আমার সিরিজ হলো NC-446. এটা আমার প্রজাতি।রবোকন ইন্ডাষ্ট্রির নতুনতম চালান আমি। এ প্রজাতি ছাড়াও আমার একটা নাম আছে। কোম্পানির হিসেবে আমার সিরিয়াল হলো 552। কিন্তু আমার মনিব আমাকে রোবো বলে ডাকে। মানুষের এই একটা অদ্ভুত জিনিস। তাদের নিজেদেরও নাম্বার আছে। ন্যাশনালিটি নাম্বার, হেলথ ইন্স্যুরেন্স নাম্বার, জব আই ডি আরো কত কত নাম্বার। কিন্তু তারপরও তাদের সবারই সবাইকে কোন না কোন নামে ডাকতে হয়। তবে সাধারন মানুষের সব দোষ গুণ নিয়েও আমার মনিব রুহান খুবই ভালো মানুষ। আমি কার্যত তার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করি। তাই অফিস কিংবা বাসা দু’জায়গাতেই আমি তাকে দেখি এক দায়িত্ববান কর্মী আর একজন অনুভুতিশীল মানুষ হিসেবে। কাজ পাগল এই লোকটি সারাক্ষন কেবল কাজ করে। ও হ্যা, আমার মনিব রুহান একটা প্রেমও করে।রুহানের প্রেমিকা,কিলিও বেশ ভালো মেয়ে বলেই আমি জানি। যদিও সে আমাকে দু’চোখে দেখতে পারে না। আমি জানি, মেয়েরা কখনোই এটা পছন্দ করে না, কেউ তার ভালোবাসার মানুষটিকে তার চেয়ে বেশী যত্ন করুক। রুহান যে সব সময়ই কিলির কাছে আমার প্রশংসা করে, এটা আমি জানি। তাই হয়তো মেয়েদের স্বভাব সুলভ হিংসা থেকেই কিলি আমাকে পছন্দ করে না। আমি যতদূর বুঝি রুহান কিলিকে পাগলের মতো ভালোবাসে। এই ভালোবাসা জিনিসটা সম্পর্কে আমার ভেতর তেমন কোন অনুভুতি দেয়া হয় নি। তবে বই পত্র পড়ে আমি যেটা বুঝেছি, এটা খুব মহান আর অদ্ভুত একটা জিনিস।
আমি একটা তৃতীয় মাত্রার রোবট। শুনেছি আমার পরের প্রজন্মের রোবটগুলোকে নাকি রোবোটিক্সের তিনটি সূত্র ভেঙ্গে তৈরী করা হবে। মানে চতুর্থ প্রজন্মের রোবটগুলো হবে মানুষেরই মতো। তার এমনকি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষের ক্ষতিও করতে পারবে। যদিও এসব ব্যাপারে আমার তেমন কিছু বলা উচিত না, তবুও আমি মনে করি এটা ঠিক হয় নি। রোবটকে তৈরী করা হয়েছে মানুষের উপকারের জন্য। মানুষের কাছে তাদের অবস্থান কিছুই না। একজন মানুষ যেভাবে ভালোবাসতে পারে, একটা রোবটকি কোনদিনও তা পারবে। আমার সামনে তার জ্বলন্ত উদাহরন রুহান। কিলির জন্য তার অপরিসীম ভালোবাসা দেখে আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। কি অদ্ভুত এক জিনিস এই ভালোবাসা।
একদিনের ঘটনা না বললেই নয়। রোবট হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো আমি মিথ্যা বলতে পারি না।যেটা সত্য নয়, সেটা বলতে গেলে আমার কপোট্রনের ভেতর একধরনের বিপরীত চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী হয়। যেটা আমাকে স্থির থাকতে দেয় না। ভয়ঙ্কর কষ্ট হয় তখন। মস্তিষ্কের এধরনের বিপরীত চৌম্বকীয় বলয় থেকে বের হতে গিয়ে কতবার যে আমাদের সিরিজের রোবটের কপোট্রনই জ্বলে গেছে তার ইয়াত্বা নেই। কোনভাবেই তাই আমরা মিথ্যা বলতে পারি না। সেই রূপকথার পাপেট পিনোকিও এর মতো।মিথ্যা বললেই যার নাক লম্বা হয়ে যেতো। অথচ, একদিন রুহান বললো যে আমাকে মিথ্যা বলতে হবে। কারন সেই দিনটি ছিলো কিলি আর রুহানের প্রথম দেখা হবার চতুর্থ বার্ষিকী। রুহান কিলিকে সারপ্রাইজ দিতে একটা গিফট কিনে রেখেছিলো। রুহান আমাকে বললো, কিলি যদি ফোন করে তাকে জিজ্ঞেস করে,যে সে কোন গিফট কিনেছে কিনা, তাহলে আমি যেন বলি যে না কেনা হয়নি। আমি তখন রুহানকে বুঝিয়ে বললাম, মিথ্যা বললে আমার কি সমস্যা হয়। রুহান বিশ্বাসই করলো না। ভগ্যিস সেবার কিলি ফোন করে কিছু জানতে চায় নি। না হলে সেবারই মনে হয় আমার কপোট্রনটা জ্বলে যেতো।
কদিন থেকে দেখছি রুহান কিছু একটা জিনিস নিয়ে খুব চিন্তত। অফিসের কোন ব্যাপার না। কারন তা হলে আমি জানতাম। তাহলে কি কিলিকে নিয়ে কোন সমস্যা। শেষে আজ সকালে আমি আমি বুঝতে পারলাম বিষয়টা কি। সাধারনত আমি সবসময় রুহানের সাথেই থাকি। কিন্তু যখন সে কিলির সাথে থাকে তখন আমাকে কাছে রাখে না। রুহান কিলির সাথে ডেট করতে গিয়েছিলো। বিকেলে দু’জন একসাথেই ফিরলো। কিন্তু অন্য দিনের মতো নয়। দু’জনেরই মুখ দেখলাম থমথমে। তাহেল কি ঝগড়া হয়েছে। এমনটা প্রতি সপ্তাহেই হয়। আমি বইয়ে পড়েছি, সব প্রেমেই গড়ে সপ্তাহে একদিন ঝগড়া হয়।এ সপ্তাহে কিলি আর রুহানের কোন ঝগড়া হয় নি। সুতরাং আজ ঝগড়া হতেই পারে। তাই আমি চুপচাপ নিজের কাজ করতে লাগলাম।
একসময় শুনলাম কিলি রুহানকে যা ইচ্ছে গালাগালি দিচ্ছে। কান পেতে কথা শোনা ঠিক না, তবে কি করবো, এতজোরে কথা বলছিলো দু’জন যে, কথা গুলো শুনতেই হলো। তা থেকে যা বুঝলাম, কিলি ইদানিং অন্য একটি ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে, আর রুহান আজ তাকে হাতে নাতে ধরে ফেরেছে।রুহান যে কোন জাতেরই না, আর রুহানের মতো একটা ছেলের সাথে থেকে যে কিলি তার জীবনটা নষ্ট করতে চায় না, সে কথাই কিলি বার বার বলছিলো।তার চেয়ে নাকি অন্য ছেলেটিই ভালো। বেশ কিছুক্ষন ঝগড়ার পর সেটা ভয়াবহ আকার ধারন করলো। এক পর্যায়ে কিলি দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে ছুরি টা নিয়ে রুহানের উপর ঝাপিয়ে পড়লো। দু’জন মানুষের মাঝে লড়াইয়ের সময় কি করতে হয় তা আমার জানা নেই। তবুও আমি চেষ্টা করলাম কিলি কে অস্ত্রমুক্ত করতে। কিন্তু কিলি ছুরিটা নিয়ে রুহানের বুকে ঢুকিয়ে দিতে গেলো। রুহান সরে যেতে চাইলো। কিলির হাতটা চেপে ধরে ছুরি ধরা হাতটা ঘুরিয়ে দিতে চাইলো। আর তা করতে গিয়ে কিভাবে যেন কিলির বুকেই ছুরিটা ঢুকে গেলো। কিলির বুক দিয়ে বন্যার মতো রক্ত পড়ছিলো। রুহান কিলির নিথর দেহটা ধরে কাঁদছিলো। আমি পুরো ব্যাপারটা দেখেছি। আমি জানি, এখন রুহানকেই খুনি হিসেবে ধরা হবে। আর কার্যত ব্যাপারটা তাই। রুহানের হাতেই ছুড়ি ছিলো, যখন সেটা কিলির বুকে ঢুকে যায়।
পুলিশ এসে রুহানকে ধরে নিয়ে গেলো। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইন্টারোগেশনে। একটা ইন্টরোগেটর রোবট আমাকে জিজ্ঞেস করলো,’ NC-446: 552, তুমি সবই দেখেছো। আমি যা জানতে চাইবো, তুমি এক কথায় উত্তর দিবে।‘
আমি মাথা নাড়লাম।
-কিলিকে কি রুহান নিজহাতে খুন করেছে?
শান্ত গলায় রোবটটি জানতে চাইলো।
আমি জানি, আমিই একমাত্র সাক্ষী। আমি যা বলবো, তাতেই রুহানের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। রুহান অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আমাকে কখনো রোবট বলে তুচ্ছ করে নি। আর খুনটা কিভাবে হয়েছে তাও আমি জানি। কিন্তু আমাকে রুহানকে বাঁচাতেই হবে। আমাকে মিথ্যা বলতে হবে। রুহান যে কিলিকে খুন করে নি তা বলতে হবে। যেভাবেই হোক রুহানকে বাঁচাতে হবে।আমি মিথ্যা বলার প্রস্তুতি নেই। আমার কপোট্রনে বিপরীত চৌম্বক বলয় তৈরী হয়। যেটা আমাকে কিছুতেই মিথ্যা বলতে দিবে না। আমার প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে কপোট্রনটা জ্বলে যাচ্ছে। আমি আর পারছি না। তবুও আমাকে মিথ্যা বলতেই হবে। পুড়ে যাক আমার কপোট্রন, তবুও আমাকে রুহানকে বাঁচাতে হবে। বিপরীত চৌম্বক বলয় আরো বাড়ছে। কি কষ্ট, কি কষ্ট। তারপরও আমাকে বলতেই হবে। মিথ্যা বলতেই হবে।
কিছু পরে NC-446 সিরিজের 552 সিরিয়ালের রোবটটিকে কপোট্রন জ্বলে যাওয়া অবস্থায় ইন্টারোগেশন সেল থেকে বের করে আনা হয়। কপোট্রনটি এমন ভাবে পুড়ে গিয়েছিলো যে, কিছুতেই আর তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনা যায় নি।
নির্ঘন্ট:
কপোট্রন: রোবটের মস্তিষ্ক।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ রাত ১০:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


