আমি আমদানির পক্ষে।
অন্তত সাময়িকভাবে হলেও আমি এর পক্ষে।এর পেছনে একটা স্বপ্ন আছে।
আসলে অনেক কথা বলতে চাই, গুছিয়ে বলতে পারবো কিনা জানিনা।তাও চেষ্টা করি।
প্রথমেই বলে রাখি এটা কোনো কাউন্টার পোস্ট নয়।এখানে যা বলেছি, তার সবই যে আমদানীর পক্ষে উপস্হাপিত যুক্তি, তাও না।বেশিরভাগই আমার উপলব্ধি।
*সবাই বলছে হিন্দি মুভি আসলে কেউ আর বাংলা মুভি দেখবে না।অনেকেই কলকাতার অল্টারনেটিভ স্ট্রীমের মুভিগুলো দেখেন, কখনো মেইন স্ট্রীম মুভিগুলো দেখেছেন?আমি বেশ কয়েকটি দেখেছি।এই বছরখানেক আগেও কলকাতার মুভি ইন্ডাস্ট্রী প্রায় মৃতবৎ অবস্হায় ছিলো।অথচ এখন কি রমরমা অবস্হা!এর কারণ কি? টলিউডের যখন চরম দুঃসময়, তখন কিন্তু হিন্দি মুভি দেখানোও বন্ধ করেনি, তাদের মূলধারার নির্মাতারা থেমে থাকেননি।তারা মুভি বানিয়ে গিয়েছেন।চেষ্টা করেছেন।কখনো সফল, কখনো ব্যার্থ হয়েছেন।এখন পশ্চিম বাংলায় বলিউডের মুভির সাথে পাল্লা দিয়ে টলিউডের মুভি চলে।বাচ্চাকে সারাজীবন কোলে তুলে রাখলে কিন্তু বাচ্চা হাঁটতে শিখবে না।ওরা পারলে আমরা কেন পারবো না?
আর বাংলাদেশে কি হচ্ছে?একটু বেয়াদবী করি, আমাদের দেশের নায়করাজ বলেছেন, "এদেশের মানুষ ভালো ছবি দেখে না!" কোন মুভি আমাদের নায়রাজের মনে এমন বেদনার সৃষ্টি করলো?
---"কোটি টাকার ফকির"।যে ছবির নায়ক তার ছেলে সম্রাট।
একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমি কি জানতে চাইতে পারি, ঠিক কোন অপরাধের কারণে সম্রাটকে আমাদের সহ্য করতে হবে?বাংলাদেশে একজন নায়ক হতে চাইলে যে কোন গুণ থাকলেই চলে (অভিনয়/ফাইটিং/নাচ/নায়িকাকে কোলে তুলতে পারা
টলিউডের মুভি দেখার পর মনে হয়েছে, টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বাদ দিলে, কাহিনীগত দিক থেকে আমাদের চলচিত্রের সাথে খুব বেশি পার্থক্য নেই।অপু বিশ্বাস আর কোয়েল মল্লিকের অভিনয় একই মানের।শুনলে হাসি আসবে, তবে এটা সত্যি যে, দেব এর চে শাকিব খান ভালো অভিনয় করে।তারপরও বাংলাদেশের মাণুষ এই মুভিগুলো খুব পছন্দ করে।মফঃস্বলগুলোতে মুম্বাই-ঢাকার মুভির চে টালিগন্জের মুভি বেশি চলে।এরকম মুভি আমরা বানাতে পারি না?
কলকাতার নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ হিন্দিতে কথা বলে, শুধুমাত্র হিন্দি মুভি দেখে।তারপরও তাদের ইন্ডাস্ট্রী টিকে আছে, বেশ ভালোভাবে টিকে আছে।একটা নমুনা দেই।
ওদের মিউজিক ভিডিওগুলো দেখলে মন খারাপ হয়।আমরা কবে এমন মিউজিক ভিডিও বানাতে পারবো?বাজেট স্বল্পতার কথা সবাই বলবে।সেখানে আমার একটা কথা আছে।টলিউডের এই ধরণের মুভির দর্শক শুধুমাত্র মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্তরা।আমাদের দেশে মুভির দর্শক কি কম আছে?পশ্চিম ভারতের জনসংখ্যা নয় কোটির কম, আমাদের পনেরো কোটির বেশি।মূল কারণ কি বাজেট স্বল্পতা?
*"মনের মাঝে তুমি" থেকে "মনপুরা" এদের সফল্যের পেছনে চারটি পয়েন্ট পেয়েছি ("হৃদয়ের কথা" আর "খোঁজ-দ্য সার্চ" এই মুভি দুটোও হিসেবে রাখলাম)।
১.ভালো গান (অসম্ভব, অসম্ভব ইফেক্টিভ ফ্যাক্টর)
২.সুন্দর গল্প (এক্সট্রা-অর্ডিনারী কিছু না।একটু ডিসেন্ট স্টোরীলাইন পেলেই মাণুষ খুশি)
৩.ভালো প্রিন্ট (শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্যি।সবাই ভালো প্রিন্ট প্রেফার করে)
৪.ভালো লোকেশন (এফ.ডি.সি. আর কক্সবাজারের সী-বিচ দেখতে দেখতে মাণুষ ক্লান্ত)
একটু তুলনামূলক আলোচনায় যাই:
১.কলকাতায় সিনেমার হিট গানগুলো একজনমাত্র সুরকারের করা- জিৎ গাঙ্গুলী।আমাদের দেশে মিউজিশিয়ানের অভাব নেই।
২.কলকাতার মুভির সাথে আমাদের দেশের গল্পের খুব পার্থক্য নেই।
৩.এই পয়েন্টে একটু পিছিয়ে আছি।কিন্তু এটা অসম্ভব কোনো ব্যাপার না।নির্মাতাদের সদিচ্ছাই মূল।
৪.বাংলাদেশে অসংখ্য সুন্দর লোকেশন আছে।প্রয়োজন পড়লে নেপাল-ভুটানেও যাওয়া যায়।নাটকের শুটিং ব্যাংককে হয়, অথচ সিনেমার শুটিং হয় কারওয়ান বাজারে মাছের আড়তের পাশে।
উল্লখিত মুভিগুলো খুব ভালো ব্যবসা করেছে।একটু কষ্ট করে, সমান্য বেশি টাকা খরচ করে, মুভি বানালে সে মুভি যদি হিট হয়, তাতে ক্ষতি কি বুঝিনা।যারা এই ঝুঁকিটা নিয়েছেন, তারা কিন্তু সফল হয়েছেন।আমাদের দেশের বেশ কিছু সিনেমা হলে গিয়ে দেখেছি।সত্যি কথা বলতে কি, আড়াই ঘন্টা নার্ভের উপর যে অত্যাচার চলে তার কোনো তুলনা হয়না।মানুষ কেন টাকা দিয়ে "মেহের নিগার" টাইপ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাবে?
ফ্রিডম অফ চয়েজ, ভোক্তা অধিকার এই শব্দগুলো তবে কি অর্থহীন?এমন না যে, দর্শক ভালো মুভি ফিরিয়ে দিচ্ছে।তবে, কিসের এতো ভয়?আধিপত্য হারানোর আশংকা?
*বাজেট স্বল্পতার কথা যখন চলেই আসলো, তাই বলছি ইরানী মুভিগুলো কত টাকা দিয়ে বানানো? টাকা কখনো মেধার পরিপূরক হয়না।আর অজুহাত দিতে চাইলে সেটারও কখনো অভাব হয়না।স্বীকার করছি, বাংলাদেশে স্বীকৃত কোনো ফিল্ম ইন্সটিটিউট নেই (কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সে সুযোগ আছে।কিন্তু সেখানকার অনেকের স্বপ্নের পরিধি ফিল্ম মেকার না, অ্যাড ফিল্ম-মেকার হবার মাঝেই সীমাবদ্ধ), কিন্তু অসম্ভব ভালো কিছু নির্মাতা আছেন (শ্রদ্ধেয় আলমগীর কবির'র শিষ্য), তারা কি করছেন? কম-বেশি সকলেই ফিল্ম মেকিং শেখানোর বাণিজ্য লিপ্ত।আমি একবার একটা ফিল্ম কোর্সের খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম।দুই লেভেল মিলিয়ে তাদের কোর্স ফি ছিলো ৫৫ হাজার টাকা!
*খুব স্বাভাবিকভাবেই দেশের ইকনোমির ব্যাপারটিও চলে আসবে।আমি জানিনা বাংলাদেশে কয়জন মাণুষ লাক্সের বদলে তিব্বত সাবান ব্যবহার করেন।তবে, বছরদুয়েক আগে বি.এস.টি.আই. -এর এক হিসেবে দেখা গিয়েছে, এক বছরে বাংলাদেশে ১২৫ কোটি লাক্স বিক্রি হয়।পরের চারটি সাবান কোম্পানি সম্মিলিতভাবেও এর ধারে-কাছে নেই (সরকারকে প্রদেয় ট্যাক্স আর কর্মীদের বেতন, এসব "ইউনিলিভার বাংলাদেশ" এর অ্যানুয়াল টার্ণওভারের তুলনায় কিছুই না)।তবে কি, বাংলাদেশ থেকে ইউনিলিভারকে তুলে দিবো?তাহলে কিন্তু পুরো টাকাটাই দেশে থাকবে।
নির্মাতারা ভালো মুভি বানাবেন না আবার বিদেশী মুভিও দেখতে দিবেন না, এ কেমন একগুঁয়েমী!৪০ বছর কি যথেষ্ট সময় নয়?এই অবরোধের সুবিধা নিয়েই কিন্তু নির্মাতারা গা ছাড়া মনোভাব নিয়ে মুভি বানিয়েছেন, মধ্যবিত্তদের হলছাড়া করেছেন।
*টলিউডের সাম্প্রতিককালের সবচে ব্যবসাসফল মুভি হলো "পরাণ জ্বলিয়া যায় রে"।যেটা কিনা "নামাস্তে লন্ডন" মুভির কপি।মাত্র দুই বছর আগের বানানো হিট মুভি, সবাই কেন পাগল হয়ে দেখলো?
কোনো এক শুক্রবারে বসুন্ধরায় একটি মুভি দেখতে গিয়েছিলাম।মুভির নাম মনপুরা।দুপুরে গিয়ে দেখি সন্ধ্যা ৭টারও টিকিট নাই, সব হাউসফুল।পাশের হলে রেম্বো-৪ চলছিলো।সেখানে মরুভূমিসম জনশুণ্যতা।সেদিন আমি মুভিটা দেখতে পারিনি, কিন্তু অদ্ভূত ভালো লাগা নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম।একটা বাংলা মুভি "হাউসফুল"!(এই প্রজন্মের কয়জনের ভাগ্যে এই লেখাটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে?) প্রায় অপরিচিত কাস্টিং (ফারহানা মিলিকে বাংলাদেশের কয়জন মাণুষ চিনতো?)-এর একটা মুভি কেন এতো জনপ্রিয়তা পেলো?
আমার মতে এর একটাই কারণ। সাধারণ মাণুষ এখনো নিজের ভাষায় মুভি দেখতে পছন্দ করে।ঢাকার মানুষের শুক্রবারে ঘুরতে যাবার কোনো জায়গা নেই।এজন্যই নারী-শিশু মেলা থেকে শুরু করে সি.এন.জি.-মেলাতে অবাক করা ভীড়।এই পটেনশিয়াল মার্কেটটাকে কি কাজে লাগানো যায় না?
*ডিজিটাল চলচিত্র নিয়ে অনেক স্বপ্নের কথা শুনি।সেই ডিজিটাল চলচিত্রের কি অবস্হা? মোর্শেদুল ইসলাম মনের ভুলে একটা ডিজিটাল মুভি বানিয়েছিলেন (প্রিয়তমেষু)।সেই চলচিত্র কিন্তু তিনি ডিজিটাল ফর্মেটে রিলিজ করে বেশিদিন চালাতে পারেননি।চলচিত্র শিল্পের কিছু সংগ্রামী মাণুষ সব হল মালিকদের চিঠি দিয়ে সাবধান করে দিলেন, "যেন মোর্শেদুল ইসলামের মুভি না দেখানো হয়"।
পরে মোর্শেদুল ইসলাম সমিতির সাথে রফা করে মুভি রি্-রিলিজ দেন।
আর তাকে বাধা দিয়েছিলো কারা? যারা এখন টিভি-তে গম্ভীর মুখে "বাংলাদেশের চলচিত্রকে বাঁচাতে হবে" টাইপ ভাষণ দেয়, সেই "চাষী-কাজী-নান্টু-ঝন্টু-মিজু-মিন্টুরা।
*নির্মাতাদের অনেক দুষলাম।এবার একটু নিজেদের কথা, আমাদের দর্শকদের কথা বলি।আমি যেখানেই, আমদানির পক্ষে কথা বলতে গিয়েছি, ব্যপক সমালোচনা শুনেছি (এই ব্লগেই একবার একটা পোস্ট লিখে দু-একজনের চ্রম গালি খেয়েছিলাম)।পরিচিত একজন তো রাজাকার বলেছে (হিন্দি সিনেমা আমদানির পক্ষে কথা বলে, কিভাবে রাজাকার হওয়া যায়, এই ব্যাপারটা বুঝিনি।অনেকেই ব্যাপারটিকে দেশপ্রেমের সাথে গুলিয়ে ফেলেছেন।দেশকে ভালবাসার আরো ১০১টি উপায় আছে।ট্যাক্স দেওয়ার মাধ্যমে আমরা সেটা শুরু করতে পারি)।ভালো লাগে, আমাদের দেশের সবাই বাংলা সিনেমাকে এতো সাপো্র্ট করে।
আমি নিজে ছোটবেলা থেকে বড় পর্দার ভক্ত।একটু সময় পেলেই সিনেমা হলে ঢুকে পড়ি।"আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা" থেকে "অবুঝ বৌ" এসবই হলে গিয়ে দেখেছি।বেশিরভাগ সময়েই দেখেছি, স্ক্যাজুয়েলড্ টাইমে মুভি শুরু হয়নি।একটাই কারণ, দর্শক নেই (কোরাম পূর্ণ হয়নি আরকি
কেন "রাবেয়া" সিনেমা হলগুলোতে এক সপ্তাহই কমপ্লিট করতে পারেনা।হল মালিকদের বাধ্য হয়ে, পাঁচ বছরের পুরনো "ট্রান্সফর্মারস ১" দেখাতে হয়?
কেন ডিভিডি -এর দোকানগুলোতে হিন্দি মুভির হল প্রিন্ট দেদারসে বিক্রি হয় (হল প্রিন্টে মুভির ছবি, ডায়ালগ, গান কিছুই বোঝা যায় না।তারপরও মাণুষ পাগল হয়ে কিনছে।কিসের এতো তাড়া!)।
হিন্দি মুভির বাজার এখন বিশ্বজুড়ে।অথচ খোদ দক্ষিণ ভারতে হিন্দি মুভির বাজার নেই।সেখানকার মাণুষ হিন্দি বুঝেনা, সে চেষ্টাও করেনা।এমন না যে, সে মুভিগুলো খুব উন্নতমানের।নির্মাতারা যেমন বুঝে দর্শক কি চায়, দর্শকরাও তেমনি হলে গিয়ে মুভি দেখে।
*শেষবার যখন আমদানীর কথা হলো, তারপর ১ বছর পার হয়ে গিয়েছে।এর মাঝে আমাদের চলচিত্রের কি উন্নতিটা হয়েছে?তখন "কানা মামা" শাকিব খান ছিলো।এখন সেই কিং খানের মুভিও মাণুষ দেখছে না।এই বছরের প্রথম ৬ মাসে কয়টি মুভি বের হয়েছে? শেষ ১ বছরে কিন্তু আরও বেশ কয়েকটি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
যদি সাময়িকভাবে বিদেশী মুভিগুলো প্রদর্শন করা হয়, তবে অন্তত সিনেমা হলগুলো বেঁচে যাবে।নতুন করে কোনো হল বন্ধ হবে না।আর দর্শকদের আকৃষ্ট করতেই, হল মালিকরা হলের পরিবেশ ভালো করবে।মধ্যবিত্তেরও হলে যাওয়ার অভ্যাসটা গড়ে উঠবে।নইলে, এখন যেভাবে চলছে, একসময় মিউজিয়াম মার্কা দুই-একটা সিনেমা হল ছাড়া সবই বন্ধ হয়ে যাবে, হতে বাধ্য।অদূর ভবিষ্যতের কোনো এক দুঃসময়ে, বছরে যদি দুটি মুভিও তৈরী হয়, সে মুভিগুলো দেখবো কোথায় (যদি সিনেমা হল-ই না থাকে)?
হলগুলোকে বাঁচানো একটা বড় চ্যালেন্জ।কোনো সিনেমা হলের জায়গায় একবার একটা মর্কেট গড়ে উঠলে, পুনরায় সেখানে হল তৈরী হবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।আর ঢাকার মতো জায়গায় নতুন কোনো হল নির্মাণ করা কতকটা অসম্ভবই বটে।
আমি বলছি না হিন্দি মুভি চলতেই থাকবে।২ বছর হিন্দি মুভি এনে দেখা যাক।নইলে তো "অবরোধ" -এর অপশন আছেই।ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক মিষ্টি সিরাপ না, তেতো কুইনাইন।হলগুলোকে বাঁচাতে কিছুদিনের জন্য এই তেতো ইন্ডিয়ান মুভিগুলোই না হয় গিল্লাম!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০১১ রাত ৯:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



