অহঙ্কারে ছেলেটার মাটিতে পা পড়ে না। দেশের সেরা কলেজ থেকে পাশ করে এসে ভর্তি হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিপার্টমেন্টের ছাত্র সে। নিজেকে খুব উচু দরের জ্ঞানী মানুষ ভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনেই সবাই কোন ডিপার্টমেন্টে কয়টা মেয়ে তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দেয়। দেখা গেলো ছেলেটা ডিপার্টমেন্টে মাত্র ছয়টা মেয়ে। কিন্তু এই সব আলোচনায় মন নেই ছেলেটার। প্রেম ট্রেম ব্যাপারটাকে সে ফালতু বিষয় মনে করে। সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে। ক্লাশে স্যারদের প্রশ্ন করে বিজ্ঞের মতো। গোল গোল চশমার উপর দিয়ে তাকায় বুদ্ধিজীবিদের মতো মতো।
পাহাড় ঘেরা ক্যাম্পাস। যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই সবুজ। মাস পেরোতে না পেরোতেই চলে আসে নববর্ষ। ততদিনে ছেলেটা ক্যাম্পাসে বেশ কিছু বন্ধু তৈরী করে নিয়েছে। তবে ক্লাশের বেশীর ভাগ ছাত্র ছাত্রীই তাকে আড়ালে আঁতেল বলে ডাকে। বিরক্তিকর এক ধরনের ছেলেমানুষী আছে ছেলেটার মাঝে। আমি কি হনুরে টাইপ একটা ভাবও আছে। তবুও কিছু ভালো বন্ধু জুটে যায় তার। ঢাকা থেকে অনেক দূরে পাহাড় ঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশীর ভাগ ছাত্র ছাত্রীই এখানকার স্থানীয় নয়। তাই সবাই এখানে সবার বন্ধু, পরম আত্মীয়।
ক্যাম্পাসে প্রথম বাংলা নববর্ষ।সবারই আগ্রহের শেষ নেই। ছেলেটার এক বন্ধু এসে প্রস্তাব দেয় এবার তারা ক্যাম্পাসে বৈশাখী মেলায় একটা ষ্টল দিবে। চরম মুখচোরা হয়েও কেন যেন ছেলেটি বন্ধুটির সাথে ষ্টল দিতে রাজী হয়ে যায়। কত কি প্ল্যান। কেমন টি শার্ট করা হবে, খাবার কি কি থাকবে, কেমন করে সাজানো হবে দোকানটা আরো কত কি।প্রত্যেকে দিবে দু'হাজার টাকা করে। কিন্তু তারপরও টাকায় হয় না। খোঁজা শুরু হয় একটা স্পন্সরশীপ। স্থানীয় একটা সাইবার ক্যাফে রাজীও হয়ে যায় স্পন্সরশীপ দিতে। কিন্তু শর্ত একটাই,তারাও একটা স্টল দিবে। আর সেখানে থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়েরই কয়েকজন ছেলেমেয়েকে। কে কে থাকবে। সবাই চায় নিজেদের স্টলটিতে থাকতে। অবশেষে ছেলেটিকে রাজী করানো হয়ে স্পন্সরশীপের দোকানটিতে বসতে। সাথে আরো দু'জন ছেলে। এবার খোঁজা শুরু হয় মেয়েদের মাঝে কাকে কাকে রাখা যায় স্পন্সরশীপ কোম্পানীর স্টলটিতে। ডিপার্টমেন্টের তিনজন মেয়েকেই বলা হয়। ওদের দু'জন রাজী হয়। আর ওরাই নিশ্চিত করে তৃতীয় একটি মেয়েকে। অন্য একটি ডিপার্টমেন্টের একজনকে ঠিক করা হয় তৃতীয় জন হিসেবে। এই তৃতীয় জনই আমাদের গল্পের নায়িকা।
দেখতে দেখতে পহেলা বৈশাখ চলে আসে। স্পন্সরশীপের দোকানে বসবে, একটা ইম্পর্টেন্ট ব্যাপার। তাই ছেলেটা বেশ সিরিয়াসলি চলে আসে নববর্ষের দিন সকালে। মেয়ে তিনটির মধ্যে দু'জন তার ক্লাসমেট। ওদেরকে আগে থেকেই চিনে সে। তৃতীয়জনের সাথে এ দিনই প্রথম দেখা। কেমন যেন চুপচাপ টাইপের মেয়ে। সারাদিন খুব সিরিয়াসনেস দেখিয়ে কাজ করে যায় ছেলেটি। এর মাঝে আবার নিজেদের স্টলটাটাতেও বসে কিছুক্ষনের জন্য। ভাবটা এমন যেন তার মতো ব্যাস্ত মানুষ এই মেলায় আর কেউ নেই। সব কিছুতেই আগ বাড়িয়ে একটা নেতা নেতা ভাব আনতে চায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। উল্টো সবকিছু ভজঘট লাগিয়ে ফেলে। বিকেলের দিকে মেলায় মানুষের ঢল নামে। পুরো শহরের মানুষ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছোট্ট মেলায় এক হয়েছে। ছেলে মেয়েগুলো সামলে উঠতে পারে না। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে। অবশেষে সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বসে যায় বিকি কিনির হিসাব করতে।
মেলা ছিলো পরের দিনও। কিন্তু সকাল থেকেই বৃষ্টি। প্রবল ঝড়ে উড়ে যায় মেলার স্টল। ষ্টলের মাঠ কাঁদা পানি তে ছয়লাব। সবাই মন খারাপ করে বসে থাকে। আরো একটা দিন মেলা টা চালানো গেলে কিছুটা লাভ হতো। পড়ন্ত বিকেলে সবাই মিলে বসে আছে মেলার মাঠে। দূর আকাশে আবারো মেঘ জমেছে। আবারো মনে হয় ঝড় আসবে। একদিকে মেলার ক্ষতি , তার ওপর আজ প্রথম সেমিষ্টারের রেজাল্ট দিয়েছে। ছোট বেলা থেকে সবসময় সব বিষয়ে ভালো নাম্বার পেয়ে আসছে ছেলেটা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিষ্টারের ম্যাথ কোর্সে খুব খারাপ করে বসে আছে। মন মেজাজ তেঁতো হয়ে আছে তার। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেঘের দিকে। যেন সব দোষ হতচ্ছাড়া এই এই কালবৈশাখী মেঘের।
এমন সময় ষ্টলে বসা অন্য ডিপার্টমেন্টের মেয়েটা এসে পাশে বসে। ছেলেটা দিকে তাকিয়ে বল,' তোমাদের সাথে কাজ করে খুব ভালো লাগলো।'
ছেলেটা যথারীতি ভ্রু কুঁচকে গোল গোল চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললো, 'তুই আমাকে তুমি তুমি করে বলছিস কেন? আর একই ক্যাম্পাসে যখন আছি, নিশ্চয়ই দেখা হবে আমাদের'
ছেলেটা আচরনে মনে হয় একটু অবাক হয় মেয়েটি। একটু হাসে। ছেলেটি যথারীতি বলে যাচ্ছে, ' আজ আমার মন খুব খারাপ। ম্যাথে পেয়েছি বি প্লাম। আমারে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু না।'
ছেলেটার আচরনে মনে হচ্ছে ম্যাথে বি প্লাস পাওয়া আর এই মুহূর্তে ট্রাকের তলায় ঝাঁপ দেয়া একই কথা। কি অদ্ভুত ছেলেমানুষী আচরন ছেলেটার। মেয়েটা তার হ্যান্ড ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনছিলো। আস্তে করে হেড ফোনটা বাড়িয়ে দিলো ছেলেটার দিকে।' এই গান শুনে দেখ, ভালো লাগবে।"
ছেলেটা আরো বিরক্তির ভাব ধরলো। ভ্রু কুঁচকাতে কুঁচকাতে এমন অবস্থা যে, মনে হচ্ছে ভ্রু দু'টো মাথার উপর উঠে যাবে। 'নাহ, গান শুনবো না। ভাল্লাগছে না।'
একদিনের পরিচয়ে ছেলেটার এই অদ্ভুত আচরনে অবাক হয় মেয়েটি।মেয়েটা হেড ফোনটা সরিয়ে নিলো। কি যেন ভাবলো ছেলেটা খানিক্ষন। তারপর আবার বললো, 'আচ্ছা দে, শুনে দেখি, কেমন গান, সব গান আমার ভালো লাগে না।ফালতু গান হলে শুনবো না।'
মেয়েটা হেডফোনটা ছেলেটার কানে লাগিয়ে দিলো। দূর আকাশে জমাট বাঁধছে তখন কালবৈশাখী মেঘ। হালকা বাতাস দিচ্ছে দক্ষিন থেকে। আর ছেলটিঁর কানে তখন বাজছে মৌসুমী ভৌমেকের গান
'আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিঘন্ত ছুয়ে এসেছো,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো....'
ছেলেটা জানতেও পারলো না ছোট্ট বেলা থেকে বইয়ে মুখ গোঁজা জীবনটায় এই বিকেল টা কি ওলট পালট ঘটিয়ে দিলো।
শেষ কথা: এরপর ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো পাঁচটি বছর ছিলো। এমন একটা সময় এলো, যখন ওই মেয়েটাকে ছাড়া ছেলেটা আর কিছুই ভাবতে পারতো না। প্রেম না করার অহঙ্কার আর সবজান্তা আঁতলামী দু'টোই তখন কোথায় হারিয়ে গেছে। অনেক ঘটনা আর অসাধারন একটা ক্যাম্পাস লাইফের পর ছেলেটা এখন সেই মেয়েটিকে নিয়ে ঘর বেঁধেছে। সাতটি বছর আগের সেই পহেলা বৈশাখ কি ভুলে যাওয়া যায়?
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৩ বিকাল ৫:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



