ওবামার ভাষণ থেকে আমরা কিছু শিখতে পারি । কিছূ শিখতে পারি মনে করেই তার ভাষণ নিম্মে দেওয়া হলো।
- একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মুসলমানদের উদ্দেশে তার দেশের নীতিনির্ধারণী বক্তৃতার শুরুতে আসসালামু আলাইকুম বলে সম্ভাষণ জানিয়েছেন। নিজের ইসলামি যোগসূত্রের উল্লেখ করে মানবসভ্যতায় এর অবদান ও শান্তির দিকটি টেনে বলেছেন, উগ্রপন্থীরা ইসলামের ধারক নয়। ইতিহাসের সত্য ঘেঁটে বলেছেন, মুসলমানদের প্রতি পশ্চিমাদের ভীতি অমূলক। আমেরিকার গণতান্ত্রিক ভিত ও মানবিকতার ঐতিহ্য স্মরণ করে এ দেশ সম্পর্কে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোরও তাগিদ দিয়েছেন। ইসলাম নিয়ে নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে লড়াই করারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার কায়রোতে দেওয়া বারাক ওবামার এই বক্তৃতার ভাষান্তর করেছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন।
বারাক ওবামা:
শুভ বিকেল। অনন্তকালের এই কায়রো নগরীতে আসতে পেরে এবং দুটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অতিথি হতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আল আজহার ইসলামী শিক্ষাদীক্ষার প্রতীক হয়ে আছে; এবং এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মিসরের অগ্রসরতার উৎসভূমি হয়ে আছে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়। একত্রে এ দুুইটিকে মিলিয়ে আপনারা ঐতিহ্য এবং প্রগতির মধ্যে সমন্বয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমি আপনাদের এবং মিসরের জনগণের আতিথেয়তায় কৃতজ্ঞ। একইসঙ্গে মার্কিন জনগণের এবং আমার দেশের মুসলিম স�প্রদায়ের শুভেচ্ছা নিয়ে আসতে পারায় আমি গর্বিত: আসসালামু আলাইকুম।
যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে মহা-উত্তেজনার এক কালে আমরা মিলিত হয়েছি -- এই উত্তেজনার শিকড় ঐতিহাসিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রোথিত, যা আজকের দিনের যে কোনো নীতিনির্ধারণী বিতর্কের অনেক উর্ধ্বে। ইসলাম এবং পশ্চিমের সম্পর্কে শত শত বছরের সহাবস্থান এবং সহযোগিতা ছিল, কিন্তু একইসঙ্গে সংঘাত ও ধমর্যুদ্ধও ছিল। নিকট অতীতে, উপনিবেশিকরণের মধ্য দিয়ে আবারও উত্তেজনা উসকে উঠেছে, যে উপনিবেশিকরণ বহু মুসলিমের অধিকার এবং সুযোগকে অস্বীকার করেছিল এবং একটি স্নায়ুযুদ্ধ যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর আশাআকাক্সক্ষার মূল্য না দিয়ে তাদের কেবলই একটি বিকল্প হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। তদুপরি আধুনিকতা এবং বিশ্বায়নের বল্গাহীন পরিবর্তনের ধারা অনেক মুসলিমের মধ্যে এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে যে পশ্চিম ইসলামী রীতিনীতির প্রতি বৈরী।
সহিংস চরমপন্থিরা এসব উত্তেজনাকে ব্যবহার করে মুসলিমদের একটি ক্ষুদ্র হলেও শক্তিমান অংশের মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলা এবং বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতায় লিপ্ত হতে এসব চরমপন্থির লাগাতার চেষ্টা আমার দেশের কিছু মানুষকে এমন ভাবতে শিখিয়েছে যে, ইসলাম আবশ্যিকভাবে শুধু আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি বৈরী নয় বরং মানবাধিকারের বিষয়েও বৈরী। এসবই আরও ভীতি এবং অবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে।
যতোদিন পর্যন্ত আমাদের পার্থক্য দিয়ে আমাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হবে ততোদিন আমরা কেবল তাদেরই শক্তিশালী করে যাব যারা শান্তির বদলে ঘৃণার বীজ বপণ করেছিলেন, যারা সহযোগিতার বদলে সংঘাত উসকে দিয়েছিলেন; যেই সহযোগিতা আমাদের সব জনগণকে ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারতো। সন্দেহ এবং বিরোধের এই পরিক্রমার অবসান হতেই হবে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্কের এক নব-সূচনা চাইতে আমি এখানে এই কায়রোতে এসেছি, যে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থ এবং শ্রদ্ধার এবং যা এই সত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে যে, আমেরিকা ও ইসলাম একরোখা নয় এবং তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজন নেই। বরং তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই মৌলনীতিতে বিশ্বাসী --ন্যায়বিচার এবং প্রগতির নীতি; সহিষ্ণুতা এবং সব মানুষের মর্যাদার নীতি।
আমি এটা স্বীকার করি যে, রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমি জানি আজকের এই ভাষণ নিয়ে অনেক প্রচার হয়েছে, কিন্তু একটিমাত্র ভাষণে বহু বছরের অবিশ্বাস দূর করা যায় না। আর যেসব জটিল প্রশ্ন আজকে আমাদের এখানে মুখোমুখি করে দিয়েছে তার উত্তরও আমি আজকের এই বিকেলে আমার হাতে যতোটুকু সময় আছে তাতে দিতে পারব না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, অগ্রসর হতে হলে আমাদের অবশ্যই একে অন্যের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে হবে, সেইসব কথা যা আমরা প্রায়শই বুকের মধ্যে পুষে রাখি কিংবা দরজা বন্ধ করে ফিসফিস করে বলি। একে অন্যের কথা শোনার জন্য, একে অন্যের কাছ থেকে শেখার জন্য, একে অন্যকে শ্রদ্ধা করার জন্য এবং একটি ঐকমত্য খোঁজার জন্য আমাদের লাগাতার চেষ্টা থাকা উচিত। যেমনটা পবিত্র কোরান আমাদের বলেছে, "আল্লাহকে মনে রাখ এবং সর্বদা সত্য কথা বল।" আজকে আমি সেই চেষ্টাই করব -- যতোটা সম্ভব সত্য বলব, আমাদের সামনে যে কাজ পড়ে আছে তার প্রতি ঐকান্তিক থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে শক্তি আমাদের বিভক্ত করে রাখে তার চেয়ে মানব সন্তান হিসেবে আমাদের সাধারণ স্বার্থ অনেক বেশি শক্তিশালী।
এই বিশ্বাসের অনেকটাই আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত। আমি একজন খ্রিষ্টান, কিন্তু আমার বাবা একটি কেনীয় পরিবারের সন্তান যারা বংশানুক্রমিকভাবে মুসলিম। শৈশবে আমি ইন্দোনেশিয়ায় বহুবছর কাটিয়েছি। ভোরের আলো ফোটার আগে আর সন্ধ্যা নেমে আসার সময় আজানের ধ্বনি আমার কানে গিয়েছে। যুবক বয়সে আমি শিকাগোতে এমন স�প্রদায়গুলোর মধ্যে কর্মজীবন পার করেছি যেখানে অনেকেই মুসলিম বিশ্বাসের মধ্যে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও শান্তি খুঁজে পেয়েছেন।
ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি এটাও জানি যে, সভ্যতা ইসলামের কাছে কতোটা ঋণী। এই আল আজহারের মতো বিদ্যাপীঠগুলোতে জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখে ইসলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানের আলোকে বয়ে নিয়ে গেছে এবং ইউরোপের 'রেনেসাঁ' ও 'আলোকপ্রাপ্তি'র পথ তৈরি করে দিয়েছে। অনেক কিছুই মুসলিম স�প্রদায়ে সৃষ্টি হয়েছে -- যারা অ্যালজেব্রার সূত্রগুলো আবিস্কার করেছে তারা মুসলিম স�প্রদায়, আমাদের চৌম্বকীয় কম্পাস ও দিকনির্ণয়ের যন্ত্রপাতি, আমাদের লিখনী ও ছাপাছাপি, কীভাবে রোগ ছড়ায় আর কীভাবে তা সারিয়ে তোলা যায় এ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া এ সবই মুসলিম স�প্রদায় থেকে আমরা পেয়েছি। ইসলামি সংস্কৃতি আমাদের চমৎকার খিলান আর সুউচ্চ সব মিনার উপহার দিয়েছে, চিরন্তন কাব্য ও মোহনীয় সঙ্গীত উপহার দিয়েছে, নিপুণ ক্যালিগ্রাফি এবং আত্মাকে শান্ত করার মতো অনেক স্থান উপহার দিয়েছে। আর ইতিহাসজুড়ে ইসলাম বাণীতে ও কর্মে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং জাতিগত সাম্যের সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে।
আমি এটাও জানি যে আমেরিকার গল্পের সঙ্গে সবসময়ই ইসলাম জড়িয়ে ছিল। আমার দেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম দেশ হল মরক্কো। ১৭৯৬ সালে ত্রিপোলি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় আমাাদের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস লিখেছিলেন, "মুসলিমদের আইন, ধর্ম অথবা শান্তিময়তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শত্র"তা নেই।" আর প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকেই আমেরিকান মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করেছে। তারা আমাদের যুদ্ধে লড়েছে, তারা আমাদের সরকারে কাজ করেছে, তারা নাগরিক অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছে, তারা ব্যবসা গড়ে তুলেছে, তারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়িয়েছে, তারা আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে নৈপুণ্য অর্জন করেছে, তারা নোবেল পেয়েছে, আমাদের সর্বোচ্চ ভবনটি তৈরি করেছে এবং আমাদের অলিম্পিক মশাল প্রজ্জ্বলন করেছে। কিছুদিন আগে যখন একজন কংগ্রেসের প্রথম আমেরিকান মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হলেন তখন তিনি কোরান ছুঁয়েই আমাদের সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন, তিনি ওই কোরানটি ব্যবহার করেন যা আমাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা টমাস জেফারসন তার নিজের পাঠাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন।
এভাবে আমি ইসলামের এই উৎসভূমিতে আসার আগেই তিনটি মহাদেশে ইসলামকে জেনেছি। এই অভিজ্ঞতা আমার মধ্যে এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছে যে, আমেরিকার সঙ্গে ইসলামের অংশীদারিত্ব হবে ইসলাম যা তার ভিত্তিতেই, ইসলাম যা নয় তার ভিত্তিতে নয়। এবং যেখানেই একঘেয়ে নেতিবাচক ইসলাম আবির্ভুত হবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করাকে আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার দায়িত্বের অংশ মনে করি।
কিন্তু আমেরিকা সম্বন্ধে মুসলিম ধারণাও একইভাবে পরিবর্তিত হতে হবে। মুসলিম মাত্রই নিষ্ঠুর এই একপেশে ধারণা যেমন সত্য নয়, তেমনি আমেরিকাও একটি নিষ্ঠুর একপেশে আত্মকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য নয়। বিশ্ব আগে কখনোই দেখেনি এমন অনেক প্রগতির অন্যতম মহান উৎস হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। একটা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়েই আমাদের জন্ম হয়েছে। সব সৃষ্টিই সমান - এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই আমরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছি এবং আমাদের দেশের সীমানায় এবং বিশ্বজুড়ে এই বাণীকে অর্থবহ করে তোলার জন্য আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী সংগ্রাম করে গেছি। পৃথিবীর সব প্রান্তের সব সংস্কৃতির সমন্বয়েই আমরা গড়ে উঠেছি এবং একটা সাধারণ অবধারণায় নিজেদের উৎসর্গ করেছি। তা হল - 'ই প্লুরিবাস উনোম' অর্থাৎ "অনেকের সমন্বয়ে, এক"।
আর এখন এ ঘটনা সবাই জানে যে, বারাক হুসেন ওবামা নামধারী একজন আফ্রিকান-আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারে। কিন্তু আমার গল্পটা খুব আলাদা কিছু নয়। আমেরিকায় আসা সব মানুষের জন্যই স্বপ্নের সম্ভাবনা হয়তো সত্যি হয়নি, কিন্তু যারা আমাদের তীরে এসে ভেড়ে তাদের সবার জন্যই ওই প্রতিশ্র"তি বিদ্যমান; আমাদের দেশে আজকের দিনের প্রায় ৭০ লাখ আমেরিকান মুসলিমও এদের মধ্যে আছেন; যারা আমেরিকার সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি মাত্রায় উপার্জন করছেন এবং শিক্ষা অর্জন করছেন।
উপরন্তু, আমেরিকায় স্বাধীনতার ধারণাটি ধর্মচর্চায় ব্যক্তির স্বাধীনতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এ কারণেই আমাদের এ ইউনিয়নে প্রতিটি রাজ্যেই মসজিদ আছে এবং আমাদের সীমান্তের ভেতরে সেই সংখ্যা ১২ শ'রও বেশি। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে সরকার আদালতে গিয়ে মহিলা ও তরুণীদের হিজাব পরার অধিকার রক্ষা করেছে এবং যারা এই অধিকার অমান্য করবে তাদের শাস্তির বিধান করেছে।
তাই এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ না থাকুক যে - ইসলাম আমেরিকার অংশ। আর আমি বিশ্বাস করি আমেরিকা তার মধ্যে এই সত্যকে ধারণ করে যে, জাতি-ধর্ম কিংবা আবাস যাই হোক না কেন আমাদের সবারই সাধারণ লক্ষ্য -- শান্তি ও নিরপত্তায় বসবাস করা, শিক্ষা অর্জন করা এবং মর্যাদার সঙ্গে কর্মসংস্থান লাভ করা, আমাদের পরিবার-স�প্রদায় এবং স্রষ্টাকে ভালবাসতে পারা। আমরা সবাই এসব চাই। এটাই বিশ্ব মানবতার আশা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

