তুমুল কাজ চলছে অফিসে। সকাল ০৯:৩০ বাজে। রানাকে ইনফর্ম করলাম কুইক আসো। রানা ১০ মিনিটের মধ্যেই অফিসে এসে হাজির। আশ্চর্য মনে হচ্ছে? ভাবছেন ঢাকা শহরের এমন উন্নতি কবে হলো? না আশ্চর্য হবার কিছু নেই। ওর বাসাটা অফিসের নিচেই। আর আমি ভোর সাতটায় এসে অফিসের শেষ চাপটা কমাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। হঠাৎ করেই আগামীকালের একটা শ্যূটিং ট্যূর পড়ে গেলো। রানা অফিসে তার এ্যাসাইন্ড কাজগুলো শুরু করলো। কাজ করতে করতে বলল- স্যার, সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কাজ করতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। বললাম- বিরতি দিয়ে করতে থাকো। বলল- না স্যার কাজ আমি করতে পারবো। কিন্তু মশা খুব কামড়েছে। শরীর জ্বালা করছে। বললাম- কেন? রানা চুপ করে রইল। মশারী ছাড়া যে রানা কখনো ঘুমাতে পারে না জানি। সেই রানাকে মশা কামড়ালো কেন? তাছাড়া বেশীরভাগ সময় সে-ই মশারী টানায় শুনেছি। অথচ মশা কামড়ালো সারা রাত! ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করলাম।
চুপ করে কাজ করে যাচ্ছে রানা। কিছুক্ষণ পর পর কল বেজে উঠছে ওর মোবাইলটায়। একটু পর পর বাইরে বের হয়েও যাচ্ছে। বললাম- কোনো সমস্যা? - না স্যার কোনো সমস্যা নেই। - কিন্তু কিছু একটা তো আছে মনে হচ্ছে। - না স্যার ও কিছু না। আবারো বাইরে বের হলে কলটা ধরতে ধরতে। ফিরে এসে কাজে হাত লাগাতেই আবারো কল। এবার তার মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে বলে উঠল- বললাম তো অফিসে? বললাম তো। অফিসেই ছিলাম, সারা রাত কাজ করেছি। আরে বাবা কাজ থাকতে পারে না? দেখো অনেক হয়েছে। আর কোনো জবাব আমি দিতে পারবো না। আমি অফিসে কাজ করছি। অযথাই সন্দেহ করছ কেন? ঠিক আছে স্যারের সাথে কথা বল। মিথ্যা বললাম না কি সত্য যাচাই কর।
এবার বুঝে গেলাম যে কি হয়েছে। রানা, এদিকে এসো। কি হয়েছে বলতো? - স্যার কাল আসলে বাসায় যেতে পারিনি আমি। বাইরে এক গ্যারেজে ঘুমিয়ে রাত কাটিয়েছি। - বল কি? কেন? - আর বলবেন না স্যার, বউ খালি সন্দেহ করে। আমি সারাদিন কি করি? কার সাথে কাজ? শ্যূটিং না কি কারো সাথে সিটিং করি এইসব আর কি। কিন্তু দেখেন স্যার, আপনি সবসময় দেখেন আমি কাজ ছাড়া একমুহূর্তের জন্যও অফিসের বাইরে যাই না। সব সময় ছুটির দিনগুলোতে বাসাতেই থাকি। বউয়ের আবদার মেটাই। তারপরও কিভাবে আমার পক্ষে অন্য কোনো নারীকে সময় দেয়া সম্ভব?
সন্ধ্যে প্রায়। রানাকে ছুটি দিলাম। এদিকে আমার বউ আজ সকালেই অফিসে আসার সময় বলে দিয়েছে- আমি যেন আর বাসায় না ফিরি। কাজের মেয়েকে বলে দিয়েছে- যা, ওকে বাইরে বের করে দিয়ে আয়। আর যেনে কোনো দিন বাসায় না ফেরে। ওর সাথে এটাই শেষ। অনেকবার শেষ করার চেষ্টা করেছি, এবার এটাই ফাইনাল। কি করব? এই রকম খুব ছোট-খাট বিষয় নিয়ে অনেক বার অনেক কিছু হয়েছে। বিষয় বিচারে এগুলো একদমই কিচ্ছু না। অথচ বউ সাহেবান সবসময় সামাণ্য ফালতু বিষয় নিয়ে আমার সাথে বিবাদ লাগিয়েই রাখে। মনে হয় বিয়েটা বোধ করি ঝগড়া করার জন্যই করেছি।
বউকে হারমোনিয়ামে মাঝে মাঝে এই গানটাই শোনাই। "দু'একটা দিন যায় না রে ভালো/লাগে বড় গন্ডগোল/আমার লাভের মাঝে কি লাভ হইলো/গলাতে কলঙ্কের ঢোল"। বউ রাগ করে বলে- কি বললে কলঙ্কের ঢোল? তখন তো কতো বলেছিলে- তোমার জামা কেচে দেবো, নখ কেটে দেবো, চুল আঁচড়ে দেবো, মার্কেটে নিয়ে শপিং করে দেবো, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘোরাবো আরো কত কি? এখন কলঙ্কের ঢোল? বউয়ের এই সমস্ত কথাবাজির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের গালি তো ফ্রি আছেই। যাই হোক, কিচ্ছু বললাম না। চুপ করে চলে আসলাম। আসার সময় কাজের মেয়েটাকে বললাম- কি রে মাস শেষে তোকে বেতন কে দেয়? - স্যার আফনে। - তাহলে আমার কথা শোনা উচিৎ না কি তোর ম্যাডামের?
এবার রাত গভীর হতে থাকলো। শীতের রাত। আমি বাসায় ফিরতেই পারবো না। ফিরলে কি যে হবে তা বলে বোঝাতে পারবো না এই ব্লগে। ও আমার ব্লগও সার্চ করে, কি লিখেছি। কি ধরনের লেখা আমি ব্লগে লিখি। সেখানে কোনো নারীবাদী বা কোনো নারীর রূপে মুগ্ধ হয়ে কোনো লেখা লিখলাম কি না ইত্যাদি। রাত ১১:০০ টা। হঠাৎ কল। - ওই আসবি না বললাম। বাসে থাকলে এখই ফিরে যা। আজ ফুটপাতে ঘুমাবি। বুঝলাম, অন্য কেউ না এ আমার বউ।
গায়ে শার্ট, কোট আর জিন্সের প্যান্ট। ভাগ্যিস মাফলারটা এনেছিলাম। চেয়ারে যে রুমালটা বিছানো থাকে তা বিছিয়ে নিলাম সোফায়। যে ব্যাগটা সব সময় আমার সাথে থাকে তা মাথার নিচে বিছিয়ে দিলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অফিস বলে মশা খুব একটা নেই। যদিও এমন কোনো একটা রাত ছিল কি, মনে পড়ে না যে আমি মশারী ছাড়া ঘুমিয়েছি। আজ তাই হতে চলেছে। রাত্রে ফেইসবুকটায় একটু বেশীই সময় কাটালাম। রাতের খাবারের সময় পেরিয়ে গেলো। ততক্ষণে রাত ১:০০টা। পেটে মোচড় দিলো। বুঝলাম ক্ষুধা পেয়ে বসেছে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
শুন শান অফিস। কি আর করব? কিছুতেই ঘুম আসছিল না চোখে। ফেইসবুকের কোনো এক মহিলা লাশের নাকে তুলো গোঁজা ছবি বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। কয়েকবার কেঁপেও উঠলো শরীর। এতো বড়ো কমপ্লেক্সের একটা ফ্লোরের কোনো এক কামরায় এভাবে এক থাকা এতদম বুদ্ধিমানের কাজ হলো না ভাবছিলাম। কতকিছুই তো হতে পারে। এছাড়া প্রেসটিজের কারনে কাউকে কিছু বলিনিও।
গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গলো। মোবাইলটা অফ করা। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল হানাদার বাহিনীর মতো কেউ এসে আমাকে প্রাণ নাশ করবে না তো? যাক এবার মোবাইলটা অন করলাম। দেখলাম সকাল ৭:১৬ বাজে। নতুন আরেকটা দিন শুরু হলো। কোনো জ্যাম নেই। সময় ক্ষেপন নেই। ঝক্কি ঝামেলা কিচ্ছু নেই। বাহ্ এখন আমি অফিসে। আর নারী? এর সাথে আজ শুধু কেন, কোনো দিনও কি পেরেছি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

