- প্রিয়ন্তী.........
- নাহ্ , তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। আবার সেই জানালার পাশে? সারাদিন কী দেখিস ওখানে? হয়েছে কী তোর!
- বললাম তো বাবা কিছু হয়নি। শুনেছি সবুজের দিকে তাকালে চোখ ভালো থাকে, তাই সবুজ দেখছি।
- তোর যা খুশি তাই কর...
আমি ভাবি, মানুষ কি পাল্টাতে পারে না? সেটা এতো ফলাও করে দেখার কি আছে! ওদের জন্য একটু নিজের সাথে দেখা পর্যন্ত করতে পারিনা। যে করেই হোক একটা সময় বের করতেই হবে। যাক, হাত মুখ ধুয়ে আগে ফ্রেশ হই-তারপর এ ব্যাপারে ভেবে দেখা যাবে।
- খেয়াল করেছ মেয়েটার কোন উন্নতি নেই। ক’দিন ধরে আরো যেন পাগলামী বেড়েছে।
- হ্যাঁ মা, কাল আপু সারারাত ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়েছে। সকালে শোয়া মাত্রই আবার উঠে ঐ জানালায়। আমার মনেহয় ডাক্তার আঙ্কেল ঠিকই বলেছেন, বাবা। এক মাস আপুকে তাঁর প্রাইভেট মেনটাল হসপিটালে ভর্তি করে দাও, হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
-ও ঘরের আলোচনাটা একটু একটু কানে আসছিল। আমি কি সত্যিই অস্বাভাবিক আচরণ করছি? কই না তো! আমার কাছে আমি আজই জিঙ্গাসা করে নেব।
ঘড়িতে তখন প্রায় সকাল ১১ টা।
- বাবা আমি চললাম...
- মানে? কোথাই যাচ্ছিস?
ভয় নেই বাবা, গ্রামে যাচ্ছি। তবে আর নাও ফিরতে পারি। তোমাদের এই শহর আমার আর ভালো লাগছে না। গেলাম...
- দাড়া মা...নাস্তা কর, আমরাও না হয় তোর সাথে যায়...
- পারবোনা মা, তোমাদের সাথে গেলে আমার কাজটা হবে না। প্লিজ...
-গ্রামে এসে আমাদের পুকুর পাড়ে ঝোপের সেই শিউলি গাছটার নিচে বসলাম। আপাততো আমাকে হয়ত এখানে আর কেউ পাবেনা। অতএব নিশ্চিন্তে আমি আমার সাথে একটু দেখা করতে চাই, একটু গল্প করতে চাই।
আমি ও আমার কথোপকথন
- হ্যাঁ, ক্ষমা চাই তোমার কাছে। তোমার সাথে অনেকদিন দেখা করিনি। সবই তো জানো, তোমার কাছে লুকাবার কিছু নেই। তবুও তোমাকে বলি.....
জানোই তো আমার প্রথম বেলার কথা। আমি চঞ্চল ঘাস ফড়িং এর মত মহ্নাণ্যের তীব্র রোদে ঘাসের মধ্যে লুকোচুরি খেলেছি। আমি আবিষ্কারের নেশায় ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে দিগন্তের শেষ সীমা খুজেঁছি, আকাশের গাঁ ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছি। আমি খালের পানিতে বৃষ্টির খেলা দেখেছি আর বড়শি দিয়ে পুটি ধরেছি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম আমার বন্ধু- কান্ত , মহেন্দ্র, শিশির....ওদের সাথে খেলে-ধূলে জীবন পার হয়ে যাবে।
কই, পারলাম না তো! ঠিকই তো প্রকৃতি আমাকে বুঝিয়ে ছাড়লো ‘তুমি মেয়ে মানুষ’। আমাকে নাকি দু’পা এগোলে এক পা পেছাতে হবে। এ আবার কেমন নিয়ম? ওদের ঐ নিয়ম কানুন আমার নরম মাংশের হৃদয়টিকে বোথা ছুরি দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে কাটতে লাগলো। সে এক ভিষণ যন্ত্রনার স্মৃতি। সেই যন্ত্রনায় পঙ্গু হতে থাকলো আমার দেহ ও আত্বা। আমার জীবনের কিশোরী নামের এই অধ্যায়টি বোবা’র মত বন্ধী হয়ে ছিল এক অন্ধকার ঘরে। উফ্ কী দুঃসহ...
সেই সস্তির নিঃশ্বাসটি থেকে আজও অক্্িরজেন পাই, যেদিন অন্ধকারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ভেঙে ফেলেছিলাম সেই দ্বার। অতপর জীবনের সেই সপ্নীল অধ্যায়। দেখি সত্যিই আমার সবুজ আঙিনা জুড়ে বাহারি রঙের ফুল। সে ফুলের মধু নিতে প্রতিক্ষণেই ভীড় জমাতো প্রজাপতির পাখায় চড়ে আসা কত-শত স্বপ্নরা। যে স্বপ্নের কোনটি ছিল বাবা-মা কে ঘিরে, কোনটি অসহায় মানুষকে নিয়ে, আমার দেশকে নিয়ে, আমার প্রিয় পৃথিবীকে নিয়ে। আমি যতœ করে সেগুলোকে আমার দু’চোখের নীল খামে রেখে দিতাম।
জানো আমার আমি-, মাঝে মাঝে জোস্না রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন এসে পড়ত আমার আঙিনায়! মনে হতো কোন এক মধুর স্পর্শ, বন্ধ হয়ে আসছে দুটি চোখ...,কাঁকন পরা হাত দুটি রাখা কোন এক নিরাপদ হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে। অনাবিল শান্তি....আর.... । শুরু হলো স্বপ্ন সত্যি আর তা পূরণের অপেক্ষা.....
একদিন হঠাৎ আমার আঙিনায় জোস্না রাতের সেই স্বপ্নের ছায়া দেখতে পেলাম। আমি তো ভিষণ ভয় পেয়ে গেলাম। কেন যেন লজ্জাও। আজ মনে হয়, ওটাই ছিল বুঝি ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি।
আমাকে ‘ও’ ভীষণ ভালোবাসতো। হৃদয়ের ঠিক কতটা গভীর থেকে, বলতে পারবোনা। শুধু এটুকুই বিশ্বাস ছিল-পুরুষেরা পাওয়ার নেশায় সব পারে। তেমনি পারে পেয়ে গেলেও। পাওয়ার নেশায় মত্ত ঘোড়ার মত ছোটে, পেয়ে গেলে সেই পাগলা দৌড়ের কাহিনী ছাগলের মত ভুলে যায়। তাছাড়া সহজলভ্য শাপলার চেয়ে কণ্টকময় পদ্মকে তারা অনেক বেশি ভালোবাসে। তাই যেদিন প্রথম অনুভব করলাম হৃদয়ে কোন এক দাগ পড়ছে সেদিন থেকেই আমার গায়ে কাটা জাঁগাতে শুরু করলাম। ওর মাঝে আমাকে সত্যিকারে পাওয়ার নেশা যে করেই হোক জাঁগাতে হবে। তাই ভুল করেও একবার বলিনি, ‘তোমাকে ভালোবাসি’। কারন আমি যে তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম!
তার ভালোবাসায় আমার আঙিনার বাতাস এতটাই ভারি হয়ে উঠেছিল যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো। অথচ বিনিময়ে? শুধু দুরে ঠেলেছ্,ি শতবার বলেছি ভালোবাসিনা। কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছি , কাঁদতে দেখে হেসেছি। শুধু ভালোবাসি তাই। তার আড়ালে? তাকে কষ্ট দেবার যন্ত্রনায় ছটফট করে মরেছি, কম্পিত হাতটি সযতেœ রেখেছি ওর ছবির উপর। নিজেকে শান্তনা দিয়েছি শুধু একটি কথা দিয়ে, আর মাত্র ক’টা দিন--জীবনটা একটু গুছিয়ে নিয়েই বলে দেবো সব। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ধরা দেবো তার কাছে। সামাজিক হোক আর ধর্মীয় হোক, আমার পবিত্র প্রাণের বাঁধনে বেধে নিতে চেয়েছিলাম তাকে। আমার কষ্টের আগুনে পোড়ানো খাটি সোনার ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করতে চেয়েছিলাম তাকে।
অপেক্ষার পালা প্রায় শেষ হয়েই আসছিল। ‘ভালোবাসি’ বলার কত আয়োজন’ই না চলছিল আমার মনে। হঠাৎ আবারো ঝড়। লন্ডভন্ড করে দিল আমার সব আয়োজন।
- তুমি তো অন্তত আত্বতৃপ্ত হয়েছিলে তোমার ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে। আর আমি? কী পেলাম? কিছুই না, শুধু হৃদয়ের কোথায় যেন একটা দাগ থেকে গেল....
দেখেছো আমি, প্রকৃতিতে কি ভিষণ ঝড় উঠেছে? পুকুরের পানিতে শিউলি ফুল গুলো কেমন কাঁপছে। তার ছবিতে যেন- আমার সেই কম্পিত হাত! কোথায় পালাচ্ছো আমি? আরো কথা আছে তো.......আজ তোমাকে একটা কথার জবাব দিতেই হবে।
-এই অসময় আমার মাথায় আবার হাত রাখলো কে? ও...বাবা? তোমরা সবাই?
-কোথায় নিয়ে যাচ্ছো আমাকে?
-কেন? আমি পাগল নই, বাবা। আমি আমার কাছে একটা কথা জিঙ্ঘাসা করে আসি।
-প্লিজ বাবা................................
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



