আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো একমাত্রিক, অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের শিকার। এদিক থেকে এ দেশগুলোর সংকট বৈশ্বিক সংকটের সমান্তরাল। সারা বিশ্বই যেখানে ইসলামি সন্ত্রাসের শিকার সেখানে এ কয়েকটি দেশকে ব্যতিক্রম ভাবা যায় না। কিন্তু ভারতে সন্ত্রাসবাদ বহুমাত্রিক। সেখানে ইসলামি সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গি যেমন আছে তেমনি আছে উগ্র হিন্দুবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও নকশালবাদী সন্ত্রাস। এই চার রকমের সন্ত্রাসের প্রভাবই পড়ে পাশের দেশগুলোতে। চার ধরনের এই সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যাও ভারতে অনেক। এক আসামেই আছে ৩৬টির মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, জম্মু ও কাশ্মীরে আছে এ রকম আরও ৩৬টি, মনিপুরে ৩৯টি, ত্রিপুরায় ৩০টি ও পাঞ্জাবে ১২টি।
তিন দিনের রুদ্ধশ্বাস বাস্তবতার পর আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছে মুম্বাই। মুম্বাইয়ের ওবেরয় ট্রাইডেন্ট ও ইহুদি সংস্কৃতিকেন্দ্র নারিমানকে আগেই জঙ্গিমুক্ত করা হয়। সর্বশেষ মুক্ত হল তাজ হোটেল। গত ২৬ নভেম্বর জঙ্গি হামলার পর গত দুই দিন মুম্বাই ছিল রণক্ষেত্র। আপাতত হাঁফ ছেঁড়েছে বেঁচেছে ভারত। তবে বাঁচেনি অনেক মানুষ। ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পর এবার শুরু হবে নানা রকম হিসাব-নিকাশ। ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ব্লেম-গেম। ভারতের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই কাঁদাছোড়া খেলা যেমন চলছে তেমনি ভারত সরকার বাইরের দেশগুলোকেও দায়ী করছে। ভারতের রক্ষণশলী দল বিজেপি এই হামলার জন্য সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করেছে। সরকারও তাদের এই দুর্বলতা নিয়ে চিন্তিত। এত বড় একটা হামলার ব্যাপারে কেন আগে থেকে কোনো আভাস দিতে পারল না নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা নিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার। সেই সঙ্গে সরকার বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করার জন্য বিজেপিকে (ভারতীয় জনতা পার্টি) দায়ী করেছে। তারা যেমন সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় একযোগে কাজ করার জন্য বিজেপিকে আহ্বান জানিয়েছে তেমনি বিজেপিও এটাকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সরকারের প্রতি তাদের মনোভাব ব্যক্ত করেছে। জাতীয় সংকট হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে দুই পক্ষ, কিন্তু দায়ী করার ক্ষেত্রে যার যার রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করছে তারা।
প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং প্রতিবেশীদের লক্ষ করে হুঙ্কার ঝেড়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি পাকিস্তানি জঙ্গিদের এ ঘটনার সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান এটাকে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য হুমকি হিসেবে নিয়ে সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছে। তারা মনমোহনের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রথমবারের মতো তাদের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রধানকে ভারতে পাঠাতে রাজি হয়েছে। তারপরও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি প্রণব মুখার্জির কথার জবাবে প্রতিবেশিদের দায়ী না করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। ব্লেম-গেমের মজাটা এখানেই। দু পক্ষই সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা ও সংকটের মাত্রা সম্পর্কে একমত হয়েও পরস্পরকে দায়ী করতে থাকে।
মুম্বাইয়ের হামলার ঘটনায় কিন্তু মোটের ওপর একটি বড় বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলোর দিকে সজাগ নজর রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর দিকেও কমবেশি নজর দেওয়া হয়েছে। সিএনএন অনলাইনের এক খবরে উচ্চপদস্থ এক গোয়েন্দার বরাত দিয়ে মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পক বাংলাদেশের বলে আন্দাজ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের একটি পত্রিকা বাংলাদেশ সরকারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনের এ ঘটনায় জড়িত থাকার সম্ভাবনা নেই। ভারতের গোয়েন্দারাও তেমন কোনো আলামত পায়নি এখনও। তবে এ ঘটনায় ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের নজর ফেরানোর চেষ্টা আছে বিভিন্ন মহলের।
ভারতে যখনই কোনো বোমা হামলার ঘটনা ঘটে তখন কোনোকিছু না ভেবে প্রথমেই প্রতিবেশীদের দিকে আঙুল তোলা হয়। ভারতের এক ধরনের মাইন্ড-সেট তৈরি হয়ে গেছে যে, জঙ্গি হামলা মানেই পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ। তাদের এই বিবেচনাহীন পূর্বধারণামূলক মনোভাব যে প্রতিবেশীদের জন্য অপমানকর সেটা তারা রাজনৈতিক সংকটের শিকার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর দিক থেকে বুঝতে চেষ্টা করে না। বিশাল ভূখণ্ড আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারতকে এই অহংকারের জায়গায় নিয়ে গেছে। এটা আঞ্চলিত স্থিতিশীলতা ও সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনোই কাম্য হতে পারে না।
ভারতে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসবাদী ঘটনার জন্য পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশের কিছু কারণ তো আছেই। আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি গ্র“প তাদের এ অঙ্গুলি নির্দেশের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে আঞ্চলিক সম্পর্কের দিক থেকে ভারতের দিকে কিন্তু আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অঙ্গুলি নির্দেশের সুযোগ নেই। কারণ সারা বিশ্বেই আজ ইসলামি জঙ্গিবাদ একটা ভয়াবহ হুমকি। যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে ইসলামি জঙ্গির জন্ম হবে এটাই ধরে নেওয়া হয়। ভারতে মুসলিমের সংখ্যা অনেক হলেও রাষ্ট্রটি যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়, তাই তাদের ওখানে ইসলামি কোনো সন্ত্রাসবাদী গ্র“পের জন্ম হলেও সেটার উৎস সন্ধান করা হয় পাশের আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে।
জঙ্গিবাদের জন্য আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে দায়ী করা হলেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিস্তৃত পরিসর নিয়ে আছে ভারতেই। এ ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়া সন্ত্রাসবাদ চিত্রের (সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের) একটা হিসাব এখানে তুলে ধরতে চাই।
ওই পোর্টালের হিসাবে দেখা যায়, ভারতের মোট ৬০৮টি জেলার মধ্যে ২৩১টি জেলাই বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসের শিকার। ২০০৬ সালে ভারতে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ জন। নিহতদের ৪১ শতাংশ ভারতের জন্মু ও কাশ্মিরের, ২৭ শতাংশ ১৪টি রাজ্যেও উগ্র বামপন্থিদের সন্ত্রাসী হামলার বলি। বাকি ২৩ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়। ২০০৫ সালে সন্ত্রাসবাদের শিকার ছিল আরও বেশি, ৩ হাজার ২৭৬ জন। ভারতে ২০০৭ সালে নিহতের সংখ্যা ২ হাজার ৫৯৮ আর মুম্বাইয়ের সর্বশেষ ঘটনা ছাড়া ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নিহত ২ হাজার ২৩৫ জন। ভারতে চার বছরে সন্ত্রাসী হামলায় যে বিপুল সংখ্যক লোকের প্রাণহানি ঘটেছে তা ২০০৫ থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণহানির প্রায় সমান। পাকিস্তানে ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণহানি ঘটেছে ১১ হাজার ৮৭৬ জনের। বাংলাদেশ সে তুলনায় অনেক শান্ত ও স্থিতিশীল।
আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো একমাত্রিক, অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের শিকার। এদিক থেকে এ দেশগুলোর সংকট বৈশ্বিক সংকটের সমান্তরাল। সারা বিশ্বই যেখানে ইসলামি সন্ত্রাসের শিকার সেখানে এ কয়েকটি দেশকে ব্যতিক্রম ভাবা যায় না। কিন্তু ভারতে সন্ত্রাসবাদ বহুমাত্রিক। সেখানে ইসলামি সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গি যেমন আছে তেমনি আছে উগ্র হিন্দুবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও নকশালবাদী সন্ত্রাস। এই চার রকমের সন্ত্রাসের প্রভাবই পড়ে পাশের দেশগুলোতে। চার ধরনের এই সন্ত্রাসবাদী ও জঙ্গি সংগঠনের সংখ্যাও ভারতে অনেক। এক আসামেই আছে ৩৬টির মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠন, জম্মু ও কাশ্মীরে আছে এ রকম আরও ৩৬টি, মনিপুরে ৩৯টি, ত্রিপুরায় ৩০টি ও পাঞ্জাবে ১২টি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সন্ত্রাসীদের চেয়ে ভারতের নিজের অভ্যন্তরের সন্ত্রাসী গ্র“পগুলোর দিকে ভারতের বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। যার নিজের পেটের ভেতরে এত গোলমাল অন্যের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আগে তার নিজের রোগের চিকিৎসা করাই ভালো। মুম্বাইয়ের সা¤প্রতিক হামলার ঘটনায় যারা দায় স্বীকার করেছে সেই ডেকান মুজাহিদিনও ভারতের হায়দরাবাদের।
পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির আগে তাই ভারতের উচিত হবে তাদের নিজের মাটিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা শতাধিক সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গ্র“পের বিকাশ বন্ধ করা এবং বিকশিত গ্র“পগুলোকে নির্মূল করা। আগে নিজের ঘরের শত্র“কে সামাল দেওয়া পরে অন্যদের কথা। ঘরের শত্র“ যে বিভীষণ সেটা ভারতের চেয়ে কে আর ভালো জানবে। আর প্রতিবেশিদেরও উচিত হবে নিজেদের ঘরে বেড়ে ওঠা জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভারতের সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের ব্যাপারে সাবধান থাকা। বড় ঘরে বড় ভালো জিনিস যেমন মেলে তেমনি বড় বাড়ির বড় ঘরের খারাপ জিনিসটাও বড় হতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


