রাত ৯.৩০মিঃ, জুলাই ২১, ২০১১. ইন্দিরা রোড, ইমা মটরস্ এর সামনে:
আমি ও আমার একজন বন্ধু ফার্মেগেইট থেকে মোহাম্মদপুর আসার জন্য একটা ই-বাইক এ উঠলাম। এ সমস্ত ই-বাইক গুলি সাধারণত রাত আটটার পর থেকে আমাদের মত কিছু অসহায় যাত্রীদের নেওয়ার জন্য আসে (আমার জানা মতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে এইগুলি অবৈধ)। যাই হোক এই বৈধ অবৈধ এর ইতিহাস আরও অনেক বড়, অন্য কোন একদিন সেটা লিখব।
ফার্মেগইট থেকে মানিক মিয়ার দিকে একটু সামনে গিয়ে খেলার মাঠের কিছুটা আগে (ইমা মটরস এর সামনে) একটা রাস্তা আছে যেটা বাম দিকে মোড় নিয়েছে, সেখানে যেতেই আমাদের গাড়ীটা সামনে বড় লাল কিছু একটার ধামম্ করে ধাক্কা খেল। এমনিতেই ই-বাইকগুলি অনেক হালকা হয়, তার উপর এত জোরে ধাক্কা। সামনে একজন এবং ভিতরে চারজন যাত্রী উলট-পালট খেয়ে সোজা হলাম। সামনে দেখলাম বাংলাভিশন এর একটা মাইক্রবাস, ভিতরে দুইজন যাত্রী।
ততক্ষনে আমাদের ড্রাইভার নেমে গিয়ে ঐ গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে এবং আমাদের গাড়ীর অন্য তিন যাত্রীও নেমে গেছে। আমি এবং আমার বন্ধু গাড়ীর ভিতরেই বসে রইলামম কেননা আমি সাধারণত এইসমস্ত বিষয় পারতঃপক্ষে এড়িয়ে চলি। গলাটা বের করে দেখলাম ঐ তিনজন যাত্রীও বাকবিতন্ডায় লিপ্ত। ভিতর থেকে ক্ষতিপূরণ জাতীয় কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম। এরপর দেখলাম দুইজন হোন্ডারোহী ঐ মাইক্রর পাশে এসে দাড়াল। যিনি ড্রাইভ করছিলেন, দেখতে যথেষ্ট কাল, চুলগুলো মেয়েদের মত পেছনে রাবার দিয়ে আটকানো। কিছু লোক থাকে যাদের প্রথম বার দেখলেই বুকের ভিতরটা হিম হয়ে যায়। জিন্সের প্যন্ট, কালো কুচ কুচে চেহারা (আমার ধারণা এইরকম বিভৎস ফেস তারা ইচ্ছা করেই করে রাখে যাতে সাধারন মানুষ ভয় পায়), অতিরিক্ত সিগারেটের আগুনে পোড়া কয়লার মত ঠোট (আল্লাই জানে, প্রেম কেমনে করে), সব মিলিয়ে দেশের সর্বাধীকারীর ভাব নিয়ে কথা বলা শুরু করল এবং তার সফল চেহারার গুনে ক্ষনিকের মধ্যেই সবাই তাকে ঘিরে দাড়িয়ে গেল তার সিদ্ধান্ত শোনার জন্য এবং সবার সাথে আমিও। কাছে দাড়াতেই দেখলাম তার হোন্ডার মাথায় এনটিভি লেখা। স্বভাবতই একটু সাহস পেলাম এই ভেবে যে, মিডিয়ার লোক, মাস্তান বা সন্ত্রাসী টাইপের কেউ নয়। তার উপর উনার পেছনে যে আরোহী ছিল তিনি অনেক ভদ্র এবং মার্জিত লোক বলে মনে হল।
এই বার বিচার শুরু হল। কাল চুলো তখন মোবাইলে কয়েক জায়গার বলছে এইখানে আসার জন্য। এবং ফাকে ফাকে জিজ্ঞাসা করছে " হ্যা ! তো কি অইছে। গাড়ীতে লাগছে তো কি, ক্ষতিপূরন দিতে অইব।" আমি মনে মনে প্রমদ গুনলাম, কারণ এটি অন্য সুর। বাংলাভিশনের ড্রাইভারের দোষ এইটা প্রত্যক্ষদশীরা সবাই বলতে পারবে, কারন তারা সংকেত না দিয়ে ডানের রাস্তায় ঢুকে পড়েছিল। যাই হোক, কাল চুলো বলে যাচ্ছে " আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বাংলাভিশনের অফিসে চল তোমার গাড়ী আমরা ঠিক করে দিব আর তুমি আমাদের গাড়ী কোথায় ঠিক করাইয়া দিবা সেখানে চল"। আমি দেখলাম মহুর্তেই আমাদের ড্রাইভারের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল কেননা ঐ মাইক্রর গেইট যেটুকু ভচ্কাইছে তাতে তার ই-বাইক বেচা লাগতে পারে, সে বলল" বস আমি গরিব মানুষ, আপনারা যে সমাধান করেন আমি মাইন্যা নিব।" কাল চুলোর পেছনে ভদ্র ছেলটি আস্তে ইশারা দিল যেন আমাদের ড্রাইভার দ্রুত কেটে পড়ে, কাল চুলো তখনো তার মোবাইলে ব্যস্ত। ড্রাইভার ই-বাইক ষ্টার্ট দিতেই আমরাও গাড়ীতে উঠে বসলাম। এরইমধ্যে কালচুলো সামনে এসে দাড়ীয়েছে এবং বলছে "ঐ পোলাগুলা কই? ক্ষতিপূরণ দিমু তো"। বলেই আমাদের পাশে এসে বলল "এই তোরা নাম" তারপর আমাদের দিকে ধাক্কা (ধাক্কাটা আস্তে হলেও আমার ভিতরে বেশ জোরেই লাগল) দিয়ে বলল "নামেন সবাই"। আমি বললাম " আমরাও", সে বলল "হ্যা! সবাই"। আমরা নামতেই ই-বাইক একটানে উধাও।
নেমে দেখলাম আরো একটা হোন্ডা এসেছে এবং একজন মাঝবয়সী লোক দাড়ীয়ে আছে। কাল চুলো ঐ তিনজন ছেলেকে টান দিয়ে পাশে নিয়ে গেল। আমরা ভিড়ের ভিতরেই রইলাম। কে যেন শুনলাম আওয়াজ দিল "বাকিগুলা কই"। ততক্ষনে আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করেছে। আমি শুধু আমার বন্ধুকে বললাম " তুই হাটা দে, ঐ মোড়ে গিয়া দাড়া"। কিন্তু আমার বেকুব বন্ধু এক পা'ও নড়ল না। হঠাৎ ঠাস্ ঠাস্ শব্দ শুনতে পেলাম, তাকিয়ে দেখলাম ছেলে তিনটিকে পেটানো হচ্ছে এবং এই সৎকর্মটি ঐ কাল চুলো নিজেই করছে। ১ থেকে দুই মিনিট আমি নিজে চিন্তা করলামঃ আমি কোন অন্যায় করিনি, তবে চলে যাব কেন, আবার মনে হল না গেলে পরের সিরিয়াল আমাদের আসবে। কিন্তু ঐ ছেলে গুলিও তো কোন অন্যায় করেনি। তাদের গাড়ি অন্যায়ভাবে আমাদের গাড়িকে মেরেছে, এর জন্য ক্ষতিপূরণ এর কথা আসতেই পারে। তার জন্য তাদেরকে কয়েক'শ লোকের সামনে পেটানো হচ্ছে এবং তারা বার মাফ চাইলেও চড় থাপ্পড় বন্ধ হচ্ছ না। পেটানোর ফাঁকে ফাঁকে তাদের পরিচয় জানানো হচ্ছে যে, তারা মিডিয়ার লোক, তাদের যাকে খুশি পেটাতে পারে, এবং এই জন্য তাদের কিছু হবে না। আমার মনে হচ্ছিল এদের পরে এরা আমাদের ও পেটানোর ইচ্ছা পোষন করতে পারে। দুই একটা চড় থাপ্পড়ে হয়ত আমার শারীরিক কোন ক্ষতি হবে না কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে অনকেখানি ছোট হয়ে যাব। দাড়িয়ে দাড়িয়ে নিজেকে অনেক অসহায় মনে হল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আমার মত গোটা ১৫ কোটি লোকই অসহায়। কখনও পুলিশের কাছে, কখনো রিক্সাওয়ালার কাছে, কখনও সিএসজি, কখনও সরকারী অফিসের কর্মকতা বা পিয়ন, কখনও রাজনৈতিক নেতা বা নেতার পোষা ক্যাডার, কখনো বাজার দর, কখনো ইউনিপের বা যুবক এর মত কম্পানী, কখনো ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট, কখন শেয়ার বাজার . . . . . এই লিষ্ট মনে হয় শেষ হবার জিনিষ নয়, তাই আর চিন্তা করলাম না। আরো একবার ভিতরের দিকে তাকালাম, তখনও তারা উন্মাদের মত ছেলে তিনটকে পেটাচ্ছে। এক মহূর্তে মনে হল এইখান থেকে বের হতে হবে। আর কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা হাটা ধরলাম খেলার মাঠের দিকে। খেয়াল করলাম আমার বন্ধুটিও আমার পিছু নিয়েছে। সোজা মাঠের পাশে গিয়ে রিক্সা নিলাম। পুরোটা রাস্তা আমরা তেমন কোন কথা বলিনি। আমি চেষ্টা করছিলাম অন্য কথা বলে বন্ধুটিকে সহজ করার জন্য, কিন্তু একটা ফাঁক যেন থেকেই যাচ্ছিল। অনেক গুলি প্রশ্ন মনের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
আমি কি পালিয়ে নিজের ঠুনকো সম্মান বাচালাম? আমি কি পারতাম ওদের জন্য প্রতিবাদ করতে? ওখানে তো আরো অনেক লোক ছিল, তারা কি পারত? নাকি, তারাও আমার মত ঠুনকো সম্মান বাচানোর জন্য চুপচাপ ছিল। ঐদিন রাত্রে ঘুমাতে কষ্ট হয়েছিল, শুধু এটকা খটকা লাগছিল, আমি কি ঠিক কাজ করলাম? যদি ঠিক না করি তবে কি করলে ঠিক হত?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

