বড় কুশীলবদের স্মৃতিকথ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বড় কুশীলবদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে স্মৃতিকথা লিখেছেন। প্রথম আলো শুরু থেকেই সেসব স্মৃতিকথা সংগ্রহ করে নির্বাচিত অংশের অনুবাদ এবং সেসবের ভিত্তিতে রচিত বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। প্রকাশনার প্রথম বছরেই, ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিশেষ ক্রোড়পত্রে ছাপা হয়েছে পাকিস্তানি জেনারেল ফজল মুকিম খানের স্মৃতিকথার বই পাকিস্তানস ক্রাইসিস ইন লিডারশিপ। এর আধেয় বিশ্লেষণ করেছেন ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রের চার পাতাজুড়ে ছাপা হয়েছে সদ্য অবমুক্ত করা মার্কিন গোপন দলিলের ভিত্তিতে রচিত ইতিহাসবিদ এনায়েতুর রহিমের রচনা। সে বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রে ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির নেওয়া ভুট্টোর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন হাসান ফেরদৌস। একই বছর জুলাই-আগস্ট মাসে ৩২ কিস্তিতে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় ভারতীয় কূটনীতিক জে এন দীক্ষিতের বই লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত অংশের অনুবাদ। পাকিস্তানি কূটনীতিক ইকবাল আখুন্দের স্মৃতিকথা মেমোয়ার্স অব এ বাইস্ট্যান্ডার, এ লাইফ ইন ডিপ্লোমেসি থেকে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত অংশের অনুবাদ ছাপা হয়েছে ২০০০ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রে। মার্কিন কূটনীতি আর্চার ব্লাড, সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচেন্স, ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান অ্যাডমিরাল এস এম নন্দ, জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবসহ অনেকের স্মৃতিকথার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ ছাপা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা, পাকিস্তানি জান্তার নানা ষড়যন্ত্রসহ নেপথ্যের অনেক কাহিনি জানার লক্ষ্যে অনেক পাকিস্তানির স্মৃতিকথার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ ছাপা হয়েছে। এ তালিকায় আছেন পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল এম আসগর খান, জেনারেল নিয়াজি, সিদ্দিক সালিক প্রমুখ।
নিম্নবর্গের ইতিহাস বয়ান
প্রতিবছর মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে প্রথম আলো চেষ্টা করেছে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে তাঁদের কথা শোনা এবং তা প্রকাশের। আনুষ্ঠানিক ইতিহাসের বাইরে বা প্রান্তসীমায় অবস্থানকারী মুক্তিযুদ্ধের এসব প্রত্যক্ষ যোদ্ধার বিবরণের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্রের রোমহর্ষক ছবি। এই তালিকায় রয়েছেন সাতক্ষীরা-মংলা-খুলনা রণাঙ্গনের যোদ্ধা খিজির আলী বীর বিক্রম, অপারেশন জ্যাকপটে অংশগ্রহণকারী আবুল কালাম আজাদ বীর বিক্রম, মোহাম্মদ সাজাহান, বাহাদুরাবাদ রণাঙ্গনের যোদ্ধা ইপিআরের সুবেদার ভুলু মিয়া, সিলেট অঞ্চলের প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী সুবেদার ওহাব, ইপিআরের সৈনিক আবুল কাশেম বীর বিক্রমসহ আরও অনেকে। প্রথম আলোর কর্মীরা তাঁদের খুঁজে বের করে কাছে গিয়ে অথবা ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের প্রত্যক্ষ বয়ানের ভিত্তিতে রচনা করেছেন প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের বিবরণ।
এ ছাড়া সারা দেশে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে রচনা করেছেন ফিচার, কখনো কখনো তাঁদের নিজস্ব বয়ানের শ্রুতলিপি। এই তালিকায় নারী মুক্তিযোদ্ধাদেরও অনেকে ছিলেন। তা ছাড়া নারী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণামূলক নিবন্ধ লিখেছেন সুকুমার বিশ্বাসসহ একাধিক গবেষক।
অপ্রকাশিত গোপন দলিল, তারবার্তা, সাক্ষাৎকার, চিঠিপত্র
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কুশীলব। তাদের গোপন দলিল যখনই যেটুকু অবমুক্ত করা হয়েছে, প্রথম আলো তা সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক অংশগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করেছে, অথবা সেসবের ভিত্তিতে বিশ্লেষণমূলক লেখা তৈরি করার জন্য কোনো গবেষক, অতিথি লেখককে অনুরোধ করেছে, অথবা নিজেরাই তেমন লেখা লিখে প্রকাশ করেছে। ৪৬টি মার্কিন গোপন দলিলের ভিত্তিতে রচিত নিবন্ধ ‘মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকার গোপন দলিল: নতুন তথ্য’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় ২০০৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ইসলামাবাদ, দিল্লি ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কূটনীতিক দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁদের মধ্যে যেসব তারবার্তা বিনিময় হয়েছিল, সেগুলোরও অনুবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। যেমন—পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ এফ ফারল্যান্ড, ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল হার্ভার্ড ডি স্পিভাক ও ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ বি কিটিংয়ের মধ্যে বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর যেসব তারবার্তা বিনিময় হয়েছিল, সেগুলোর অনুবাদ। এ ছাড়া আর্চার ব্লাড, জেনারেল অরোরা, জেনারেল জ্যাকব, পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী আসমা জাহাঙ্গীরসহ অনেকের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। প্রথম আলোর জন্য মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে পাকিস্তান থেকে লেখেন ড. মুনিস আহমার, ভারত থেকে কুলদীপ নায়ার প্রমুখ।
রণাঙ্গন থেকে স্বজনদের কাছে লেখা মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু চিঠিপত্র ছাপা হয় ২০০৯ মার্চে (পরে ‘প্রথমা’ প্রকাশনা থেকে বের হয় একাত্তরের চিঠি নামে একটি বই)। শুধু ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের বিশেষ ক্রোড়পত্রে নয়, প্রথম আলো প্রতিবছর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বিভিন্ন ধরনের রচনা প্রকাশ করেছে ফিচার পাতাগুলোতেও। নাটক, চলচ্চিত্র, চারুকলাসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিকথামূলক লেখা ছাপা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে চলে আসা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টজনদের সাক্ষ্যমূলক নানা লেখাও প্রকাশ করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ছুটির দিনে’তে একাধিক প্রচ্ছদকাহিনি ছাপা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে।
৬০ জনের সাক্ষ্য
মুক্তিযুদ্ধ চলছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ব বাংলায় মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২১ অক্টোবর যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয় ‘টেস্টিমনি অব সিক্সটি’—মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, মাদার তেরেসাসহ বিশ্বের ৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক অভূতপূর্ব আহ্বান। তখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলছিল। ব্রিটিশ বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অক্সফামের পরিচালক এইচ লেসলি কার্কলে সিবিই স্বাক্ষরিত ওই দলিলটি ছিল বাংলাদেশের জনগণের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ ও তাদের প্রতি ত্রাণসহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে দলিলটি প্রথম আলোর হস্তগত হয় ২০০৯ সালে।
১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর মিরপুরের মুসলিমবাজার এলাকায় নূরী মসজিদের নির্মাণকাজের সময় কিছু মানুষের হাড়গোড় আবিষ্কৃত হয়। মসজিদ কমিটির লোকজন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। খবরটি পৌঁছে যায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। তাঁরা এগিয়ে আসেন, খনন শুরু করেন। বেরোতে থাকে মানুষের মাথার খুলি, হাড়, আগ্নেয়াস্ত্রের খণ্ডাংশ ইত্যাদি। প্রথম আলো শুধু এসবের খবর প্রকাশের মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করেনি, গঠন করেছিল ‘মুসলিমবাজার বধ্যভূমি খনন সহায়ক তহবিল’। প্রথম আলোর সাংবাদিক-কর্মচারীদের দেওয়া ১১ হাজার ৩০০ টাকার তহবিলে অর্থ জমা দিতে শুরু করেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অজস্র মানুষ। প্রতিদিন তহবিল বাড়তে থাকে এবং শেষে তা হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। প্রথম আলো সে অর্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে হস্তান্তর করেছিল। বধ্যভূমি খনন চলেছিল আরও বেশ কিছুদিন, যাতে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও।
প্রথম আলোর কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাসের নির্মোহ বিষয় নয়; মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদও আমাদের তাড়িত করেছে সব সময়। তাই প্রথম আলো মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্তি বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেছে এবং সেসব আলোচনা প্রকাশ করেছে। এভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও চেতনা তুলে ধরার নিরন্তর প্রয়াস অব্যাহত থেকেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে।
জনমত সংগঠন: যুদ্ধাপরাধের বিচার
একই ধারাবাহিকতায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের দাবির পক্ষে জনমত সংগঠিত করার প্রয়াস। ২০০৮ সালের কিছু আগে থেকে দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি আবার ওঠে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপর এই দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠে। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মূলত এই দাবিতে সোচ্চার হয়। প্রথম আলো এ-সংক্রান্ত ঘটনাবলির সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি নিজেরা সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় লিখে, অতিথি-লেখকদের অনুরোধ জানিয়ে লিখিয়ে, এর পক্ষে পাঠকদের চিঠিপত্র ইত্যাদি ছাপিয়ে জনমত গঠনে অবদান রাখার চেষ্টা করে চলেছে।
এ বছর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রটির মূল বিষয় ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। এ বিষয়ে প্রথম আলো একটি বিশেষ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে এবং সে আলোচনার বিশদ বিবরণ প্রকাশ করে দুই পাতাজুড়ে। বিচারের দাবি নিয়ে রচিত দেশের বিশিষ্ট লেখকদের নিবন্ধ-প্রবন্ধও প্রকাশ করে। পণ্ডিত রবিশঙ্করের স্মৃতিচারণা ‘যেভাবে হলো কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, জর্জ হ্যারিসনের সেই বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বা অ্যালাড গিন্সবার্গে কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-এর অনুবাদ প্রকাশ—এসবও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে সোচ্চার করে তোলার লক্ষ্যে, সেই নৃশংস, মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধের স্মৃতিগুলো জাগিয়ে তোলার প্রয়াসে।
, View this link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

