somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোথা হতে এলো আমাদের বাংলা ভাষা

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সকাল ১১:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের এই দেশের নাম বাংলাদেশ। আর ভাষা,আমাদের চৌদ্দ কোটি মানুষের মাতৃভাষা –বাংলা ভাষা। শুধু আমরাই নই আমাদের দেশের বাইরেও কয়েক কোটি মানুষ কথা বলে এই ভাষায়। এই বাংলা ভাষায় গান ,কবিতা লিখেছেন চন্ডীদাস, আলাওল, রবীন্দ্রনাথ,নজরুল প্রমুখ। আজ আমাদের গৌরব , আমাদের ভাষার সাহিত্য পৃথিবীর প্রথম সারিতে ঠায় করে নিয়েছে।
মা-কে নিয়ে কথা বলতে কতো সুখ। তেমনি সুখ,তেমনি গর্ব আপন ভাষা নিয়ে। এ যে আমাদের মাতৃভাষা।বাংলা ভাষা আমাদের ভাষা জননী। তাই সে কারণেই তো জননীর ইজ্জত রক্ষার লড়াইয়ে বাহান্ন সালে ছেলেরা হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছে। এই বাংলা ভাষা নিয়েই আজকের কথা।
এই ভাষার জন্ম কবে,কোথায় ,কেমন করে?
জটিল প্রশ্ন।সোজা কথায় তার জবাব নেই। ভাষার পণ্ডিতেরা কতো কেতাব লিখেছেন সেই জন্ম কথা নিয়ে।ভাষার জন্ম কবে? সন তারিখ মিলিয়ে খুব নির্দিষ্ট করে তা বলা সম্ভব নয়। কেননা,কোন্ বিশেষ দিনে,বিশেষ ক্ষণে ভাষা জন্ম নিল-ভাষার ব্যাপারে তেমনটি কিছু ঘটে না। ভাষা আসলে হয়ে উঠে। মানুষের মুখ থেকে মুখে আপনা-আপনি।
রোজকার নানান দরকারে, অভিজ্ঞতায়,হরেক টানাপোড়নে তা একটি বিশেষ চেহারা নিতে থাকে। এবং ক্রমে ক্রমে,জানিনা কখন, তা ঘড়ে ওঠে। বাংলা ভাষার জন্মও ওমনি ভাবে। সেই কবে অতীতের তখনকার ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এ ভাষার জন্ম। কতো হাজার বছর আগে নিশ্চিত করে তা কে বলবে?
কেননা মুখে মুখে চলিত ভাষাকে তো ধরে রাখা যায়না। তাই তার লিখিত কোন দলিল থাকে না। মুখের ভাষা জীবন্ত ভাষা। কোথাও স্থির হয়ে থাকতে পারেনা। কেবলই তা বদলে যায়-কে এলাকার থেকে আরেক এলাকা, এক যুগ খেকে আরেক যুগ। আবার দেখা যায়, একই ভাষায় সমাজের উচু তলার,মাঝের তলা,নিচু তলার মানুষের কথাবার্তায় গড়মিল হয়েছে মেলা। জীবন্ত এক মৌখিক লক্ষণীয়তায়।কিন্তু কবিতা,সাহিত্য,ধর্ম-উপদেশ যা কিনা লেখা হয় হয়ে থাকে তা ধরে থাকা লেখার হরফে।এটা হচ্ছে লেখার ভাষা বা সাহিত্যের ভাষা।লেখার ভাষা মুখের তো নয়। মুখ থেকে মুখে, কান থেকে কানে তা তেমন ভাবে বদলে যায় না বা মুছে যায়না।লেখার ভাষা হচ্ছে সে ভাষার দলিল,তার ইতিহাস। তাই থেকে খবর পাওয়া গেছে পুরোনো বাংলা ভাষার।


-------মুদ্রণের প্রথম যুগের বাংলা ছাপার নমুনা----------

আমাদের ভাষার এই দলিল আবিস্কার করেন পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবার থেকে তিনি গোটা পঞ্চাশেক কবিতা,গানের এক পুঁথি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। পন্ডিতেরা বলেন, এই হচ্ছে সব চাইতে পুরোনো বাংলা ভাষায় লেখা সাহিত্য আর এই ভাষা বয়স হবে হাজার খানিক বছর। অতএব,আমরা বলি, আমাদের ভাষার সাহিত্য এবং আমাদের সাহিত্যের ভাষা হাজার বছরের পুরোনো।হাজার বছরের পুরোনো বাংলা কবিতা-সে গুলো সাধারণ নাম চর্যাপদ,চর্যার গান। এই ভাষার নমুনা এইরকম-

ক. এক সো পাদুমা চউসটঠী পাখুড়ি। তহি চড়ি না ছই ডোম্বি বাপুড়ি। এখনকার বাংলায় এই কথাটার অর্থঃ একটি সেই পদ্ম তার চৌষট্টি পাপড়ি। ডোম্বি বেচারির উপরে চড়ে নাচে।
খ. গঙ্গা যউনা মাঝেঁ রে বহই নাঙ্গ। এখনকার বাংলায় এই কথাটার অর্থঃ উরে, গঙ্গা ,যমুনার মধ্যে নৌকা বয়।
গ. উঁচু উঁচু পাবত তহিঁ বসই সবরী বালী। এখনকার বাংলায় এই কথাটার অর্থঃ এখানকার উচু উচু পর্বত,সেখানে শবরী বালিকা (শিকারী জাতির মেয়ে)বাস করে।

চর্যার ভাষার ঐরকম কিছু কিছু শব্দ এই হাজার বছর পরেও আমাদের বুঝতে খুব বেশি একটা সমস্যা হয়না।তবে গোটা কবিতা পড়লে দেখা যাবে এ ভাষার মধ্যে খানিকটা আবছা আড়াল ভাব রয়েছে। খানিকটা ধাঁধার মতো। সেজন্য চর্যার পুরোনো বাংলাকে বলা হয়ে থাকে ‍‌‍”সনধা” ভাষা বা আলো-আঁধারি ভাষা । কিছু বোঝা যায় কিছু বোঝা যায়না।আরেকটা কথা। সেই এক হাজার বছর আগে বাংলা ভাষা আর বাংলা কবিতার চর্চা যারা করে গেছেন তারা কিন্তু সমাজের নীচু মহলে যাদের বাস, নগরের গ্রামের ভেতর যাদের জায়গা হয়নি সেইসব মানুষের জীবনের কথা নিয়ে চর্যার ভাষায় কবিতা।
সমাজের যারা প্রধান,শিক্ষিত ভদ্র ব্যাক্তি তারা কিন্তু বাংলা ভাষার চর্চা করতেন না। তার পড়তেন সংস্কৃত,লিখতেন সংস্কৃতে। তাদের ধারণা ছিল, সংস্কৃত হচ্ছে স্বর্গের ভাষা, দেবতার ভাষা। বাংলা ভাষার চর্চা করলে গতি নরকে। আসলে কবিতায়-গানে বাংলাভাষাকে বাচিয়ে রেখেছিলেন সমাজের সাধারণ মানুষেরা।চর্যাপদের ভাষায় যাদের জীবনের ছবি পাই তারা হলো এইসব সাধারণ ডোম,তাতি,ধুনরি,শিকারি প্রভৃতি।

হাজার বছরের এই পুরোনো বাংলাকে পন্ডিত'রা নাম দিয়েছেন প্রাচীন বাংলা। এখন হয়তো প্রশ্ন আসবে –তা হলে এই বাঙলা ভাষার জন্ম কোন ভাষা থেকে।তার পরের প্রশ্নটি তখন হবে-সে ভাষার জন্ম নিয়েছে আবার কোন ভাষা থেকে।কিভাবে এবং কোন সময় তার জন্ম। এমনি ধারায় প্রশ্নের পর প্রশ্ন রয়েছে, তারও পর প্রশ্ন রয়েছে। এভাবে জন্ম কথার খোজ নিতে গেলে বাংলা ভাষার পুরো ঠিকুজিই দাড় করাতে হবে।ব্যাপারটা কিন্তু খুব সহজ নয়।কিছুটা পন্ডিতি ধরণের। তা হলে এক্ষেত্রে সেই পণ্ডিতদের কথাই মানতে হয়।
হাজার পাঁচেক বছর আগেকার কথা। তখন ইউরোপের কোনো এক এলাকায় এক বিশেষ ভাষা চালু ছিলো। তাকেই বলা হয়ে থাকে আমাদের আজকের ভাষার আদির আদি।পণ্ডিতেরা তার নাম দিয়েছেন ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষা।কিন্তু যেসব মানুষ সেসব ভাষায় কথা বলতেন তারা একজায়গায় বসে থাকেনি।আবাদ আর আবাসের জন্য একেক দল একেক দিকে বেরিয়ে গেছে। যুগের পর যুগ তারা হেঁটেছে। কোথায় পাবে প্রচুর আহার,কোথায় পাবে নিরাপদ আশ্রয়,তারই খোঁজে ইউরোপ থেকে আর্য নামের দলটি ইরানে এস বসত করল। আর্যদের আরেক অংশ আরো এগিয়ে হিন্দুস্থান পর্বত ডিঙিয়ে প্রবেশ করলো ভারতবর্ষ উপমহাদেশের উত্তর অঞ্চলে।কালে সেই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে নতুন আর্যভাষা জন্ম নেয়। দুই দেশে তার দুই ভাগ ইরানের আর্যভাষা আর ভারতের আর্যভাষা।সেও প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর হয়ে গেছে। ভাষা চলে নদীর স্রোতের মতো।এভাবেই কতো চড়াই-উতরাই ভেঙে ভাষা নদী-নদী পেরিয়ে এসেছে কত দীর্ঘ পথ। এইভাবে প্রাচীন ভারতীয় আর্য থেকে জন্ম মদ্য-ভারতীয় আর্য ভাষার। এবং তা থেকে নবীন ভারতীয় আর্য ভাষার।বলা দরকার,এসব নাম কিন্তু হাল-আমলের পন্ডিতদের দেওয়া নাম। এখন মধ্যযুগের যে ভাষা তা হচ্ছে পালি আর প্রাকৃত। বুদ্ধ-অশোকের আমলে পালির খুব প্রসার হয়েছিলো।পরের যুগ প্রাকৃত,এই সময় নাগাদ তা থেকে আমাদের বাংলা ভাষার জন্ম। তবে পন্ডিতরা বলেন,প্রাকৃত থেকে সরাসরি বাংলাভাষার জন্ম হয়নি।পূর্বের প্রাকৃত ভেঙে অপভ্রংশ,তাই থেকে বাংলা। এই বাংলা তো মাত্র হাজার বছরের পুরোনো। তাই এ ভাষা হচ্ছে নবীন ভারতীয় আর্য ভাষা।বাংলার সাতে তেমনি আরো রয়েছে- হিন্দি,উর্দু,আসামি,উড়িয়া,বিহারী ইত্যাদি উপমহাদেশের আধুনিক ভাষাগুলি।


----প্রথম সচিত্র বাংলা বইয়ের পৃষ্টা-----------

চর্যার কবিতা গানের ভাষাকে বলেছি প্রাচীন বাংলা।তার পরেও তো বাংলা ভাষার প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাস। বারোশো খ্রিষ্টাব্দের কাছকাছি সময়ে মুসলমান তুর্কিরা বাইরে থেকে এসে তখনকার বাংলাদেশের ভেতর দখল নেয়।তারপর প্রায় ছয়শো বছর ধরে চলে নবাব-সুলতানদের আমল। এ ।আমলে বিশেষ করে নজর পড়েছে দেশী ভাষার চর্চায়। রাজা বাদশা অবশ্য তাদের কাজকর্ম চালিয়েছে নিজেদের ভাষায়।কিন্তু ওদিকে হিন্দু ব্রাহ্মণ পন্ডিতও সংস্কৃত ছাড়া বাংলাকে স্বীকারই করেননি।কিন্তু বাংলাভাষা আপন জোরে নিজে জায়গা দখল করে নিয়েছে।তাই সাধারণ মানুষের এই ভাষা। তাদের হাসি কান্না নিয়ে, তাদের ধর্ম সমাজ নিযে ছয়শো বছরের এক বিপুল বাংলা সাহিত্য গড়ে উঠেছে।আর আপনা ভাষার জোরই এ সাহিত্য জীবন্ত।
এই নতুন যুগেই বাংলা ভাষার সাহিত্যকে দুনিয়ার দরবারে পৌছে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা ভাষার আশ্চর্য ক্ষমতা আবিস্কার করলেন নজরুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন বিদ্রোহের আগুন ছড়ানো গান।
আর আজ যে আমরা স্বাধীন হয়েছি তা তো বাংলা ভাষার জন্যই, আমাদের গর্ব মায়ের ভাষা বাংলাকে নিয়েই।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ৮:১২
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×