প্রিয়...
কেমন আছিস তুই? অনেক দিন হলো তোকে লিখি না। পুরোনো কিছু বিষয়ের সাথে নতুন কিছু আশয়ের মিশ্রনে লেখা চিঠিখানা শুরু করলাম-
আমি ঘুঘু চরা মাঠেই চরতে যেতাম। হাঁটতাম, মাঝে মাঝে দৌড়ানোর চেষ্টাও করতাম। কখনো পারতাম, আবার কখনো পারতাম না। তুই তখন আমাকে খুব জ্বালাতন করতি। একা থাকতে দিতে চাইতি না। কতো অনুনয় বিনয় করেও তোর থেকে আলাদা হতে পারতাম না। অথচ আমি প্রাণপনে চাইতাম ঘাসের সাথে একা থাকতে। ঘাসের প্রতি আমার দুর্বলতা ছোটকাল থেকেই, যখন আমাদের কাজের ছেলে ফকিরা গরুর জন্য সবুজ ঘাস কেটে আনতো। আনমনা হয়ে গরুর সেই ঘাস গ্রহণ খেয়াল করতাম। সৌন্দর্যকে কেমন করে ছিবিয়ে ছিবিয়ে খায়! গরুর প্রতি জন্ম নেয়া রাগ থেকে গরুর দুধ পর্যন্ত দুধ খেতাম না। তুই সেটাও বুঝতে চাইতি না। চাইতি শুধু বারবার জন্ম নিতে।
মাঠে আসতাম ঘাঁসকে বাঁচিয়ে রাখতে। কেউ যেন তাকে হত্যা করতে না পারে। অথচ তুই আসতি পঙতি নির্মাণ করতে। আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে এক একটি নতুন চরণ। দারুন বিরক্ত হতাম। বিচ্ছিরি লাগতো তোর সুড়সুড়ি। একদিন গভীর রাতে তোকে ঘুমিয়ে রেখে মাঠে গিয়েছিলাম। রাতদুপুরে ঘাসের ওপর সাপের সঙ্গম দেখে ভয় পেতেই পেছন থেকে গলা জড়িয়ে বললি, "ভয় পাসনে, আমি তোর সাথে"। খুব কৃতজ্ঞতা জানাতে ইচ্ছে হওয়ার আগেই ভাবলাম, "কবিতা বোধহয় ঘুমায় না, মরেও না! জেগে থাকার জন্যই বুঝি তার জনম!" সেদিন তোর সঙ্গ পেয়ে আমি কবি হয়েছিলাম। তখন মগজের ভিতর তোর জন্ম হচ্ছিলো একটু একটু করে। আমি যখন তোকে একটি আস্ত রূপ ধরাতে পারলাম, ততক্ষণে সাপগুলো চলে গিয়েছিলো। তাদের চলে যাবার পর আবার তোর প্রতি বিরক্তি এসে গেলো। আবারও তোকে বোঝা মনে হলো।
সে মাঠে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম তারও অনেক পর। গ্রামে তখন মানুষরা দলবেঁধে পায়রা পুষতো। এক কবিরাজ বাড়িতেই ছিলো কয়েকশ পায়রা। মোল্লাবাড়ির জালালী কবুতরগুলো আমার ভালো লাগতে না। কারণ সেগুলো সাদা ছিলো না। সাদা কবুতর দেখলেই আমি কামার্ত হতাম। খুব প্রেম এসে যেতো মনের ভিতর। সাদা পায়রাকে শক্তহাতের নরম মুঠে পুরে খসখসে গালে লাগাতেই আমি মরে যেতে থাকতাম প্রেমে প্রেমে। ঘুমে থেকে থেকে স্বপ্নও দেখতাম পায়রার সঙ্গ নিয়ে।
সেদিন বোধহয় খুব রোদ ছিলো। রোদেলা দিনের পড়ন্ত বিকেল খুব যৌবনাবতী হয়। সেই বিকেলে মাঠ থেকে গবাধিপশু তাড়াতে গিয়ে আমি সর্বনাশ দেখেছিলাম। সাদা পায়রাকে দেখেছিলাম ঘাসের গায়ে আলপনা আঁকতে। আচ্ছা, সাদা পায়রার রক্তের রঙ সাদা নয় কেন? ইস যদি তা সাদা হতো! সাদার গায়ে লালের অংকনে আমি শৈল্পিকতা খোঁজার সময় পাইনি। তার আগেই আমি শিশু হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের পানি মুছতে মুছতে মাঠ থেকে দৌড়ে পালিয়ে ছিলাম। কবিতা, সেদিন তোকে প্রশ্রয় দিইনি। একটি শব্দও জন্ম দেয়ার সুযোগন তোমাকে দিইনি।
দৌড়ের ওপর থেকে থেকে আজ আবার পথ ভুলে সেই মাঠে এসে গেছি। যেখানে তোর অবয়বের শুভ্রতার আবরণ এঁটে দেয়া বিশেষ কিছুর লুটোপুটি ঘাসের ওপর সাদা মরা লালের আলপনার চাইতেও বিদঘুটে দু:খ জড়ানো। এতক্ষনে আমার পিঠ চাপড়ে বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিস। বুনে যাচ্ছিস কিছু অম্লশ্রুতির কথামালা। "কবিদের ভাঙতে নেই" // "কবিরা ভাঙে না" // "তোমার জেগে থাকা দরকার" // "সামনে অনেক সম্ভাবনা" ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ আমি যখন বলবো, "আমিতো কবি নই, তবেতো আমার ভেঙে পড়াতে দোষ নেই"; তখনো তুই ধানাই পানাই করেই যাবি। আমি জানি তুই তা করবিই। কারণ কবিতাতো জেগে থাকার জন্য সৃষ্ট। মৃত মানুষের মাঝে বসত করার জন্য নয়, বখাটে কথনে খৈ ফোটার জন্যও নয়।
ভালো থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করিস।
তোর যাবতীয় কষ্টের অস্তিত্ব
বখাটে
১৪.১০.০৮
রাত : ১২.২০মি.
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মে, ২০১২ রাত ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


