১.
পাহাড়ের উপর ত্রীনা আর রোহান দাঁড়িয়ে ছিলো। নীল আকাশটা ধীরে ধীরে লালচে বর্ণ ধারন করছে। পূব দিক থেকে দমকা বাতাস বইছে। ত্রীনা হাত বাড়িয়ে রোহানকে স্পর্শ করে। সে জানে না, কতক্ষন সে রোহান কে কাছে পাবে। আর কতক্ষন বেঁচে থাকবে তারা। পৃথিবী নামের গ্রহটির আজ শেষ দিন। ডুমস ডে, শেষ দিন। ত্রীনা, রোহানের মতো এই গ্রহের আরো কয়েকশো কোটি মানুষকে আজ ধ্বংস করে ফেলা হবে। দু'সপ্তাহ আগে যখন তারা জানলো, এই দিনে এই গ্রহটিতে পরীক্ষামূলক ভাবে গড়ে ওঠা সভ্যতাটিকে ধ্বংস করে ফেলা হবে, প্রথমে পুরো গ্রহ জুড়ে আতঙ্ক তৈরী হলো। তারপর ধীরে ধীরে তাদের মাঝে শুরু হয় হতাশা। গত কয়েকদিন ধরে সেই হতাশাও দূর হয়ে গেছে। এখন সবাই কেবল শেষ সময়টা যতটা ভালো ভাবে কাটানো যায় তার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই রোহান তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ত্রীনাকে নিয়ে চলে এসেছে উত্তরের এই পাহাড়ি অঞ্চলে। শেস সময়টা সে ত্রীনার সাথেই কাটাতে চায়।
পূব আকাশ লালচে রং থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় লাল হয়ে যাচ্ছে। গুড়গুড় করে একটা চাপা শব্দ আসছে। কেমন লাগবে মৃত্যুর সময়টা। রোহান ভাবতে চায় শেষবারের মতো চোখ বোজার আগে সে কেবল ত্রীনার মুখটাই দেখবে। স্রষ্টায় কখনো বিশ্বাস ছিলো না তার। তবুও মনপ্রান দিয়ে সে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করে অন্তত তার জীবনের বিনিময়ে হলেও যেন ত্রীনার জীবনটা রক্ষা পায়। আকাশটা আরো লাল হয়ে আসছে। রোহানের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাহলে কি তাদের কে শ্বাসরুদ্ধ কর মারা হবে? রোহান তার এয়ার সিচ্যুয়েশন মনিটরের দিতে তাকালো। অক্সিজেনের মাত্রা বিপদ জনক ভাবে কমে আসছে। রোহান ত্রীনার দিকে তকালো। ত্রীনার নাক মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। রোহান বুঝতে পারে, ত্রীনারও নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে সাথে করে একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে এসেছিলো বাড়তি সতর্কতা হিসেবে। খুব অল্প পরিমান অক্সিজন। বেশী হলে ঘন্টা দু'য়েকের মতো চলবে। রোহান সিলিন্ডারের মাস্কটা ত্রীনার মুখে পড়িয়ে দেয়। একটা শান্তির ছায়া ফিরে আসে ত্রীনার চেহারায়।
-"আমি তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি ত্রীনা।" রোহানের কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেনের পরিমান আরো কমে আসছে। তবুও অনেক অনেকবার বলা চির সত্য কথাটা আবারো বললো।
-"রোহান আমি তোমার আগে মরতে চাই। প্লিজ তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।তোমাকে ছাড়া আমি একা বাঁচতে পারবো না " ত্রীনা জোর করে অক্সিজেন মাস্কটা খুলে ফেলতে চায়। রোহান দেয় না। সে জোর করে অক্সিজেন মাস্কটা ত্রীনার মুখে চেপে রাখে। কতক্ষন রাখতে পারবে জানে না। খুব দুর্বল লাগছে। সে বুঝতে পারছে, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমান প্রায় শূণ্যের কাছাকাছি চলে এসেছে। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। তবু ত্রীনা বেঁচে থাকুক। দু'ঘন্টা বেশী হলেও বেঁচে থাকুক।
২.
মনিটরের দিকে তাকিয়ে প্রাণীটি একটু অবাক হলো। তার উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই গ্রহের পরীক্ষামূলক সভ্যতাটিকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার। কেননা এই সভ্যতাটি একটি ব্যার্থ সভ্যতা হিসেবে প্রমানিত হয়েছে। এক কমিউনিটি অন্য কমিউনিটির সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। একে অপরকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে এমনকি তারা নিজেদের বাসস্থান এই সবুজ গ্রহটিতেও ধ্বংসের মুখোমুখি করে ফেলেছে। তাই তারা পৃথিবী নামের এই গ্রহটি থেকে মানুষ নামের প্রজাতিটিকে সরিয়ে দিতে এসেছে। মানুষের পরিবর্তে এখানে অন্য এক প্রকার জীবের বীজ বপন করা হবে।
অক্সিজেনে মাত্রা পায় শূণ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া প্রায় কয়েকশো বছর চলবে। হঠাৎ মনিটরে একটি পাহাড়ের উপর একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে দেখা গেলো। ছেলেটি মেয়েটিকে ভালোবাসে। মেয়েটিও তাই।মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য ছেলেটি তার সাথে করে আনা অক্সিজেন সিলিন্ডারটি জোর করে চেপে রেখেছে মেয়েটির মুখে। মানুষ প্রজাতির এই একটা জিনিসই কেবল ভালো ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ভালোবাসা। খুব অদ্ভুত কারনে তারা একে অপরকে ভালোবাসে।
প্রাথমিক ধারনা ছিলো এটা কেবলই জৈবিক প্রয়োজন থেকে সৃষ্টি।কিন্তু জৈবিক প্রয়োজন বাদেও আরো অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাঝে এই জিনিসটির প্রকাশ দেখা গেছে।মনেটরের সামনে বসে থাকা প্রাণীটি একটু অবাক হয়। কিভাবে একটি প্রাণী মৃত্যুর পূর্বেও তার প্রিয় মানুষটিকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে পারে। এটা কি কেবলই জৈবিক প্রয়োজন? নাকি অন্য কিছু। গ্রহটি থেকে মানুষ নামের জীব গুলোকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার পরও প্রাণীটির মনে একটা সুক্ষ সন্দেহ থেকে যায়। মানুষ প্রজাতিটি আসলেই কি ব্যার্থ ছিলো ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



