বয়সটা নিতান্তই কাঁচা, বারো-তেরোর বেশি নয়--তখন 'কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ী বোঝাই করা কলসী হাঁড়ি!' আর অবিশ্বাস্য মনে হলেও 'বীরপুরুষ'--তবু রবীন্দ্রনাথ বড় বেশি তাত্ পর্যহীনএকটা চালু নাম 'রবিঠাকুর'---এস হে বৈশাখ!
চারুদির বিয়ে। পাত্র যথেষ্ট পরিমাণে রাবীন্দ্রিক--বুঝেছিলাম গোঁফ ওঠার পর। 'উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ' যার মানে কালো-ই, চারুদি গান ধরলো--'কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা রে আলোর নাচন!' বাবড়ি চুল আর ধুতি-পাঞ্জাবির পাত্রের চোখ জানলার বাইরে। চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলেই ফেললো, 'রবীন্দ্রসঙ্গীত জানেন না?' প্রথম ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পরার দিনেই 'আপনি' শুনে প্রবল উদ্দীপনায় চারুদি গান ধরলো--'ঝিল্লি ঝনকিছে ঝিনিঝিনি,/ আমার মন কয় চিনি চিনি।' গোঁফ ওঠার পর জেনেছিলাম চারুদির গাওয়া দ্বিতীয় গানের বাণীকার রবীন্দ্রনাথ হলেও সুরকার ছিলেন চারুদির কাকা গণপতি ঘোষাল। যাত্রাদলের বিবেক! চমকিত এবং আতঙ্কিত রাবীন্দ্রিক সেই পাত্রের সঙ্গে চারুদির বিয়ে হয়নি। বিবাহ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের এই মারাত্মক ভূমিকা আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছিল।
তারপর চোদ্দ বছর বয়সে 'তীরনিক্ষেপ' নাটকে ঈশা খাঁ'র ভুমিকায় দাপটের সঙ্গে অসিচালনা করতে করতে আমি যখন ভূমিকম্প-প্রবণতায় ভুগছি চারুদি বলল, 'জানিস, আমি এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখছি...' চারুদির চোখে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্যে জল দেখে বড় মায়া হয়েছিল। চারুদির বাড়ির পাশ দিয়ে সন্ধ্যাবেলায় গেলেই শুনতে পেতাম চারুদি আশ্চর্য সুন্দর গলায় গাইছে--'চাহিয়া দে'খো রসের স্রোতে স্রোতে / রঙের খেলাখানি।/ চেয়োনা তারে মায়ার ছায়া হতে / নিকটে নিতে টানি।'---আমার চেয়ে বছর দেড়েকের বড় চারুদির বিয়ে হয়েছল একেবারেই অ-রাবীন্দ্রিক এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে!
স্কুল ছাড়ার বছর দেড়েক আগে আমি জানতে পারলাম আমার কণ্ঠস্বর নাকি রীতিমতো রাবীন্দ্রিক! অতএব আমার এই বিশেষ প্রতিভাকে তুলে ধরার জন্যে প্রথমেই এগিয়ে এলেন আমার বাংলাসাহিত্যের শিক্ষক । রবীন্দ্র-জয়ন্তীতে আমি ছাড়া 'আফ্রিকা' আবৃত্তি আর কে করবে! প্রগতিশীল সংস্কৃতি মঞ্চে 'আফ্রিকা' তখন আবশ্যিক ছিল। সে প্রবল করতালির গুঞ্জন আমি এখনও স্পষ্ট শুনতে পাই। অনিবার্যভাবেই সঞ্চয়িতায় আমার সঞ্চরণের মাত্রা গেল বেড়ে। একে একে--'ওরে বিহঙ্গ মোর'--'সাগর জলে সিনান করি সজল এলোচুলে'--'আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ'--'কিনু গোয়ালার গলি'--'নাম তার কমলা / দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা' থেকে কবিতার পর কবিতায়, এ মঞ্চ থেকে ও মঞ্চ--রবীন্দ্রনাথে আচ্ছন্ন সেই ব্যস্ততম দিনে ক্লাবের আমন্ত্রণ, 'শেষের কবিতা'য় অমিত করতে হবে! স্বভাবতই লাবণ্যকে নিয়ে তীব্র কৌতুহল এবং চাঞ্চল্য! সদ্য স্কুল ছেড়েছি এবং গোঁফের রেখা স্পষ্ট---'হেলাফেলা সারাবেলা / এ কী খেলা আপন-সনে! / এই বাতাসে ফুলের বাসে / মুখখানি কার পড়ে মনে!'
কানে কানে সহপাঠিনীর ফিস-ফিস--'অধরের কানে যেন অধরের ভাষা।/ দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে।' পড়িস নি এখনো 'কড়ি ও কোমল!' তীব্র তলিয়ে যাওয়া রবীন্দ্রনাথে। রাতে রবীন্দ্রনাথ দিনে রবীন্দ্রনাথ শোকে রবীন্দ্রনাথ তাপে রবীন্দ্রনাথ গানে রবীন্দ্রনাথ প্রেমে রবীন্দ্রনাথ! সে এক বিপুল ভীষণ ঘূর্ণি....
আলোকিত মঞ্চে লাবণ্য ।। 'ঐ সবুজ ডানাওয়ালা পাখিটার নাম জানেন?' আলোকিত মঞ্চে আমি অমিত বললাম ।। 'জীবজগতে পাখি আছে সেটা এতদিন সাধারণভাবেই জানতুম, বিশেষভাবে জানবার সময় পাইনি। এখানে এসে, আশ্চর্য এই যে, স্পষ্ট জানতে পেরেছি, পাখি আছে, এমন কি, তারা গানও গায়!'---প্রচণ্ড করতালির মধ্যে আরও বলতে হয়েছিল ।। 'For God's sake, hold your tongue and let me love! (দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর। / ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।) এবং একেবারে শেষে ।। 'হে ঐশ্বর্যবান,/ তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--/ গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/ হে বন্ধু বিদায়।'
এরপরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই সাধ্য ছিল না আমাকে ছেড়ে যাওয়ার। লাবণ্য'র সঙ্গে সফল জুটি হিসেবে মঞ্চ থেকে মঞ্চে শুধু 'শেষের কবিতা'ই নয়, 'স্বর্গ হইতে বিদায়' আমার কন্ঠস্বরে নির্ভুল বসে গেল।
চারুদির পাড়ার ক্লাবেও আমন্ত্রণ 'স্বর্গ হইতে বিদায়' পরিবেশনের। ইতিমধ্যে আমাদের ক্যাসেট ছড়িয়ে গেছে অনেকদূর পর্যন্ত। ক্লাবে চারুদিও গান গাইল--'আকাশে কার ব্যাকুলতা,/ বাতাসে বহে কার বারতা,/ এ পথে সেই গোপন কথা / কেউ তা জানে না।' গানের পর চারুদির সজল আকুতি--'আয় আমরা দু'জনে 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ' শোনাই। আমি কুন্তী তুই কর্ণ!'
রবীন্দ্রনাথের জন্যেই চারুদির জীবনে রাবীন্দ্রিক বর জোটেনি, আবার যে জুটলো সে 'কড়ি ও কোমল' পড়েনি, অথচ প্রগাঢ় বিস্ময়ে 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ' শুনলো! চারুদি বলল, 'আমার আর আমার বরের মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ, তাই প্রেম নেই শুধুই বিস্ময়! অথচ দ্যাখ তোর সঙ্গেও 'শেষের কবিতা'য় আমি লাবণ্য হতে পারলাম না।
তখন বুঝিনি চারুদি কি বলতে চেয়েছিল। এখন যখন বুঝি তখন বেড়ার ওপারে দাঁড়িয়ে হাসছেন রবীন্দ্রনাথ!
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



