিজান বেড়িয়ে আসে। সবাই জানে সে বেছু মেম্বারের ডান হাত।
-মিজান শোন, একটা দুর্ঘটনা ঘটাইতে হইবো। আমার হাটের দোকানটা পুড়াইয়া দিবি। সবাইরে কমু যে হাসেম মিয়া আমারে হিংসা কইরা আমার দোকান পুড়াইছে। বুঝলি?
মিজান নিরবে মাথা নাড়ে। তার চোখ দূপুরের পুকুরের জলের মতো স্থির । তার স্থির চোখের দিকে তাকালে অনেকেই ভয় পায়। শোনা যায় গত বছর পাশের গ্রামের মফিজ মিয়া যখন বেছু মেম্বারের নামে থানায় কেস দিয়েছিলো তার জমি অবৈধভাবে দখল করার জন্য, তখন এই মিজানই তাকে রাতের বেলা খুন করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে।বেছু মেম্বার আবারো মিজানের দিকে তাকায়।
-আর শোন, দেখাইতে হইবো যে এই ঘটনায় খালি আমার ক্ষতি হয় নাই। মানুষও মারা গেছে। বুঝলি? একটারে লাশ বানাইতে হইবো।
মিজান আবারো চুপ করে থাকে। বেছু মেম্বার জানে, মিজানকে কিছু বলে দিতে হয় না। সে ঠিকই বুঝে নেয় তার মনের কথাটা। এমন একজনকে লাশ বানাতে হবে, যে মারা গেলে কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করবে না। খালি একটু আধটু কষ্ট পাবে।পুলিশও ঝামেলা করবে না।আর তার ভোটও কমবে না।তেমন লোক একজনই আছে নবীগঞ্জ হাটে।
৩.
আজকের রাতের খাওয়াটা বেশ ভালো হয়েছে মনা পাগলের। মাংসের দোকানের মালিক রহিম মিয়া আজ তাকে খাবার পাঠিয়েছে। মাংস ছিলো। অনেকদিন পরে মাংস খেলো মনা। এখন কোন একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুম দিলেই হবে। আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম গেছে তার। সারাদিন হাটের কোনার বড় আমগাছটাকে অনেকবার উঠানামা করেছে সে।একবার গাছে উঠে, আবার নেমে যায়। আবার উঠে, আবার নামে। খুবই কঠিন কাজ। সবাই পারে না। গাছ বিষয়ে একটা চিন্তা করতে করতে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলো সে, হঠাৎ কে যেনো তাকে ডেকে তুললো। চোখ মেলে দেখে বেছু মেম্বারের ডানহাত মিজান।মহা পাজি লোক। কি ব্যাপার? তাহেলে কি তার কাছে ভোট চাইতে এসেছে? ধরফর করে উঠে বসে মনা।
-ঐ পাগল উঠ।
-মিজান বাই, ভোট চাইতে এতো রাইতে আহনের কি দরকার ছিলো?
-ভিতরে যা, আইজ থিকা তুই মেম্বার সাবের দোকানের ভিতরে ঘুমাবি।
মিজান এমনিতেই বেশী কথা বলে না।
-ভিতরে ঘুমাইতে হইবো না। বাইরেই ভালো। চান সুরুজ দেহা যায়।
মিজানের কথায় মনার ভালোই লাগে। কত ইম্পর্টেন্ট ভাবছে তাকে। তারও যে একটা ইজ্জত আছে, সেটা তো বুঝছে। নাহ, লোকটা অত খারাপ না।
-মেম্বার সাব কইছে তোরে দোকানের ভিতর থাকতে।
বেশী বাক্য ব্যায় করতে ভালো লাগে না মিজানের। একটু বিরক্ত হয়।
-তাইলে আমারে ভোট দিতে দিবো?
সুযোগটা কাজে লাগায় মনা পাগল। একবার ভোট দিতে পারলেই সে খুশি।ভোটা টা অবশ্য হাসেমরেই দিবে সে। সেটাতো এখন আর বলা যায় না।
-হ, তোরে ভোট দিতে দিবে। এবার যা ভিতরে।নাইলে খবর আছে।
মিজান এবার সত্যিই খেপে যায়। পাগলের সাথে কথা বলে সময় নষ্ট।মিজান দোকানের ঝাপ খুলে দেয়।মনা পাগল খুশি মনে দোকানের ভিতরে যায়। মিজান দোকানটা বন্ধ করে দেয়। মনা পাগল ভোট বিষয়ক একটা জটিল চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে নবীগঞ্জ হাটের সবাই শুনে বেছু মেম্বারের দোকানটা নাকি হাসেম শত্রুতা করে পুড়িয়ে দিয়েছে। দোকানে থাকা মনা পাগল জীবন্ত পুড়ে মারা গেছে।আর, মনা পাগলকে নিজের লোক বলে বেছু মেম্বার থানায় মামলা করে প্রতিপক্ষ হাসেমের নামে।মনা পাগলের আর কোনদিনই ভোট দেয়া হয় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

