somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পৌষ সংক্রান্তির ক্রান্তি লগ্ন

১৪ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পৌষ সংক্রান্তি বা পিঠা উৎসব শব্দটার সাথে আমি খুব ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। যুগ যুগ ধরেই পালিত হয়ে আসছে এই পৌষ সংক্রান্তি উৎসব। পৌষ সংক্রান্তি’র আগের রাতে পিঠাপুলি তৈরি করা হয় খুব যতœ করে তারপর দিন খুব ভোরে উঠে স্নান করা হয় এবং চুলোর পাশে বসে এই সব পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা।
প্রত্যেকটি বাঙ্গালী হিন্দু নারীই বোধহয় এ রাতে পিঠাপুলি তৈরি করে খুব যতœ করে; পরিবার ,আত্বীয় -স্বজন আর শিশুদের জন্য। ভিন্ন স্বাদের পিঠা আর মিষ্টান্ন তৈরির ধুম পড়ে যায় এ সময়। আমি এখনও গন্ধ পাই ছোটবেলার সেই পিঠা খাবার স্মৃতিগুলোর। কি ভয়ঙ্কর রকমের আনন্দ মেশানো ছিলো সে দিনগুলি আমার। মনে হলে হাসি পায় আবার চোখে জলও আসে।
মনে পড়ে,
সে বছর বন্যায় সব কিছু ভেসে যাবার পর আমাদের আর সোজা হয়ে উঠার কোন সুযোগই ছিলনা। বাবা তো সংসার চালাতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছিল তার উপর বাসাবাড়ি মেরামত করতে গিয়ে বেশকিছু টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অভাবের লাঙ্গল ঠেলতে ঠেলতে কি করে যে, পূজো পেরিয়ে পৌষ সংক্রান্তি চলে এসেছিলো বাবা বুঝে উঠতে পারেনি।
পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন মা,কে বললাম মা এবার আমাদের পিঠা বানাবে না; মা কিছু বললো না শুধু আমায় বললো সংক্রান্তি আসুক তখন দেখা যাবে; আমি বললাম কাল সকালেই যে সংক্রান্তি; মা চমকে উঠে বলল ও তাই নাকি তোর বাবাকে বিকালে বলে দেখি।
নাহ্ সেবার মা পিঠা তৈরি করেনি; কিন্তু আমার অবুঝ মন সেটা কি বুঝে আমি পাড়ায় সবার বাড়ি বাড়ি ঘুড়ে বেড়ালাম সবাই কি সুন্দর ঢেকিঁতে চাল কুড়ঁছে, কেউবা পিঠে তৈরি করছে আমার শুধু ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকা আর আফসোস করা। বিকেলে আমার ছোটটাকে কোলে নিয়ে বললাম জানিস বাবলি, এ বছর মা পিঠা বানাবে না; তুই আমি পিঠাও খেতে পাবোনা। বাবলি তো ছোট; আমার কথা বুঝতে পারতো না কিন্তু তার এ ভাইটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো ফ্যাল ফ্যাল করে।
সন্ধ্যায় আমার ঠোট ফুলিয়ে কান্না দেখে বাবা বলেছিলো ধূর বোকা এভাবে পিঠা’র জন্য কেউ কাদে, দেখিস এরপর টাকা পেলে তোকে আমি অনেক পিঠা খাওয়াবো ; আমি রাগে বলতাম ছাই খাওয়াবে; তুমি বলো কিন্তু তারপর আর নিয়ে আসোনা; তুমি আমার পচা বাবা; রুদ্রার বাবা কতো ভালো ওকে কতো কিছু কিনে দেয় তুমি শুধু আমায় মিথ্যে বলো; আমায় কিচ্ছু কিনে দাওনা তুমি আমার গরিব বাবা; আর গরিব বাবারা একটুও ভালো হয়না।
আমি দেখতাম বাবা লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো আর কাদতো; সেদিন আমার ছোট্ট হাতে বাবার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, বাবা আমি আর তোমায় এমন কথা বলবো না; আর পিঠা খেতে চাইবো না , তুমি যে রোজ সকালে আমাকে রুটি এনে দাও সেটাই খাবো। আমি তখন বুঝতাম না তবে এখন বুঝি বাবা’রও ভীষন কষ্ট হতো।

আমার ছোট বেলার পিঠা খাওয়ার আর একটা কথা মনে হলে আমার এখনও কান্না পায়
তখন কতইবা বয়স আমার সাত পেরুচ্ছে সবে, বড় রাস্তার মোড়ে হিরু মিয়ার ভাপা পিঠের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম অপলক চোখে; গরম ধোয়া উঠা সেই ভাপা পিঠে,যা মনে হলে এখনো জিভে জল আসে; পকেটে টাকা থাকতো না শুধু চেয়ে থাকাই ছিলো আমার সার ; কখনো বা হিরু মিয়া বলতো কি,রে পিঠা খাবি টাকা আনছস্ আমি বলতাম না; চোখ কটমট করে হিরু মিয়া বলতো যা ভাগ এইখান থাইকা .....
বাসায় ফিরে এসে আমার চোখের জলের বন্যা নামতো; মা’র আচল ধরে বলতাম মা একটা টাকা দাওনা পিঠা খাবো; মা আঁচলে মুখ লুকাতো কিছু বলতো না; কখনোও বা মা আমায় বলতো বাবা, রাস্তার পিঠায় কতো ধূলো বালি থাকে; এসব পিঠা খেতে নেই;
আমি মা’র কথা বুঝতে চাইতাম না, কাঁদতাম একটা ভাপা পিঠা খাবো বলে কখনোও বা কান্না জুড়ে দিতাম; আমার আজও মনে আছে সে,দিনটির কথা
রুদ্রা সেই বিকেলে চাদর গায়ে দিয়ে এসে ,বলেছিলো চোখের নিচে কালি কেন তোর আজ নিশ্চই আবার কেঁদেছিস তাই না; লজ্জায় আমার মাথাটা নিচু হয়ে গিয়েছিলো সেদিন।
রুদ্রা চাদরের তলা থেকে দু হাত ভরা পিঠা নিয়ে আসতো আমার জন্য; নে তোর জন্য; আমি আশ্চর্য হয়ে বলতাম আমার জন্য!
আমি নিতাম তবে!ছোট বেলায় কোন কিছু খেতে গেলেই কিছু রেখে দিতাম; তখন আমার ছোট বোনটা বাবলি সবে হামাগুড়ি দিতে শিখেছে মাত্র ওর জন্য।
রুদ্রাদের বাড়ির সামনে আমাকে রোজ একবার যেতে হতো প্রয়োজনটা যে আমারই ছিলো বেশি, আর তা হলো নোটবই ধার নেয়া আমার মনে হয় ও যদি সেই সময় আমায় ধার না দিতো তাহলে বোধহয় এ জীবনে এতদুর আসা সম্ভব হতোনা। রুদ্রা এখনো পৌষ সংক্রান্তি কিংবা অন্যান্য আয়োজনে আগের মতই এগিয়ে আসে আমাকে প্রেরণা দেয়।
আমি এবার পৌষ সংক্রান্তিতে যখন পিঠে হাতে নিয়েছি তখনি মনে পড়ে গেলো বাবা’র কথা “বাবু আমাদের যখন টাকা হবে তোকে আমি অনেক পিঠা খাওয়াবো”। আজ বাবা নেই। বাবা তার কথা গুলো পূর্ন করে যেতে পারেনি; কিন্তু আজ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে বাবা তুমি আমার গরিব বাবা নও; তুমি আমার ভীষন ভালো বাবা।

-----------সমাপ্ত---------

৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×