ধুম ধাম ধুম।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

১০ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৩৮

শেয়ারঃ
0 0 0

লেভ লেন্ডু হচ্ছে সবচে' বিখ্যাত ফিজিসিস্টদের একজন। ওর জন্ম ১৯০৮ সালে বাকুতে, আজারবাইজানে - সেই সময়টায় সেটা ছিল রাশিয়ান এমপায়ার এর একটা অংশ। আর ওর বয়স যখন ১৯ তখন ও ভার্সিটির সব পড়াশুনা শেষ করে সে পিএইচডি করতে শুরু করলো। তারপর যখন ওর বয়স ২১ হলো, তখন সে রীতিমত একজন ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া মানুষ।

লেভ লেন্ডু তার জীবণের বেশিরভাগ সময় থিওরিটিকাল ফিজিক্স এ গবেষণা আর পড়ানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোন কারণ ছাড়াই ১৯৩৮ সালে স্তালিন লেন্ডুকে জেলে পুরে রেখেছিল পুরো একটা বছরের জন্য। লেন্ডু সুপারফ্লুইডিটি নিয়ে ওর গবেষণার জন্য নোবেল পায় ১৯৬২ সালে।

লেন্ডুর একটা স্কেল ছিল - উইকিপিডিয়াতে সেটা নিয়ে লেখা
Landau kept a list of names of physicists which he ranked on a logarithmic scale of productivity ranging from 0 to 5. The highest ranking, a 0.5, was assigned to Albert Einstein. A rank of 1 was awarded to 'historical giant' Isaac Newton, Satyendra Nath Bose, Eugene Wigner, and the founding fathers of quantum mechanics, Niels Bohr, Werner Heisenberg, Paul Dirac and Erwin Schrödinger. Landau ranked himself as a 2.5 but later promoted himself to a 2.

সত্যেন্দ্রনাথ বসু নামটা খুব চেনা চেনা লাগলো। ক্লিক করলাম। আর খুব অবাক হয়ে গেলাম।

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্ম কলকাতায় আর পড়াশুনা প্রেসিডেন্সি কলেজে। ওই সময় সেখানে জগদীশ চন্দ্র বসু এর মত মানুষজন কাজ করতো। যাদের কাছে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য সবচে' বড় গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসগুলোর একটা ছিল, বড় কিছু করার সামর্থ্যে বিশ্বাস করা এবং বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাওয়া।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু কিছুদিন কলকাতা ভার্সিটিতে কাজ করলো, তারপর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে শুরু করলো। ১৯২৪ সালে যখন সে একজন রিডার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে, (আমি ঠিক জানি না রিডার মনে কি) - সে প্লাংকের কোয়ান্টাম রেডিয়েশন ল নিয়ে একটা পেপার লিখলো, পুরোপুরি প্রথাগত চিন্তা থেকে ভিন্ন পথে। কিন্তু কিছুতেই কোথাও ছাপাতে পারলো না ওর পেপার। তারপর কি ভেবে আইনস্টাইনকে পাঠিয়ে দিলো খামে ভরে। আইনস্টাইন তখন জার্মানিতে থাকতো, তো একদিন ভোরে আইনস্টাইন ঘুম থেকে উঠে মেইলবক্স খুলে চোখ বড় বড় করে দেখলো এই কান্ড। সে দেখলো জিনিসটা খুব একটা হাবিজাবি কিছু না - খুব খাঁটি রকমের গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস, তো আইনস্টাইন করলো কি - বসে বসে নিজের হাতে পুরো জিনিসটা জার্মানে অনুবাদ করলো। তারপর একটা ভয়াবহ বিদঘুটে নামের (Zeitschrift für Physik) খুব-বেশি-বাড়াবাড়ি রকমের প্রেস্টিজিয়াস একটা জার্নালে পাঠিয়ে দিলো বসুর পক্ষ থেকে।

সেই জার্নাল সেটা ছাপালো। এটা ছাপানোর পর মানুষ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে চিনতে শুরু করলো। তো তখন সে ইউরোপে ঘুরতে গেলো আর দু'বছর মারি কুরি, আইনস্টাইন টাইপের মানুষজনের কাজ টাজ করে দেশে ফিরে আসলো ১৯২৬ সালে। তারপর একটা সময় সে প্রফেসর হলো, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করতে থাকলো ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত।

তারপর যখন ভারত পাকিস্তান আর ইন্ডিয়াতে ভাগ হয়ে গেলো, আর সবাই মারামারি কাটাকাটি শুরু করলো তখন সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতায় ফিরে গেলো আর সেখানে পড়াতে শুরু করলো - ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সে বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে কাজ করতো।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু সম্বন্ধে উইকিপিডিয়া তে লেখা আছে
Apart from physics he did some research in biochemistry and literature (Bengali, English). He made deep studies in chemistry, geology, zoology, anthropology, engineering and other sciences. Being an Indian of Bengali descent, he devoted a lot of time to promoting Bengali as a teaching language, translating scientific papers into it, and promoting the development of the region.

তুমি যখন খুব বড়সড় সাইজের মানুষজন নিয়ে পড়বে, একটা বড় জিনিস আলাদা করে চোখে পড়ে - তারা খুব বেশি বকবক করে সময় নষ্ট করতো না। পত্রিকার পাতায় প্রতিমাসে একই ধরণের কান্নাকাটি লিখে দেশকে গালমন্দও করতো না। কোন ধরণের চেষ্টাও করতো না, মানুষের কাছে নিজেকে মহৎ ও জ্ঞানী প্রমাণ করতে। এবং বাংলাদেশে জন্ম বলে কোন হীনমন্যতা তাদের মধ্যে কাজ করতো না, ওয়েস্টার্ন হবার প্রবল চেষ্টাও তাদের মধ্যে ছিল না।

বড়সড় মানুষগুলো শুধু খুব ভালো করে জানতো, তাদের কাছে কি গুরুত্বপূর্ণ, এবং তারা ঠিক কি করে পৃথিবীতে তাদের জন্য বরাদ্দ সময়টুকু খরচ করতে চায়। এবং তাদের সবাই আমাদের ভাষাটাকে খুব ভালোবাসতো। সত্যেন্দ্রনাথ বসু হয়তো এখন ঢাকায় ফিরে আসলে খুব অবাক হতো, যে আমাদের জাতীয় প্রোগ্রামিং কন্টেস্ট - যেখান কোন বিদেশীই থাকে না, সেখানে আমরা মাইকের সামনে গেলেই আমাদের ভাঙা ভাঙা খ্যাত চাষাভুষা টাইপের ইংরেজি দিয়ে প্রবল উৎসাহে ইংরেজি বলার চেষ্টা করি। আমরা এখনো আমাদের জাতীয় প্রোগ্রামিং অলিম্পিয়াড আয়োজন করি একটা বিদেশী ভাষায় - যেটার উদ্দেশ্য হচ্ছে - ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী এখনো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়নি এমন ছেলেপুলেদের মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স এবং প্রোগ্রামিং নিয়ে আগ্রহ জাগানো। আমরা সেখানে তাদেরকে ডেকে এনে বলি, "গর্দভ! ইংরেজি জানো না?"। যেখানে ইংরেজি জানাটা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না একদমই - আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে যারা খুব ভালো করে, সবাই নিজ নিজ ভাষায় প্রশ্ন অনুবাদ করে নেয় - পোলিশ, রাশান, চাইনিজ - সবাই! এটা আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোর একটা ট্র্যাডিশন।

আমরা মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবার জন্য অ্যামেরিকানদের অ্যাকসেন্টে ভরভর করে ইংরেজি ছেড়ে দেই। আর মোটামুটি অর্থহীণ গরিমা নিয়ে খুব খুশি হয়ে যাই, নিজেদেরকে অনেক জ্ঞানী ভেবে।

যখন একটা আস্ত জাতি ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ভুলে যেতে থাকে আর অন্য কিছু হবার চেষ্টা করে আর বড় বড় শক্ত কথা বলে জীবন পার করে দেয় আর ভিনদেশীদের কাছে দেশের ভাবমূর্তি বড় করা নিয়ে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আর যাই হোক, তাদের কাছে আশা করা যায় না - যে তারা বুঝতে পারবে পৃথিবীতে কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর কিসের কোন গুরুত্বই নেই।

একটা পরমাণুকে নিয়ে কুটিকুটি করে ভেঙে ফেললে আমরা আরো কিছু ছোট কণা পাই - সেগুলোর একটার নাম বোসন। বোসন হচ্ছে ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস অনেক ধরণের ফিল্ডে - যার একটা হচ্ছে সুপারফ্লুইডিটি - যেটার উপর গবেষণা করে লেভ লেন্ডু নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলো। এই কণাটার নাম দেয়া হয়েছে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে, বোসনের উপর তার কাজের সম্মানে। নোবেল প্রাইজ দেয়ার সময় ওরা এক ধরনের কাটাকুটি করে নেয়, দেখার জন্য যে কোন গবেষণা মানব সভ্যতার জন্য আসলেই কাজে লাগছে কিনা প্রত্যক্ষভাবে। সে কারণে যদিও বোসন এর উপর গবেষণা করে অনেকেই নোবেল প্রাইজ পেয়েছে - সত্যেন্দ্রনাথ বসু কখনো নোবেল পায়নি।

কিন্তু কে বলতে পারে, হয়তো নোবেল প্রাইজ তার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। যে মানুষটা মোটামুটি বিখ্যাত হয়ে ইউরোপে গিয়ে মারি কুরি(দুইটা নোবেল প্রাইজ) কিংবা আইস্টাইন(একটা নোবেল প্রাইজ) জাতীয় প্রাণীদের সাথে গবেষণা টবেষণা করার পরও দেশে ফিরে আসে, তারপর বসে বসে বাংলা ভাষায় সায়েন্টিফিক পেপার অনুবাদ করতে থাকে আর পড়াতে থাকে ধুমায়ে, সেরকম একটা মানুষের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের লিস্টি আমাদের চে' ভিন্ন হবে, এটা আর এমন অস্বাভাবিক কি?

 

প্রকাশ করা হয়েছে:   বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ২:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১১ ই জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:১৪
সোহায়লা রিদওয়ান বলেছেন: লেখাটা তুমি প্রথম পাতায় দিলেনা কেন ফাহিম ?? এটা দিতে ... আর সবাই পড়তো ! দেবে আবার ?
১১ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৫:৪৩

লেখক বলেছেন: জ্ঞানী মানুষজন এসে কমেন্ট করতো - যেটা দেখে মনে হতো - ক্যান লিখলাম?

নাহ কখনো দিবো না।

২. ১১ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ১২:৪৯
সোহেল কবির বলেছেন: অসাধারণ ! ! ! ! +++++ দিলাম।
৩. ১২ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১:১২
ছন্নছাড়ার পেন্সিল বলেছেন: লেখক বলেছেন: জ্ঞানী মানুষজন এসে কমেন্ট করতো - যেটা দেখে মনে হতো - ক্যান লিখলাম? নাহ কখনো দিবো না।

ক্ষেপে টম্যাটো লাল টুকটুক! হা হা হা!

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৬৭০ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
..
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ