একসাথে অনেকগুলো “প্রথম” এর লোভ সামলাতে পারিনি বলে তিরিং বিরিং করা মনটাকে ঘুরিয়ে আনতে সায় দিলাম। যাবো খুলনা, সাথে যাবে বন্ধু শীলা; উদীয়মান দার্শনিক। খুলনায় গিয়ে কি হবে আর না হবে সে ভাবনা পরে, যাত্রা যে খুব ইন্টালেকচুয়াল হবে- এই ভেবেই নাচানাচি শুরু হয়ে গেলো। এই প্রথম খুলনা যাবো, প্রথম ফেরী চড়বো, প্রথম পদ্মা নদী পার হবো, রূপসা সেতু দেখবো... এমন কিছু “প্রথম” টানাটানি শুরু করলো খুলনা যাবার সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথেই। কিন্তু ঈদের আগের দিন আমার এই দু:সাহস দেখে অনেকেই বাহাস করেছে। যাদেরকে বলেছি, সবাই ধরে নিলো আমি যেতে পারবো না। অথচ সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড গিয়ে ঠিকই গরীবের গাড়ি ফাল্গুনি পরিবহনের দু’টো টিকিট ম্যানেজ করলাম। যদিও আড়াইগুন বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে। বিকেল চারটায় টিকিট করলাম, অথচ গাড়ি ছাড়বে রাত সাড়ে আটটায়। অন্য কোন উপায়ন্ত না থাকার কারণে টিকিট কেটেই গাড়িতে উঠে বসে পড়লাম। দুর্নীতি পরায়ন পরিবহন কর্মকর্তা টাকা বেশি নিলেও বাস কিন্তু সময়মতোই ছেড়েছিলো। অবশ্য আমার হাতে ধরা ছিলো ফরহাদ মজহারের “ভাবান্দোলন”। ভাবের ভেতর আন্দোলিত হতে সমস্যা হয়নি, কারণ বন্ধু শীলা এখনও ভাব অপভাবের মাঝে খিঁচুনি নিচ্ছে। বিস্ফোরণ যে একটা হবে, এটা নিশ্চিত। তার অনুসন্ধিৎসু বাক্যবানে আমার বাঁচাল পরিচয়টা সুপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকলো। নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে স্টাবলিশ করার অমন সুযোগে কখনোই মই চালানো যায় না। আসলেই না।
খুলনা যাবার জন্য আরিচা হয়ে যাওয়াকে বুদ্ধিমানের কম্ম বলা হয়, কিন্তু মাইনক্যার চিপায় পড়ে মাওয়া ঘাট হয়েই যাচ্ছি আমরা। কারণ ফাল্গুনী পরিবহন মাওয়া পয়েন্টেই জল খায়। আর আমি মাওয়া ঘাটে ফেরীর জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে প্রিয় ইলিশের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে টের পেলাম মুখভর্তি লালা নিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুত হাঁটছি। তাজা ইলিশ কাটছে, তাজা তাজা ভাজছে। ইলিশ খাবো ইলিশ খাবো করে ইলিশের হোটেলে গিয়ে দেখি ভাজা ইলিশ সাজিয়ে রেখেছে বিভিন্ন পাত্রে। কি বিচিত্রইনা মানুষের ভক্তি! ঢাকা শহরে এভাবে সাজিয়ে রাখা হোটেলে কখনোই খেতাম বলে মনে হয় না। অপরিচিত মাওয়া ঘাটে বলেই হয়তো খেলাম। এক্কেবারে তিন পিস তেলে ভাজা ইলিশের সাথে ভাত মিশিয়ে খেয়ে নিলাম। খাচ্ছিলাম আর শীলাকে মনে মনে বকছিলাম। ইলিশ খাওয়ার প্রস্তাবে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে “না” করলেও আমার মনে হয়েছে সে ভুল করেছে। ইলিশ মিস করেছে। যদিও খুলনা গিয়ে খুব শক্তাশক্ত এ ধারনা ভেঙে গেছে।
ও! ফেরীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে তিনটি সেদ্দ ডিমও পেটকরণ করেছি। শীলাতো ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকে “উচ্চশ্রেনীর খাদক” বলে দিলো। আমি খুশিই হলাম। কারণ বেশি বেশি খাওয়ার বিষয়ে বৌ-বন্ধুর নির্দেশ আছে। গৃহপালিত স্বামী হবার পথে আরেকটু অগ্রসরমানতা টের পেয়ে খুব গর্ব বোধ করতে লাগলাম। যাক গে শালার! ঘরের খবরতো আর বাহির হচ্ছে না। এই ভেবেই নিশ্চিন্ত থাকি।
কিন্তু কোথায় রইলো ঘাট আর কোথায় রইলো ফেরী! সামনে অনেকদূর গিয়েও ফেরী ঘাটের কোন অস্তিত্ব পেলাম না। মানে আমাদের রোল নাম্বার অনেক শেষের দিকে। বুঝতে পারলাম মংগলের উপরে শনির দশা চলছে। তারোপর শুনেছি মাওয়া পয়েন্টে ফেরীতে অনেক সময় লাগে। প্রথমে পাড় ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়া ফেরী পরে একটি ইউ টার্ণ ক্রস করে ওপার যায়। এ পথের নতুন বলেই হয়তো বিরক্তবোধ করছি না। যদিও পাছে অনেক গোস্বা হচ্ছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা একটি পদ্মা সেতুর মালিক হতে পারলাম না। উত্থান আর অভ্যুত্থান করতে করতে আবুল থেকে মফিজ হতে থাকলাম এবং নির্বাচনের মার্কার বুলি আওড়াতে আওড়াতে খুচখুচে গলার শান্তি আনয়নে ম্যাটসিল ট্যাবলেট চুষতে থাকলাম। অপরদিকে পদ্মা নদীর অপর পাড়ের রাজনৈতিক নেতাদের গাড়ি শুমারীতে দেড় কোটি টাকা মূল্যের দশ বারোটি গাড়ির নাম্বার প্লেট চোখের সামনে এদিক সেদিক যাচ্ছে। টাকার কোন অভাব নেই, আর দারিদ্র্যেরও কোন ভাব নেই। দেশের এই মোখলেস পাবলিকরা তবুও ভোট কেন্দ্রে যাবে এবং তালগাছ কলাগাছে ভোট দিয়ে দেশে “গনতন্ত্র” সুপ্রতিষ্ঠিত করবে আর ড. ইউনুস, ফজলে হাসান আবেদরা বিখ্যাত সব পুরস্কার বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। দেশের মানুষের মাথার ভেতরে স্তুপ হয়ে থাকা গোবরগুলোকে মগজে রূপ দেয়ার জন্য কারো কোন মাথা ব্যথা থাকবে না। এদের বোধেরও উন্নতি নেই, নির্বোধেরও শেষ নেই।
কখনো কখনো নাকি ফেরীর জন্য অপেক্ষমান গাড়ির লাইন দেড় দু’কিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়। মানুষকে বসে থাকতে হয় তিন/চার/পাঁচ ঘন্টা। অবশ্য ঈদের মৌসুম বলেই হয়তো বেশি চাপ। কিন্তু আসলেই এ ধরনের অপেক্ষার মাত্রা নিতান্ত কম নয়। আমরা হারিয়ে ফেলছি প্রচুর কর্মঘন্টা, মুখোমুখি হচ্ছি অসম্ভব বিরক্তি আর ক্ষোভের। মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় “বালের দেশে বসবাস করছি”!
আমার পাশে শীলা বসে বসে ঘুমোচ্ছে। আধঘন্টারও কম সময় পরপর খুলনায় অপেক্ষমান বন্ধু শিমলার ফোন। জানতে চায় আপডেট। কখন গিয়ে খুলনা পৌছাবো। আমার আর বিরক্তির শেষ নেই। ফোনে টাকা রিচার্জের জন্য দোকান খুঁজে পাচ্ছি না। এরকম আমার মতো অনেকেই। মাওয়া পয়েন্টের মানুষের ব্যবসায়িক নলেজ নিম্মমানের। এরা বিপ্লবীও হতে পারবে না, পুঁজিবাদীও হতে পারবে না। অনেক এগিয়ে একেবারে ঘাঁটের কাছাকাছি গিয়ে একটি দোকান খুঁজে পেলাম। একগাদা টাকা ফোনের পেটে ঢুকিয়ে মনের সুখে শিমলার সাথে ন্যাকামি টকিং শুরু করলাম। টিনএজ প্রেমিক প্রেমিকার মতো দু’একবার ‘আই লাভ ইউ’ চালাচালিও হলো। কি আর করি বলুন, সময় যে আর কাটে না...!
ভ্রমনে যদি কোন কারণে বিরক্তি আসে, তবে মাথাব্যথা কনফার্ম। আর ব্যথাভর্তি মাথা নিয়ে রং চায়ের সাথে গোল্ডলীপের মজাটাই ভিন্নরকম। খুব মজা পাই। মজা নিতে নিতে আমাদের সামনে বাসের সংখ্যা ৫ গুনে গিয়ে গাড়িতে বসে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। পকেটে টাকার পরিমান খুবই কম- এমন কথা মনে উঠলে ঘুম যে আর আসে না! মিনিট বিশেক পরে চোখ বন্ধ রেখেই টের পেলাম আমাদের বাস আস্তে আস্তে ফেরীতে উঠছে আর আমিও ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলছি।
** অল্প কিছু ফটোসহ বাদ বাকি কথামালা পরের পর্বে সমাপ্ত হবে ইনশাহআল্লাহ!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





