
পৌষ সংক্রান্তি বা পিঠা উৎসব শব্দটার সাথে আমি খুব ছোটবেলা থেকেই পরিচিত। যুগ যুগ ধরেই পালিত হয়ে আসছে এই পৌষ সংক্রান্তি উৎসব। পৌষ সংক্রান্তি’র আগের রাতে পিঠাপুলি তৈরি করা হয় খুব যতœ করে তারপর দিন খুব ভোরে উঠে স্নান করা হয় এবং চুলোর পাশে বসে এই সব পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা।
প্রত্যেকটি বাঙ্গালী হিন্দু নারীই বোধহয় এ রাতে পিঠাপুলি তৈরি করে খুব যতœ করে; পরিবার ,আত্বীয় -স্বজন আর শিশুদের জন্য। ভিন্ন স্বাদের পিঠা আর মিষ্টান্ন তৈরির ধুম পড়ে যায় এ সময়। আমি এখনও গন্ধ পাই ছোটবেলার সেই পিঠা খাবার স্মৃতিগুলোর। কি ভয়ঙ্কর রকমের আনন্দ মেশানো ছিলো সে দিনগুলি আমার। মনে হলে হাসি পায় আবার চোখে জলও আসে।
মনে পড়ে,
সে বছর বন্যায় সব কিছু ভেসে যাবার পর আমাদের আর সোজা হয়ে উঠার কোন সুযোগই ছিলনা। বাবা তো সংসার চালাতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছিল তার উপর বাসাবাড়ি মেরামত করতে গিয়ে বেশকিছু টাকা খরচ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অভাবের লাঙ্গল ঠেলতে ঠেলতে কি করে যে, পূজো পেরিয়ে পৌষ সংক্রান্তি চলে এসেছিলো বাবা বুঝে উঠতে পারেনি।
পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন মা,কে বললাম মা এবার আমাদের পিঠা বানাবে না; মা কিছু বললো না শুধু আমায় বললো সংক্রান্তি আসুক তখন দেখা যাবে; আমি বললাম কাল সকালেই যে সংক্রান্তি; মা চমকে উঠে বলল ও তাই নাকি তোর বাবাকে বিকালে বলে দেখি।
নাহ্ সেবার মা পিঠা তৈরি করেনি; কিন্তু আমার অবুঝ মন সেটা কি বুঝে আমি পাড়ায় সবার বাড়ি বাড়ি ঘুড়ে বেড়ালাম সবাই কি সুন্দর ঢেকিঁতে চাল কুড়ঁছে, কেউবা পিঠে তৈরি করছে আমার শুধু ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকা আর আফসোস করা। বিকেলে আমার ছোটটাকে কোলে নিয়ে বললাম জানিস বাবলি, এ বছর মা পিঠা বানাবে না; তুই আমি পিঠাও খেতে পাবোনা। বাবলি তো ছোট; আমার কথা বুঝতে পারতো না কিন্তু তার এ ভাইটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতো ফ্যাল ফ্যাল করে।
সন্ধ্যায় আমার ঠোট ফুলিয়ে কান্না দেখে বাবা বলেছিলো ধূর বোকা এভাবে পিঠা’র জন্য কেউ কাদে, দেখিস এরপর টাকা পেলে তোকে আমি অনেক পিঠা খাওয়াবো ; আমি রাগে বলতাম ছাই খাওয়াবে; তুমি বলো কিন্তু তারপর আর নিয়ে আসোনা; তুমি আমার পচা বাবা; রুদ্রার বাবা কতো ভালো ওকে কতো কিছু কিনে দেয় তুমি শুধু আমায় মিথ্যে বলো; আমায় কিচ্ছু কিনে দাওনা তুমি আমার গরিব বাবা; আর গরিব বাবারা একটুও ভালো হয়না।
আমি দেখতাম বাবা লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো আর কাদতো; সেদিন আমার ছোট্ট হাতে বাবার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, বাবা আমি আর তোমায় এমন কথা বলবো না; আর পিঠা খেতে চাইবো না , তুমি যে রোজ সকালে আমাকে রুটি এনে দাও সেটাই খাবো। আমি তখন বুঝতাম না তবে এখন বুঝি বাবা’রও ভীষন কষ্ট হতো।
আমার ছোট বেলার পিঠা খাওয়ার আর একটা কথা মনে হলে আমার এখনও কান্না পায়
তখন কতইবা বয়স আমার সাত পেরুচ্ছে সবে, বড় রাস্তার মোড়ে হিরু মিয়ার ভাপা পিঠের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম অপলক চোখে; গরম ধোয়া উঠা সেই ভাপা পিঠে,যা মনে হলে এখনো জিভে জল আসে; পকেটে টাকা থাকতো না শুধু চেয়ে থাকাই ছিলো আমার সার ; কখনো বা হিরু মিয়া বলতো কি,রে পিঠা খাবি টাকা আনছস্ আমি বলতাম না; চোখ কটমট করে হিরু মিয়া বলতো যা ভাগ এইখান থাইকা .....
বাসায় ফিরে এসে আমার চোখের জলের বন্যা নামতো; মা’র আচল ধরে বলতাম মা একটা টাকা দাওনা পিঠা খাবো; মা আঁচলে মুখ লুকাতো কিছু বলতো না; কখনোও বা মা আমায় বলতো বাবা, রাস্তার পিঠায় কতো ধূলো বালি থাকে; এসব পিঠা খেতে নেই;
আমি মা’র কথা বুঝতে চাইতাম না, কাঁদতাম একটা ভাপা পিঠা খাবো বলে কখনোও বা কান্না জুড়ে দিতাম; আমার আজও মনে আছে সে,দিনটির কথা
রুদ্রা সেই বিকেলে চাদর গায়ে দিয়ে এসে ,বলেছিলো চোখের নিচে কালি কেন তোর আজ নিশ্চই আবার কেঁদেছিস তাই না; লজ্জায় আমার মাথাটা নিচু হয়ে গিয়েছিলো সেদিন।
রুদ্রা চাদরের তলা থেকে দু হাত ভরা পিঠা নিয়ে আসতো আমার জন্য; নে তোর জন্য; আমি আশ্চর্য হয়ে বলতাম আমার জন্য!
আমি নিতাম তবে!ছোট বেলায় কোন কিছু খেতে গেলেই কিছু রেখে দিতাম; তখন আমার ছোট বোনটা বাবলি সবে হামাগুড়ি দিতে শিখেছে মাত্র ওর জন্য।
রুদ্রাদের বাড়ির সামনে আমাকে রোজ একবার যেতে হতো প্রয়োজনটা যে আমারই ছিলো বেশি, আর তা হলো নোটবই ধার নেয়া আমার মনে হয় ও যদি সেই সময় আমায় ধার না দিতো তাহলে বোধহয় এ জীবনে এতদুর আসা সম্ভব হতোনা। রুদ্রা এখনো পৌষ সংক্রান্তি কিংবা অন্যান্য আয়োজনে আগের মতই এগিয়ে আসে আমাকে প্রেরণা দেয়।
আমি এবার পৌষ সংক্রান্তিতে যখন পিঠে হাতে নিয়েছি তখনি মনে পড়ে গেলো বাবা’র কথা “বাবু আমাদের যখন টাকা হবে তোকে আমি অনেক পিঠা খাওয়াবো”। আজ বাবা নেই। বাবা তার কথা গুলো পূর্ন করে যেতে পারেনি; কিন্তু আজ চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে বাবা তুমি আমার গরিব বাবা নও; তুমি আমার ভীষন ভালো বাবা।
-----------সমাপ্ত---------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



