পুরষ্কারটা হাতে নিয়ে গণিতবিদ ও দার্শনিক ত্রেহা বেশ কিছুক্ষন একমনে চোখ বন্ধ করে রাখলেন। বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন। তিনি যে প্রার্থনা করছেন না বা স্রষ্ঠাকে স্মরণ করছেন না সেটা সবাই বুঝলো। কেননা যে ব্যক্তি ত্রেহা সমীকরণ নামে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ভুল প্রমাণ করার মতো সমীকরণ প্রমান করে দেখালেন বিশ্ববাসীকে, আর সে জন্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ একাডেমি থেকে পুরষ্কার পেলেন, তিনি আর যাই হোক ঈশ্বরকে স্মরণ করতে পারেন না।
যথারীতি খুব আড়ম্বরের সাথেই শেষ হলো পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের আইডিয়াটা অনেক দিন থেকেই মাথায় ঘুড়ছিলো একাধারে গণিতবিদ এবং দার্শনিক ত্রেহার মাথায়। খুব ছোটবেলা থেকে। তার শৈশবটা কাটে খুব দুঃখ কষ্টে। মা মারা যান জন্মের পর পরই। বাবাও আর একটা বিয়ে করেন। দশ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর এক পর্যায়ে ত্রেহার জায়গা হয় পথে। এর পর বহু কষ্টেও তিনি কখনো ঈশ্বরের কাছে হাত পাতেন নি। এতো বছরের জীবনে তিনি কখনো প্রার্থণায়ও বসেন নি। ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকতো তাহলে সে তার প্রিয় সৃষ্টিকে কখনোই এতো কষ্টে রাখতো না। ছোট বেলা থেকেই এই বিশ্বাসটা তার ভেতর কাজ করে গেছে। আজ দর্শনশাস্ত্রে ত্রেহা পৃথিবীর সেরা দশজনের একজন হয়েছেন, ত্রেহাম নামে গণিতের একটা নতুন শাখা এখন তার নামে যেটা অপ্রমাণিত রাশিমালার মান বের করতে ব্যাবহার করা হয়। ষষ্ঠঘাত ত্রিমাত্রিক রাশিমালার অন্যতম প্রবক্তাও তিনি। এর সবই তার একান্ত পরিশ্রম আর চেষ্টার ফল। সে সফলতার জন্য তিনি ঈশ্বর নামে অপ্রমাণিত একটি অস্তিত্বের প্রতি একটুও কৃতজ্ঞতা বোধ করেন না।
পুরষ্কার নিয়ে আর গোটা দশেক টিভি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি যখন বাসায় ফিরলেন তখন অনেক রাত। আজ তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম দিনগুলির মধ্যে একটি। তার প্রমাণিত ঈশ্বরের অস্তিত্ব যে মিথ্যা সে সংক্রান্ত সমীকরণটি স্বীকৃতি পেলো আজ। প্রথমদিকে এই ত্বত্তটি প্রমাণ করতে তাকে যে কি পরিমান বেগই পেতে হয়েছে। প্রবল বিরোধিতার ধাক্কা আসে ধর্ম যাজকদের কাছ থেকে। অবশ্য এসবকে গণিতবিদ ত্রেহা তেমন একটা পাত্তা দেন না।অবশেষে তিনি যখন ত্রিমাত্রিক রাশিমালায় ঈশ্বরকে একটি রাশি ধরে তার মান শূণ্য প্রমান করেন, তখন সবাইকে মানতে হয় যে আসলেই ঈশ্বর বলে কেউ নেই।
ত্রেহা তার পরিচারিকা রোবটটিকে রাতের খাবার দিতে বললেন। রোবটিকে ত্রেহা নিজেই প্রোগ্রাম করেছেন। এমনিতে চেহারা আর গড়নে তার মাঝে রোবট রোবট ভাব থাকলেও নিহা নামের এই রোবটটিই ত্রেহার সবসময়ের সঙ্গী। মাত্র গতকাল তিনি নিহার মাঝে ঈশ্বরের অননস্তিত্বের লজিকটি লোড করেছেন। এই সাধারন তৃতীয় মাত্রার রোবটিও এখন ত্রিমাত্রিক রাশিমালার সমীকরন দিয়ে প্রমাণ করে ফেলতে পারে যে ঈশ্বর বলে কেউ নেই। রাতের খাবার শেষ করে ঘুমোনোর আগে ত্রেহা কিছুক্ষন নিহার সাথে এ বিষয়ে আলাপও করলেন।
শেষরাতের দিকে হঠাৎ ত্রেহার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। পুরো পৃথিবী দুলছে।তার ঘর, বুকশেলফ সবকিছু দুলছে। ভুমিকম্প। ত্রেহা দৌড়ে বের হতে চেষ্টা করলেন ঘর থেকে। কিন্তু তার আগেই তার উপর ছাদটা ধ্বসে পড়লো।
যখন জ্ঞান ফিরলো, ত্রেহা তখন একস্তুপ বালি,ইট,রড আর সিমেন্টের নীচে চাঁপা পড়ে আছেন। একটু নড়তেই টের পেলেন তিন আটকে গেছেন। পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা। পায়ের উপর ছাদের একটা বীম এসে পড়েছে। সম্ভবত পা'টা গুড়িয়ে দিয়েছে। অসহ্য ব্যাথায় কাতড়াতে কাতড়াতে তিনি লক্ষ করলেন, স্তুপের বাইরে তার পরিচারিকা রোবট নিহা দাড়িয়ে আছে। সম্ভবত তাকে খুজছে। তিনি আশার আলো দেখতে পেলেন। তিনি চিৎকার করে ডাকলেন,
-নিহা আমাকে বের করো।
-মহামান্য ত্রেহা, আমি আপনাকে সনাক্ত করতে পেরেছি। আপরার প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয়েছে।আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দশ দশমিক শূণ্য তিন ভাগ।
-তারপরও আমাকে বের করার চেষ্টা করো। ঈশ্বরের দোহাই লাগে।
-আপনি অত্যন্ত অবাস্তব কথা বলছেন মহামান্য ত্রেহা। ঈশ্বরের অস্তিত্ব বলে কিছু নেই। যে নেই তাকে নিয়ে কথা বলারও কোন মানে নেই। আপনার পাশের স্তুপে একটি শিশু আটকে পড়ে আছে। তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা চল্লিশ দশমিক আট ভাগ। যেহেতু আপনার চেয়ে তার বেঁচে থাকার সম্ভবনাই বেশী, তাই আমি তাকেই উদ্ধার করবো।
ত্রেহা দু'চোখে অন্ধকার দেখে। এই তৃতীয় মাত্রার রোবটকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। হঠাৎ করে আবার পুরো পৃথিবী দুলে উঠে। ত্রেহার উপরে জমে থাকা স্তুপ আরো নেমে আসে তাকে চাপা দিতে। ত্রেহা চিৎকার করে বলতে থাকে 'হা ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করো। ঈশ্বর আমাকে রক্ষা করো।'
প্রচন্ড যন্ত্রনায় ঈশ্বরকে ডাকতে ডাকতে ত্রেহা শুনতে পায়, রোবটটি বলছে 'আপনি অত্যন্তু অযৌক্তিক কথা বলছেন মহামান্য ত্রেহা। ঈশ্বর বলে কেউ নেই। যে নেই তার কছে সাহায্য চাইছেন কেন মহামান্য ত্রেহা'
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০০৯ বিকাল ৩:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


