- দাদা, এইহানে পা দেও। হ্যা, আস্তে , এইতো। এইবার ধরো, এইহানে.....
৮-১০ বছরের ছোট্ট মেয়েটি লেগুনায় (এক ধরনের যানবাহন) উঠে খুব সাবধানে তার অন্ধ দাদাকে বিভিন্ন জিনিস বলে বলে লেগুনায় উঠতে সাহায্য করতে থাকে। বৃদ্ধ লোকটি আস্তে আস্তে বেশ চেষ্টা করার পর লেগুনায় উঠে ঠিকমত বসে। গাড়ি চলতে শুরু করে। লোকটি বাবা-মা মরা ছোট্ট মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। এই মেয়েটাই তার সব। এই মেয়েটি না থাকলে তার কি যে অবস্থা হত? ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধ আনমনা হয়ে যায়।
- দাদা, ও দাদা, আসো নাইমা যাই, আমরা বন্দর আইয়া পড়ছি।
বলে খুব সাবধানে তার দাদাকে ধরে ধরে নামাতে থাকে। দাদার প্রতি নাতনীর প্রচন্ড ভালবাসা লেগুনায় উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।
জিন্দাবাজারে আজকে প্রচন্ড ভীড়, মানুষের ভীড়ে ঠিকমত হাঁটাই যাচ্ছে না। এখানে তেমন একটা আসা হয়নি, তাই ভাল করে চিনে না দাদা-নাতনী। হঠাৎ মেয়েটি তার দাদার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যায়। অন্ধ লোকটি নাতনীর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু ভীড়ের ধাক্কায় না বুঝেই অন্য পথে চলে যায়। রাস্তায় গাড়ি, রিক্সা, মানুষ সব মিলে এক ভয়ংকর পরিবেশ । ঠেলাঠেলি, ধাক্কা-ধাক্কি আর খুব তাড়াহুড়া করে সবাই এগিয়ে যেতে থাকে।
বৃদ্ধ ক্লান্ত হয়ে এক শপিং মলের কোনায় দাঁড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ জীবনের একমাত্র সম্বল প্রিয় নাতনীর জন্য লোকটার বুক ভেঙ্গে কান্না আসতে থাকে। এদিকে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে তার দাদাকে চিৎকার করে ডেকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না। এখন তার দাদার কি হবে? দাদা তো চোখে একদমই দেখে না! ভেবেই মেয়েটি খুব ছোটাছুটি করতে থাকে। কিন্তু কোথাও না পেয়ে অবশেষে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটি কাঁদতে থাকে।
- এই মেয়ে, আমার সাথে এসো।
মেয়েটি কান্না থামিয়ে আগন্তুকের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, মানুষটি বেশ লম্বা, রুগ্ন স্বাস্থ্য, টি-শার্ট পড়া, কাধে ব্যাগ, সম্ভবত পড়াশোনা করে, লম্বা লম্বা উস্কো-খুশকো চুল, মুখে দাড়ি-গোফের ছোট-খাটো জঙ্গল, চেহারায় কেমন একটা উদ্ধত ভাব।
- কই, জলদি এসো।
আগন্তুক তাড়া দেয়।
লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছে মেয়েটি জানে না, কিন্তু দাদাকে ফিরে পাবার জন্য সে নিজের জীবনের ঝুঁকিও নিয়ে নিতে পারে। একটু সময় ভেবে মেয়েটি আগন্তুকের পিছে পিছে আসতে থাকে। আগন্তুক বার বার পিছন ফিরে মেয়েটিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে থাকে।
দাদাকে পেয়েই মেয়েটি দৌড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে দাদাকে হারিয়ে তার কি অবস্থা হয়েছিল সেটা বলতে থাকে, দাদাও প্রিয় নাতনীকে পেয়ে প্রচন্ড আবেগাপ্লুত হয়ে যান। যুবক দাড়িয়ে দাড়িয়ে অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে, এ যে আনন্দের কান্না, কি সুন্দর, কি অসাধারণ!
- বাবা, আপনে কেডা বাবা?
প্রশ্ন করে বৃদ্ধ লোকটি ভাবতে থাকে : এ নিশ্চয়ই ফেরেশতা, আল্লাহ পাঠিয়েছেন।
আগন্তুক বৃদ্ধের মনের ভাব মনে হয় বুঝে ফেলে। স্মিত হেসে বলে:
- আমি? আমি মানুষ, খুব সাধারণ একজন মানুষ!
বলে পিছন ঘুরে হেঁটে ভীড়ের মাঝে ঢুকে যায়। প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে অবিরাম ছুটে চলা অগুনিত মানুষের মাঝে সেই অতি সাধারণ মানুষটি হারিয়ে যেতে থাকে........
----------------------------------------------------------------------
গল্পটি লিখেছেন : স্বপ্নীল
প্রথম প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই , ২০১১
স্বপ্নীল এর ফেসবুক : http://www.facebook.com/sopnill.ahmed
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১২ ভোর ৪:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




