কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর চারটি অধ্যায়। ক) বুর্জোয়া ও প্রোলেতারিয়েট খ) প্রলেতারিয়েট ও কমিউনিস্ট গ) সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সাহিত্য ঘ) অন্যান্য বিরোধী পার্টি সম্পর্কে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গী। এর মধ্যে ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকাতেই মার্কস এঙ্গেলস লিখেছিলেন, “সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের আলোচনাটি আজকের দিনের হিসাবে অসম্পূর্ণ” এবং বিরোধী দল সম্পর্কে মন্তব্যগুলি মূলনীতির দিকথেকে সঠিক হলেও ব্যবহারিক দিক থেকে সেকেলে হয়ে গিয়েছে, কারণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে গিয়েছে”। আরো বলেন, “দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষের দিকে যে বিপ্লবী পদক্ষেপগুলো গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল তা এখন অনেকটাই অন্য ভাষায় লেখা প্রয়োজন”। লেখার ২৫বছরের মধ্যেই এতকিছু ভাবতে হয়েছিল এটা নিয়ে।
আর আমরা এখন ম্যনিফেস্টো পড়ছি প্রথম প্রকাশের ১৬২ বছর পরে আর এই কথা উচ্চারণের ১২৮ বছর পর। সবচেয়ে বড় কথা, পড়ছি একটি এশীয় দেশে বসে। পড়ছি আকাডেমিক আগ্রহে নয়, বিপ্লবী কর্মী হিসেবে। রাজনীতিতে বেশিরভাগ স্লোগানই দেশকালভিত্তিক, কনটিঞ্জেন্ট; শোষণের অবসান এর মতো দু একটা মূল নীতি বাদ দিলে; একথা মাথায় রেখে। তাই আমরা ম্যানিফেস্টোকে কিভাবে পড়ব, সেটা আমাদের দেশকালের বিশ্লেষণের ওপরই অনেকটা দাঁড়িয়ে থাকবে। ম্যানিফেস্টোর কিছু জায়গা আমাদের পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হতে পারে বর্তমানের বোঝাপড়ায় আবার অনেক মূলনীতিকে বারবার গভীরভাবে আত্মস্থ করার দরকার পড়তে পারে। মনে রাখতে হবে ম্যানিফেস্টো নির্দিষ্ট প্রয়োজনে লেখা, তাই মার্কসের রচনার গভীরতা জটিলতা নানাত্বকে এখানে সচেতন বর্জনের কারণেই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমরা ম্যানিফেস্টোর যে জায়গাগুলো পড়তে পড়তে অন্যমত হই ভিন্ন দেশকালের জন্য, আর যাকে আরো প্রসারিত করতে চাই, যাকে নিবিড়ভাবে বুঝতে চাই তা একে একে দেখা যাক –
• সব সমাজের ইতিহাস শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, ম্যানিফেস্টোর এই কথাটা কমিউনিস্টদের মূল ভিত্তি, আমাদের দায়িত্ত্ব আমাদের সমাজে এই শ্রেণিদ্বন্দ্বকে নির্দিষ্টভাবে বোঝা ও তাকে সমাধান করা। প্রথম অধ্যায়ে এই কথাটা বলার পরই মার্কস বলছেন বুর্জোয়া যুগের বৈশিষ্ট্য শ্রেণি বিরোধ এতে সরল হয়ে এসেছে। আমরা এখন বলতে পারি যেভাবে ভাবা হয়েছিল, শ্রেণিবিরোধ অন্তত আমাদের দেশে বা গোটা দক্ষিণেই তেমন সরল হয়ে নেই। আমাদের পরিচিত বামপন্থী ও কমিউনিষ্ট দলগুলো চারটি দ্বন্দ্বর কথা বলেন – ১) শ্রম ও পুঁজির(মূলত বৃহৎ পুঁজির) মধ্যকার দ্বন্দ্ব ২) সামন্ততন্ত্র ও ব্যাপক জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব ৩) সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব ৪) শাসকশ্রেণির মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এর মধ্যে কোনটা প্রধান তা নিয়ে বিতর্ক বহমান। পরিস্থিতিও দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই বিতর্কের সমাধানের জন্য ম্যানিফেস্টোর সরলতার আশ্বাস কার্যকরী হবে না।
• ভুবনীকরণের প্রক্রিয়ার একটা প্রাণবন্ত উল্লেখ ম্যানিফেস্টোতে আছে। “অবিরত বর্ধমান এক বাজারের তাগিদ বুর্জোয়া শ্রেণিকে সারা পৃথিবীময় দৌড় করিয়ে বেড়ায়। সর্বত্র তাদের ঢুকতে হয়, সর্বত্র গেঁড়ে বসতে হয়। এবং এই প্রক্রিয়ায় সে প্রতিটি দেশের উৎপাদনকে এক বিশ্বজনীন চরিত্র দান করেছে”। - মার্কসের সময় পুরোনো ধরনের ঔপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া আক্রমণ আসত। নগ্ন প্রত্যক্ষ শাসনের পরিবর্তে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও নয়া ঔপনিবেশিক বাদের মধ্য দিয়ে তা আসে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিরন্তর প্রক্রিয়ার জায়গায় অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই জোর পড়েছে একচেটিয়াকরণের ওপর, পণ্য রপ্তানীর পরিবর্তে পুঁজি রপ্তানীর ওপর জোর পড়েছে। শিল্প পুঁজির ওপর লগ্নী পুঁজির আধিপত্যকে আর তার ফলেই ফাটকা অর্থনীতির ক্রমবিকাশকে সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র হিসেবে আমরা দেখতে পাই, যেটা লেনিন ‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে বলেছিলেন।
• শিল্পপুঁজির বিরুদ্ধে লড়াইকে পশ্চিমের সমাজে ম্যানিফেস্টো সর্বোচ্চ গুরুত্বে দেখেছিল আর শ্রেণিসংগ্রামের সরল চরিত্রকে স্থাপণ করেছিল কারখানায়। সেই প্রতিস্পর্ধী দুই শ্রেণি যেহেতু সুবিকশিত বুর্জোয়া সমাজে সবচেয়ে স্পষ্ট আর শ্রমিক শ্রেণি সবচেয়ে ভালোভাবে গড়ে উঠেছে, তাই পশ্চিমই ছিল সম্ভাব্য বিপ্লবের জায়গা। চীনের মতো দেশে বিপ্লবের জন্য ম্যানিফেস্টোর শিক্ষাকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় নি। চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ করে মাও দেখিয়েছিলেন শ্রেণিদ্বন্দ্ব মোটেই ম্যানিফেস্টো কথিত অমন সরল হয়ে আসে নি। আর লড়াইটাও কারখানার ভেতরেই মূলত নয়, শিল্পপুঁজির সাথেই মূলত নয়। আজকের দিনে ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে ম্যানিফেস্টো পাঠ নিয়ে দুটো কথা বলার। শিল্পপুঁজি নয়, ফিনান্সপুঁজির বিরুদ্ধে লড়াইটাই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে কারখানার ভেতরে শ্রমিকের লড়াই এর বদলে কৃষিক্ষেত্রের লড়াই, এককথায় কৃষিবিল্পব-ই ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় বিল্পবের মূল অক্ষ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তাই এর নির্দিষ্ট পথরেখা তৈরিতে ম্যানিফেস্টো শোষণমুক্তির মত কিছু সাধারণ নির্দেশিকাই দিতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



