এটা কি ইয়র্কার হবে? নাকি বাউন্সার? আর মাত্র দু’বল বাকি। দু’বল। মাত্র দু'টি বল। কাঠের তৈরী বলটা ছোড়া হবে। আগুনের গোলার মতো ছুটে আসবে সেটা। তুহিনকে সেটার উপর ব্যাট চালাতে হবে।ছয় রান দরকার জিততে।ব্যাট দিয়ে বলটাকে কঠিন আঘাত করে মাঠের বাইরে বের করে দিতে হবে।কেউ যেন ধরতে না পারে।দু’টো বল। মাত্র দু’টো বলের উপর নির্ভর করছে তুহিনের বেঁচে থাকা, বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাইটির পরীক্ষা,মায়ের হাসি সবকিছু। বলটাকে জোরে আঘাত করে সবকিছু ছিনিয়ে আনতে হবে তাকে।
অনেক কিছুই হতে পারতো তুহিন জীবনে। কিন্তু বাবার অসুস্থতায় যখন তার ব্যাট হাতে পাড়ার ছেলেদের সাথে হাই স্কুল মাঠে খেলার ছলে বল পেটানোর কথা, তখনই তাকে যেতে যেতে হয় কাজে। সেই যে, গল্পের ছেলেটির মতো মোটর মেকানিকের কাজ। গল্পের ছেলেটি এই কাজ করতে করতে একদিন অনেক বড় হয়। ইঞ্জিনিয়ার হয়। বাবা মার কষ্ট ঘুঁচিয়ে দেয়। তুহিনও ওয়ার্কশপের কোনায় গাড়ির পার্টস মুছতে মুছতে সেই স্বপ্ন দেখতো। ক্রিকেট খেলাটা তার খুব পছন্দের ছিলো। কিন্তু খেলা হয় না। গ্যারেজের পাশটাতেই একটা ক্রিকেট কোচিং সেন্টার। বড় লোকের ছেলেরা সেখানে দুধ সাদা পোষাক পড়ে খেলতে নামে। সাদা গ্লাভস, প্যাড, দামী ব্যাট। তুহিন চেয়ে চেয়ে দেখে।কখনো কখনো একবার দু’বার বল এসে পড়ে গ্যারেজের ভেতর। তখন তুহিন সেটা ছুড়ে দেয় মাঠের ট্রেইনারদের কাছে।
কেবল গ্যরেজের আয় দিয়ে একসময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাবা অসুস্থ। কখনো কখনো মনে হয় অসুস্থ হওয়াটা ঠিক না। অসুস্থতা যখন হয়ে পড়ে অন্যদের বিরক্ত আর অসহায়ত্বের কারন, তখন সেই অসুখটার চেয়ে অসুস্থ মানুষটাকেই বেশী অসহ্য মনে হয়। তাই সারারাত অসুস্থ বাবার গোঙ্গানীতে বিরক্ত হয় তুহিন। অনেক কষ্টে ছোট ভাইটার লেখাপড়া চালানো হচ্ছে। পরের দিন পরীক্ষা মাথায় নিয়ে তাই ছোট ভাইটাও বাবাকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলে। একটু অতিরিক্ত টাকার আশায় পাশের ক্রিকেট কোচিং সেন্টারেও কাজ নেয় তুহিন। প্রথমে ক্লিনিং ম্যান থেকে এক সময় সে হয়ে উঠে প্রাকটিস বোলার। নেহাত খারাপ বল করে না সে। ফাস্ট বোলিংটাই ভালো পারে। কিন্তু এখানে তাকে সব ধরনের বোলিং করতে হয়। ফরমায়েশী বোলার বলে কথা। ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে বল করে যেতে হয়। বড়লোকের ছেলেগুলোকে আউট করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা কর যায় সে। পেছনের উইকেটের তিনটা স্ট্যাম্পকে তার মনে হয় তার দুর্ভাগ্যের তিনটি দেয়াল। সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলতে তীব্র আক্রোশে বল করে যায়।কখনো গালি খায় বড়লোকের ছেলেদের কাছে। চুপ করে সহ্য করে। বিনিময়ে দিন শেষে কিছু টাকা তো জোটে।কোচ যখন ছেলেদের শিখিয়ে দেয়, কিভাবে অফ ড্রাইভ করতে হয়, কিভাবে পুল করতে হয়, কিভাবে করতে হয় সুইপ আড় চোখে সেগুলো শিখে নেয় তুহিন। কত রকম নাম ব্যটিং এর। বোলিং ও যে কত রকম।
এভাবেই চলছিলো। সেদিন খুব নাম করা একজন ক্রিকেটার এসেছিলো বাচ্চাদের কোচিং দেখতে। অন্যদিনের মতো সেদিনও তুহিন বল করে চলেছে একটানা। হঠাৎ কি হলো সেই ক্রিকেটার তার দিকে এগিয়ে আসেন। কাঁধে হাত দিয়ে জানতে চায় সে কি করে। কতদিন থেকে খেলে। তুহিনের বল করার ধরনটা নাকি তার খুব ভালো লেগেছে। একটা ঠিকানা দিয়ে দেখা করতে বলে যান সেই ক্রিকেটার।
পরদিন ঠিকানা খুঁজে দেখা করে সেই ক্রিকেটারের সাথে। তিনি তাকে প্রতিদিন প্রাকটিস করতে বলেন। কিছু টিপস দিয়ে দেন। ঠিক মতো খেললে তাকে তার ক্লাব দলে নিয়ে নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। তুহিন কিভাবে প্রাকটিস করবে। এটা কি তার প্রাকটিস করার সময়। তারপরও সময় বের করে প্রতিদিন প্রাকটিসের চেষ্টা করে। সারাদিনের হাড় ভাঙ্গা খাটুনি শেষে শরীর আর মানে না। তার পরও সে বল করে যায় একটানা।কি জন্য করে সে নিজেই জানে না।
কোচিং ক্লাশের সাথে পাশের একটা ক্লাবের জুনিয়রদের প্রীতি ম্যাচ হবে। ফিল্ড বয় হিসেবে তাতে কাজ জুটে যায় তুহিনের। তুহিন বেশ খুশিই হয়। কারন, ঐ যে, বাড়তি কিছু আয় হবে এ থেকে। ম্যাচের দিন হঠাৎ করে মাঠেই একজনের পা মঁচকে যায় প্র্যাকটিস করতে গিয়ে। ছেলেটির জায়গায় কিভাবে কিভাবে যেন তুহিনের জায়গা হয়ে যায় দলে। ব্যাপারটাকে সে শ্রষ্টা প্রদত্ত সুযোগ হিসেবেই নেয়। নিজের তো আর ওরকম চকচকে খেলার পোষাক বা ব্যাট প্যাড নেই। পা মঁচকে যাওয়া ছেলেটার পোষাক আর ব্যাট নিয়ে মাঠে নামে তুহিন। চমৎকার বোলিং করে তুলে নেয় ক্লাব দলটির পাঁচ উইকেট আর ব্যাট হাতে অপরাজিত তিরিশ রান। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরষ্কারটাও জুটে যায় ভাগ্যে। কোচিং ক্লাশের ছাত্ররা ব্যাপারটা ভালো ভাবে নেয় না।এখানেই ক্রিকেট কোচিং এর চাকরিটা হারাতে হয়ে তুহিনকে।
সেই খেলার ফল হিসেবেই কিনা কে জানে, ক্লাব দলটি তুহিনকে তাদের দলে নিয়ে নেয়। শুরু হয় নতুন পথ চলা। নিয়মিত প্রাকটিস করতে গিয়ে ওয়ার্কশপের চাকরিটাও হারাতে হয় তাকে। এখন কেবল সম্বল ক্লাব থেকে পাওয়া কয়টা টাকা। সেই ক’টা টাকা দিয়ে কষ্ট করে চলে বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের পড়া। এর মাঝে চলে আসে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লীগ। তুহিনকেও মাঠে নামতে হয় দলটির হয়ে। গল্পের মতো মনে হয় তুহিনের কাছে। কোথায় সে ছিলো সাধারন মেকানিক, সেখান থেকে সে আজ দ্বিতীয় বিভাগের খেলোয়ার। কিন্তু বাকিটা আর গল্পের মতো এগোয় না। একের পর এক ম্যাচে উইকেটশূন্য থাকে সে।সেই সাথে হেড়ে চলে তার দল।বোলিংয়ের সময় উইকেটের তিনটা স্ট্যাম্প যেন অনেক দূরের তিনটা স্তম্ভ মনে হয়। কিছুতেই পৌছানো যায় না সেখানে বল হাতে।ম্যানেজার বলে দিয়েছে ভালো কিছু করে দেখাতে না পাড়লে তাকে দল থেকে তো বটেই, ক্লাব থেকেই বাদ দিয়ে দেয়া হবে। আজ শেষ ম্যাচ।আগেরদিন সারারাত ঘুম হয় না তুহিনের। এপাশ ওপাশ করে কেটে যায় সারাটা রাত। পারবে কি সে তিনটা স্ট্যাম্পের দেয়ালটা ভাঙতে।
খেলা শুরু হয়। তুহিনকেও নামানো হয়েছে। এটা গ্রুপের শেষ ম্যাচ। আর একই সাথে তার ক্লাবেরও শেষ ম্যাচ। জিততেই হবে। না হলে লীগ থেকে ছিটকে পরবে তুহিনের ক্লাব। তুহিনকে এই ম্যাচেই কিছু করে দেখাতে হবে। করতেই হবে কিছু একটা। এটা যে এখন আর কেবল খেলা নয়। তার আর তার পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। তুহিন অপেক্ষা করে, কখন তাকে বল হাতে তুলে দিবেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু অদ্ভুত লাগে ওভারের পর ওভার শেষ হয়, কিন্তু বল হাতে পায় না তুহিন। অন্য বোলাররা রানের পর রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকে, কিন্তু তার হাতে বল দেয় না ক্যাপ্টেন। বিশাল রানের পাহাড় গড়ে মাঠ ছাড়ে বিপক্ষ দল।একটি ওভার বল করারও সুযোগ দেয়া হয় না তুহিনকে।
তুহিন মূলত বোলার। মাঝে মাঝে ভালো ব্যাট করে। তাই বলে এই পাহাড় সমান রান তাড়া করে সে দলকে কিভাবে জেতাবে। তার ওপর তাকে নামতে হয় লেট অর্ডারে। তারপরও সে অপেক্ষা করে ব্যাট হাতে। যদি কিছু করা যায়। বিশাল রান তাড়া করতে গিয়ে একের পর এক উইকেট পড়ে যায় তার ক্লাব দলের। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও সাত নাম্বারে ব্যাট হাতে নামে তুহিন। নিজেই ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয় রান। যখন জিততে হলে দশ ওভারে বাহাত্তর রান লাগবে, তখন ওপাশ থেকে আউট হয়ে যায় ক্লাবের ক্যাপ্টেন।ছয় ওভারে যখন আর চল্লিশ রান দরকার তখন আবারো উইকেট পড়ে ওপাশ থেকে। পাঁচ ওভারে যখন লাগবে আর বত্রিশ রান, তখন আবার উইকেট পরে।হাতে এক উইকেট নিয়ে অপর পাশের খেলোয়ারটিকে কেবল পাশ বদল করিয়ে একাই রান করে যায় তুহিন।
শেষ ওভার চলছে।শেষ দুই বলে ছয় রান দরকার।বিপক্ষ দল হাতের মুঠোর ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যাবার দুঃখে পাগল। গোল হয়ে মিটিং করে সবাই। তারপর শেষ বোলারটি তার শেষ দুটো বল করতে এগিয়ে আসে।প্রথম বলটা ধেয়ে আসে। বাউন্সার। তুহিন হুক করে বলটাকে একটা রান নেয়। যেভাবেই হোক আর একটা রান নিতে হবে। স্ট্রাইকিংটা ধরতে হবে লাষ্ট বলে। ফিল্ডার বল ছুঁয়ে ফেলেছে। প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে তুহিন। অপর প্রান্ত আর কতদূরে।
অল্পের জন্য রান আউট থেকে রক্ষা পায় সে।শেষ বল। রান লাগবে চার। কেমন হবে এই বলটা? হয়তো এটাই তার জীবনের শেষ ম্যাচ।শেষ বল।এই বলটার উপর নির্ভর করছে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ।বোলার দৌড়ে আসছে। মাঠ ছাড়া করতে হবে বলটা। করতেই হবে।সেই সাথে দুঃখ, দারিদ্র আর বঞ্চনাকেও মাঠ ছাড়া করতে হবে। পারবে কি তুহিন। বোলার বলটা হাতে থেকে ছুড়েছে। ব্যাট চালায় তুহিন।প্রচন্ড আক্রোশে মনের সব কষ্টকে জড়ো করে আঘাত করে বলটিকে।বলটা এগিয়ে যাচ্ছে বাউন্ডারির দিকে। পেছনে ছুটছে ফিল্ডার। তুহিনের সব বঞ্চনা আর কষ্ট নিয়ে বলটা কি পাড়বে ফিল্ডারকে ফাঁকি দিতে?
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০০৯ সকাল ৯:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


