somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বেড়ার ওপারে দাঁড়িয়ে হাসছেন রবীন্দ্রনাথ

০২ রা জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বয়সটা নিতান্তই কাঁচা, বারো-তেরোর বেশি নয়--তখন 'কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ী বোঝাই করা কলসী হাঁড়ি!' আর অবিশ্বাস্য মনে হলেও 'বীরপুরুষ'--তবু রবীন্দ্রনাথ বড় বেশি তাত্ পর্যহীনএকটা চালু নাম 'রবিঠাকুর'---এস হে বৈশাখ!
চারুদির বিয়ে। পাত্র যথেষ্ট পরিমাণে রাবীন্দ্রিক--বুঝেছিলাম গোঁফ ওঠার পর। 'উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ' যার মানে কালো-ই, চারুদি গান ধরলো--'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা রে আলোর নাচন!' বাবড়ি চুল আর ধুতি-পাঞ্জাবির পাত্রের চোখ জানলার বাইরে। চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলেই ফেললো, 'রবীন্দ্রসঙ্গীত জানেন না?' প্রথম ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পরার দিনেই 'আপনি' শুনে প্রবল উদ্দীপনায় চারুদি গান ধরলো--'ঝিল্লি ঝনকিছে ঝিনিঝিনি,/ আমার মন কয় চিনি চিনি।' গোঁফ ওঠার পর জেনেছিলাম চারুদির গাওয়া দ্বিতীয় গানের বাণীকার রবীন্দ্রনাথ হলেও সুরকার ছিলেন চারুদির কাকা গণপতি ঘোষাল। যাত্রাদলের বিবেক! চমকিত এবং আতঙ্কিত রাবীন্দ্রিক সেই পাত্রের সঙ্গে চারুদির বিয়ে হয়নি। বিবাহ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের এই মারাত্মক ভূমিকা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছিল।
তারপর চোদ্দ বছর বয়সে 'তীরনিক্ষেপ' নাটকে ঈশা খাঁ'র ভুমিকায় দাপটের সঙ্গে অসিচালনা করতে করতে আমি যখন ভূমিকম্প-প্রবণতায় ভুগছি চারুদি বলল, 'জানিস, আমি এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখছি...' চারুদির চোখে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্যে জল দেখে বড় মায়া হয়েছিল। চারুদির বাড়ির পাশ দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় গেলেই শুনতে পেতাম চারুদি আশ্চর্য সুন্দর গলায় গাইছে--'চাহিয়া দে'খো রসের স্রোতে স্রোতে / রঙের খেলাখানি।/ চেয়োনা তারে মায়ার ছায়া হতে / নিকটে নিতে টানি।'---আমার চেয়ে বছর দেড়েকের বড় চারুদির বিয়ে হয়েছল একেবারেই অ-রাবীন্দ্রিক এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে!
স্কুল ছাড়ার বছর দেড়েক আগে আমি জানতে পারলাম আমার কণ্ঠস্বর নাকি রীতিমতো রাবীন্দ্রিক! অতএব আমার এই বিশেষ প্রতিভাকে তুলে ধরার জন্যে প্রথমেই এগিয়ে এলেন আমার বাংলাসাহিত্যের শিক্ষক । রবীন্দ্র-জয়ন্তীতে আমি ছাড়া 'আফ্রিকা' আবৃত্তি আর কে করবে! প্রগতিশীল সংস্কৃতি মঞ্চে 'আফ্রিকা' তখন আবশ্যিক ছিল। সে প্রবল করতালির গুঞ্জন আমি এখনও স্পষ্ট শুনতে পাই। অনিবার্যভাবেই সঞ্চয়িতায় আমার সঞ্চরণের মাত্রা গেল বেড়ে। একে একে--'ওরে বিহঙ্গ মোর'--'সাগর জলে সিনান করি সজল এলোচুলে'--'আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ'--'কিনু গোয়ালার গলি'--'নাম তার কমলা / দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা' থেকে কবিতার পর কবিতায়, এ মঞ্চ থেকে ও মঞ্চ--রবীন্দ্রনাথে আচ্ছন্ন সেই ব্যস্ততম দিনে ক্লাবের আমন্ত্রণ, 'শেষের কবিতা'য় অমিত করতে হবে! স্বভাবতই লাবণ্যকে নিয়ে তীব্র কৌতুহল এবং চাঞ্চল্য! সদ্য স্কুল ছেড়েছি এবং গোঁফের রেখা স্পষ্ট---'হেলাফেলা সারাবেলা / এ কী খেলা আপন-সনে! / এই বাতাসে ফুলের বাসে / মুখখানি কার পড়ে মনে!'
কানে কানে সহপাঠিনীর ফিস-ফিস--'অধরের কানে যেন অধরের ভাষা।/ দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে।' পড়িস নি এখনো 'কড়ি ও কোমল!' তীব্র তলিয়ে যাওয়া রবীন্দ্রনাথে। রাতে রবীন্দ্রনাথ দিনে রবীন্দ্রনাথ শোকে রবীন্দ্রনাথ তাপে রবীন্দ্রনাথ গানে রবীন্দ্রনাথ প্রেমে রবীন্দ্রনাথ! সে এক বিপুল ভীষণ ঘূর্ণি....
আলোকিত মঞ্চে লাবণ্য ।। 'ঐ সবুজ ডানাওয়ালা পাখিটার নাম জানেন?' আলোকিত মঞ্চে আমি অমিত বললাম ।। 'জীবজগতে পাখি আছে সেটা এতদিন সাধারণভাবেই জানতুম, বিশেষভাবে জানবার সময় পাইনি। এখানে এসে, আশ্চর্য এই যে, স্পষ্ট জানতে পেরেছি, পাখি আছে, এমন কি, তারা গানও গায়!'---প্রচণ্ড করতালির মধ্যে আরও বলতে হয়েছিল ।। 'For God's sake, hold your tongue and let me love! (দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর। / ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।) এবং একেবারে শেষে ।। 'হে ঐশ্বর্যবান,/ তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--/ গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/ হে বন্ধু বিদায়।'
এরপরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই সাধ্য ছিল না আমাকে ছেড়ে যাওয়ার। লাবণ্য'র সঙ্গে সফল জুটি হিসেবে মঞ্চ থেকে মঞ্চে শুধু 'শেষের কবিতা'ই নয়, 'স্বর্গ হইতে বিদায়' আমার কন্ঠস্বরে নির্ভুল বসে গেল।
চারুদির পাড়ার ক্লাবেও আমন্ত্রণ 'স্বর্গ হইতে বিদায়' পরিবেশনের। ইতিমধ্যে আমাদের ক্যাসেট ছড়িয়ে গেছে অনেকদূর পর্যন্ত। ক্লাবে চারুদিও গান গাইল--'আকাশে কার ব্যাকুলতা,/ বাতাসে বহে কার বারতা,/ এ পথে সেই গোপন কথা / কেউ তা জানে না।' গানের পর চারুদির সজল আকুতি--'আয় আমরা দু'জনে 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ' শোনাই। আমি কুন্তী তুই কর্ণ!'
রবীন্দ্রনাথের জন্যেই চারুদির জীবনে রাবীন্দ্রিক বর জোটেনি, আবার যে জুটলো সে 'কড়ি ও কোমল' পড়েনি, অথচ প্রগাঢ় বিস্ময়ে 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ' শুনলো! চারুদি বলল, 'আমার আর আমার বরের মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ, তাই প্রেম নেই শুধুই বিস্ময়! অথচ দ্যাখ তোর সঙ্গেও 'শেষের কবিতা'য় আমি লাবণ্য হতে পারলাম না।
তখন বুঝিনি চারুদি কি বলতে চেয়েছিল। এখন যখন বুঝি তখন বেড়ার ওপারে দাঁড়িয়ে হাসছেন রবীন্দ্রনাথ!
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০২
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×