আমি থাকি মীরপুরে।
মীরপুর ২ নম্বরের ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই যাতায়াত করি।
মাঝে মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যায় বন্ধুদের নিয়ে স্টেডিয়ামের দক্ষিণপাশে আড্ডা দেই। ঢাকার অন্যতম জনবহুল এলাকায় অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটির নিচে পশ্চিমদিক ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে ফার্নিচারের দোকান। দোকানের ফার্নিচার স্টেডিয়ামের বাইরে পর্যন্ত ছড়ানো ছিটানো থাকে। উপরন্তু দক্ষিণের খোলা জায়গাটুকু চটপটি, চা-সিগারেটের ভাসমান দোকানে পূর্ণ। সন্ধ্যার পর শত শত মানুষ এই জায়গাটাতে ভীড় করে।
এবছর অর্থাৎ ২০১১ এর শুরুর দিকে বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হবে এবং সহআয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের এই স্টেডিয়ামে বেশ কিছু খেলা অনুষ্ঠিত হবে সেটা সবাই জানি।
আমি কল্পনা করতাম- বিশ্বকাপ শুরুর আগেই আমাদের এই স্টেডিয়ামটির চেহারা পাল্টে যাবে। আমরা গরীব দেশ হতে পারি, বিশ্ব ফুটবলে আমাদের অবস্থান অনেক নিচে , তাই এদেশে কোনদিন ফুটবল বিশ্বকাপ হবে এবং সেই উপলক্ষে হাজার কোটি টাকা খরচ করে ৮/১০টি নয়নাভিরাম স্টেডিয়াম তৈরি হবে সেই আকাশকুসুম কল্পনা করি না। এমনকি অলিম্পিকের মত বড় ক্রীড়া আয়োজনের স্বপ্নও দুরাশা মাত্র। কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটে আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার পর অন্তত এইটুকু আশা করেছিলাম মীরপুরের এই স্টেডিয়ামটি সহ অন্তত দুটি স্টেডিয়ামকে বিশ্বকাপ উপলক্ষে চমৎকারভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে তোলা হবে। স্টেডিয়ামের চারপাশে সবুজ চত্ত্বর, ফোয়ারা, মনোরম আলোর ব্যবস্থা ইত্যাদি হবে।
বছর খানেক আগেও স্টেডিয়াম এলাকায় গেলে ভাবতাম- কি ব্যাপার? এক বছর পরই বিশ্বকাপ অথচ এখনও স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ শুরু হচ্ছে না কেন?
যত দিন যাচ্ছিল ততই স্টেডিয়ামের সামনে গেলে হতাশা বাড়ছিল। কোন কাজ হচ্ছে না। অবশেষে এই মাত্র কয়েকমাস আগে দেখলাম ভাসমান দোকানগুলো তুলে দিয়ে সংস্কারের কাজ শুরু হল। কিন্তু কাজের ধীরগতি দেখে আরও বিরক্ত লাগছিল। খেয়াল করলাম, কাজের এখনও অনেক বাকী।
(ছবিগুলো গতকাল স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তোলা।)
অথচ বিশ্বকাপের বাকী মাত্র কয়েকটা দিন। এখন যদি হঠাৎ কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে এবং তার কারণে কাজ বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে কাজ অসমাপ্ত রেখেই হয়ত বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাবে।
আমার এই লেখার মূল কথা এটাই- আমরা জাতি হিসেবে এত অলস, উদ্যমহীন, পরিকল্পনাহীন কেন? আমাদের দেশে বিশ্বকাপ হবে সেটা অন্তত চার বছর আগে থেকে জানি। কেন আমরা সেই উপলক্ষে আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করলাম না? অন্যান্য দেশ যেখানে আয়োজক হওয়া মাত্র প্রস্তুতি শুরু করে সেখানে আমরা শেষ মুহূর্তে কেন সজাগ হই? আমাদের ঘুম এত দেরিতে ভাঙ্গে কেন?
একই কথা খেলার টিকেট বিক্রির ক্ষেত্রেও বলা যায়। আমরা যদি দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার চিন্তা করি, তাহলে বিশ্বকাপের সীমিত সংখ্যক টিকেট বন্টনের বিষয়টি অবশ্যই লটারির মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল। অন্তত ছয়মাস আগে অনলাইনে টিকেটের জন্য আবেদন নেয়া যেত। তারপর সেই আবেদন অনুযায়ী লটারীর ব্যবস্থা করা যেত। এখন শেষ মুহূর্তে টিকেট নিয়ে যে ভোগান্তি ও ক্ষমতাধরদের মামদোবাজি সেটা কি ইচ্ছাকৃত নয়?
আবার একই কথা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়েও বলা যেতে পারে। এই অনুষ্ঠানের জন্য আইসিসির গাইডলাইন এদেশের কর্তাব্যক্তিরা আগে থেকেই জানেন। মানলাম, আমাদের দেশে বিশ্বমানের পারফরমারের অভাব রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি অন্তত এক বছর আগে থেকেই উদ্যোগ নিয়ে দেশী বিদেশী ইভেন্ট অর্গানাইজারদের সহায়তায় আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে নিজস্ব শিল্পীদের নিয়ে চমৎকার একটি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং সেই অনুসারে মহড়া দেয়া শুরু করতাম, তাহলে কি সুন্দর, গোছানো একটি অনুষ্ঠান উপহার দেয়া যেত না? কেন এই বিষয়ে এই অন্তীম মুহূর্তে এসে এত জল্পনা-কল্পনা, আলোচনা-সমালোচনা? কেন আমরা বচ্চন পরিবার বা মাহফুজুর রহমান গংয়ের হাতে দেশের মর্যাদা নষ্ট হতে দিচ্ছি?
আমাদের স্বকীয়তা, আত্মসম্মানবোধ এবং সামর্থ্য কি কোনদিন ছিল না নাকি আমাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে একটা বোধহীন, মেধাহীন, কান্ডজ্ঞানহীন, মেরুদন্ডহীন, হুজুগে জাতিতে পরিণত করা হচ্ছে? আমরা কেন সারা দুনিয়ার কাছে উপহাসের, করুণার পাত্র হচ্ছি?
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১১ সকাল ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


